কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চনাটক ‘পোড়ামাটি’

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

বাঙালী জাতির জন্য মুক্তিযুদ্ধ যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বাংলাদেশের যে কোন সচেতন নাগরিক মাত্রেই উপলব্ধি করতে পারে। হাজারও ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল তার পেছনের ঘটনা হুবহু ইতিহাসে কিংবা শিল্পে কোনভাবেই হয়ত তুলে আনা সম্ভব নয়। বিশেষত শিল্পে তা অসম্ভব। শিল্পে যেটি ঘটে তা হলো কোন বিষয়ের আংশিক নির্বাচন ও উপস্থাপনায় নিপুণ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর এ পর্যন্ত বেশ কিছু চলচ্চিত্র, মঞ্চ-টিভি নাটক তৈরি হয়েছে, যাতে চেষ্টা ছিল শতভাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে তুলে ধরা শিল্পের আরশিতে। বিশেষ করে মঞ্চ নাটকে এ চেষ্টা ছিল এবং নিরন্তর আছে। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে ‘পদাতিক নাট্য সংসদ’ তাদের ৩১তম প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চে এনেছে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক ‘পোড়ামাটি’। ‘পোড়ামাটি’ নাটকটি বাবুল বিশ্বাসের রচনায় ও ড. আইরিন পারভীন লোপার নির্দেশনায় উদ্বোধনী প্রদর্শনী হলো বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমীর পরীক্ষণ থিয়েটার হলে নাটকের শিল্প নির্দেশনা ও ফটোগ্রাফিতে ‘পদাতিক নাট্য সংসদ’-এর দলীয় প্রধান সেলিম শামসুল হুদা চৌধুরী এবং আলোক পরিকল্পনায় ছিলেন বজলুর রহমান। ছয়টি চরিত্রের সংলাপাত্মক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার নাটকটি মঞ্চে জীবন্ত ছিল প্রায় দুই ঘণ্টা। চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন, অমিয় মিজান, কামরুজ্জামান পাভেল, আল আমিন, ফারুক ফয়সাল ডিউক, মাহমুদা আক্তার লিটা ও কামাল হোসেন। নাটকটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে যদিও, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে বাস্তববাদ ধারার রীতিতে উপস্থাপনা থেকে দূরে সরে গেছে। নাট্যকার বাবুল বিশ্বাস তাঁর নাটককে এ্যাবসার্ড আঙ্গিকের নাটক হিসেবে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ নাটকটি ইউরোপীয় ভাবঘরানার এ্যাবসার্ড আঙ্গিকের কিন্তু নাটকটি আঙ্গিকগত জায়গায় কতটুকু স্বার্থক তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কেননা এ্যাবসার্ডটি মানেই যে শুধু মাত্র কিছু উদ্ভট ও ধূম্র সংলাপ তা নয়। নাটকের মূল বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ এটা স্পষ্ট, নাটকের ঘটনার স্থল স্পষ্ট, নাটকের চরিত্রের রূপরেখা স্পষ্ট এছাড়া নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা প্রায় বাস্তববাদ ধারার এতে করে নাটকটি এ্যাবসার্ড না হয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদ আঙ্গিকের নাটকে রূপ নেয়। বরং নাটকে এ্যাবসার্ড সংলাপের কারণে নাটকের যে উদ্দেশ্য তা ভোতা করে দেয় কিছুটা হলেও। সুতরাং নাটকটি পুরোপুরি এ্যাবসার্ড কিংবা বাস্তববাদ ধারার হলেই বরং দর্শক অনেক বেশি উপভোগ করতে পারত। এ দুই আঙ্গিকের মাঝামাঝি হওয়ায় নাটকের সঙ্গে দর্শকের যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। অর্থাৎ এ্যাবসার্ড হিসেবে নাটকটি যতটা না স্বার্থক তারচেয়ে বাস্তবতাবর্জিত নয় বলেই হয়ত শেষ পর্যন্ত নাটকের বার্তা দর্শকের কাছে পৌঁছুতে পেরেছে। নাটকটির সবচেয়ে ইতিবাচক যে দিকটি তা হলো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের করুণ ও বীভৎস রসের মধ্যে নিমজ্জিত থেকে অভিনয়ে নিবিষ্ট থাকা। অর্থাৎ ক্রিয়ায় মনোযোগ রাখা ছিল দুরূহ কিন্তু তাদের চেষ্টা ছিল দুর্দান্ত। তাদের অভিনয় দর্শক মনে প্রভাব ফেলতে অনেকাংশেই সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে রহমান চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তাঁর চরিত্রের পায়ে একটি জখম আছে, যার ব্যথার শারীরিকায়ন ছিল স্পষ্ট এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল সচল। তবে নাটকটিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মেক-আপ খুবই প্রশংসনীয়। আলোক প্রক্ষেপণ ও ভিডিও চিত্র সঞ্চালন নির্দ্বিধায় সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু নাটকে মুক্তিযুদ্ধকালীন যে সকল ভিডিও চিত্র দেখানো হয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করে শতভাগ। তবে নাটকের সংলাপ ও ক্রিয়ার সঙ্গে অনেকাংশেই সংঘাত তৈরি করে। এছাড়া নাটকের চরিত্রগুলোর একে একে মৃত্যু হয় রহস্যজনক ভাবে, যেখানে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বন্দী কিছু মানুষের মধ্য থেকেই হয়ত কেউ অন্য বন্দীদের খুন করছে যে কিনা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। অথচ নাটকে এ বিষয়টি উপস্থাপনায় রয়েছে যথেষ্ট দুর্বলতা। নাটকটি দেখে মনে হয় নাটকের অন্য চরিত্রগুলো মারা যায় বন্দী শিবিরের বাইরে থেকে ছুটে আসা গুলিতে এবং তা পুনঃপুনঃ ঘটে। যা নাটকের চরিত্রের মৃত্যুকে উপস্থাপনায় শ্রীহীন করে তুলে এবং মৃত্যু রহস্য কখনও কখনও রহস্য হয়ে উঠে না। সর্বপরি নাটকটিতে যে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা হয়েছে তা নির্দ্বিধায় পরিষ্কার এবং শেষাবধি করা হয় স্বাধীনতা বিরোধী ও পক্ষের শক্তির মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব সে সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ। এ্যাবসার্ড নাটক হিসেবে ‘পোড়ামাটি’ যতটা না সফল তারচেয়ে বরং মুক্তিযুদ্ধের নাটক হিসেবে বেশি সফল, এটা বললে সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না। কেননা নাটকটি শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের কথাই বলে, বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, বেদনার কথা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি থেকে সাবধান হওয়ার কথা। অর্থাৎ মহান বিজয় দিবসের দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর মহান বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসে একটি মুক্তিযুদ্ধের নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন ‘পদাতিক নাট্য সংসদ’-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনের কথা জানান দেয় এবং ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হোক বাঙালীর আজন্মের প্রেরণা।

শেখ জাহিদ আজিম

প্রকাশিত : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪

১৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: