কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আমরা ও আমাদের স্বাধীনতা

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • নাসরীন নঈম

প্রাচীন কবি রঙ্গলাল বলেছেন-

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়

ওহে কে বাঁচিতে চায়?

পরাধীন শৃঙ্খলকে পরিবে পায়

ওরে কে পরিবে পায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় উপেনের মুখে বলেছেন-

নমঃ নমঃ নমো সুন্দরী মম

জননী জন্মভূমি

গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর

জীবন জুড়ালে তুমি।

কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-

আজ

সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে

মোর টগবগিয়ে খুন হাসে

আজ- সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

(দোলনচাপা)

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন-

সাবাস বাংলাদেশ/এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়। (দুর্মর)

আধুনিক কবি শামসুর রাহমান বলেছেন-

স্বাধীনতা তুমি/বাগানের ঘর/ কোকিলের গান

বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা

যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

(স্বাধীনতা তুমি)

বাঙলাদেশের ন’মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র বিশ্বকে আন্দোলিত করেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ চলছিল যখন, তখন পাকিস্তানী কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরাও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সমর্থন দিয়েছেন। গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিবৃতি দিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। জেল খেটেছেন পাকিস্তানী কবি আহমদ সালিম শাহকার। আহমদ ফরাজের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ও সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে এভাবেÑ

“এই হত্যার উৎসব কী দিয়ে সাজাই?

কী দিয়ে রাঙাই এই হত্যাযজ্ঞ?

অর্থাৎ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মানবতার সপক্ষে।

বসনিয়ার কবি ইভিৎসাপেসেস্কি লিখেছেনÑ

‘আমি তখনো জন্ম নেইনি

তারপরও আমি তাদের দৃঢ়কণ্ঠের

আওয়াজ শুনেছি। জোরে জোরে বলছেÑ মুক্তি।

নেপালী কবি বিবশ পোখরেল লিখেছেনÑ

শত্রুকে পরাজিত করে

উড়িয়ে দাও। সবার জন্য। একটি সমবেত সকাল।

হ্যাঁ, এই সকালেই আজ আমরা উপনীত। আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা আমাদেরকে বাঙালী জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে একটি নিজস্ব আবাসভূমি। আমরা পেয়েছি একটি সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং একটি শক্তিশালী ভাষা। মাথা তুলে বলতে পারছি আমরা একটি স্বাধীন জাতি।

তবে মনে রাখতে হবে অর্জন করার পর একে রক্ষা করা বেশি কঠিন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছের অলিগলিতে ঘোরাফেরা নয়।

পকেটভর্তি টাকা নিয়ে রাতের অন্ধকারে নেশাগ্রস্ত হওয়া নয়। হরিণ শিকারের নেশায় মানুষকে গুলিবিদ্ধ করা নয়। কেননা, আমরা সময়ের সম্রাট নই। মাথা নোয়াতে হবে সেই সব সাধারণ নাম-জানা, অজানা মহিলা, কিশোর আর মধ্যবয়সী বুদ্ধিজীবীদের কাছেÑ যাঁরা স্বাধীনতার জন্য নিজেদের সর্বস্ব সম্পদ হারিয়েছেন। জীবন দিয়েছেন। শুধু ক্রোধে উন্মক্ত দ্রোহের ফসফসানি নয়- শুধু গভীরভাবে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে অনুভব করতে হবে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রকৃত সুখ। বিষণœতার মুখোশে শুকিয়ে যাওয়া অতি অল্প সংখ্যক মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে হবে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর আমরা কী পেয়েছিÑ পাবার কথা ছিল কী কী? হতে পারত কেমন আমাদের কাক্সিক্ষত দেশটি। হয়ে গেল কেমন। যারা যুদ্ধ দেখেনি যারা সংগ্রাম করেনি। যারা এক বেলাও অনাহারে থাকেনি- তাদের হাতে আজ স্বাধীনতার পতাকা। স্বাধীনতার মূল্যবোধ, যুদ্ধের চেনা আর বিজয়ের আদর্শ নিয়েই আমাদের পথচলা হোক। আমাদের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি। এই স্বাধীনতা শব্দটি আমরা নিজে নিজে বানান করে শিখেছি। দাঁতের ওপর দাঁত ঘষে ঘষে উচ্চারণ করেছি। আত্মস্থ করেছি।

বহু কষ্টের সমুদ্র পেরিয়ে অসংখ্য জীবনের বিনিময়ে আজ আমাদের করতলে এসেছে ‘স্বাধীনতা’। একে রক্ষা করতে হবে। ধরে রাখতে হবে। এই শব্দটিকে শুধু উৎসবের মোমদানিতে জ্বালিয়ে রাখাই নয়- আমাদের ইতিহাসে আমাদের জীবনাচরণের প্রত্যাহিকতায় একে সংযোজন করতে হবে। সম্পৃক্ত হতে হবে এর পবিত্রতার সোপানে। তবেই হবো আমরা প্রকৃত স্বাধীন।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: