রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভূলুণ্ঠিত নারীর মানবাধিকার

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

দেশব্যাপী বেগম রোকেয়ার ১৩৪তম জন্মদিন ও ৮২তম মৃত্যুবার্ষিকী জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে পালিত হয়েছে ঘটা করেÑসভা-সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পদযাত্রা, শোভাযাত্রা সর্বোপরি রোকেয়া পদক প্রদানের মাধ্যমে। একই সময়ে ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা এককথায় ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। তথাকথিত সামাজিক প্রথা ও ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে নানা পথে, নানা উপায়ে। এই জগদ্দল অবস্থা থেকে উত্তরণ ও গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে বেগম রোকেয়ার প্রদর্শিত পথেই নারীদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে নিরন্তর

আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম স্বীকৃত বিষয় হচ্ছে মানবাধিকার। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবার জন্য এটি সমভাবে প্রযোজ্য। সরকার ও রাষ্ট্রের চোখে মর্যাদা ও অধিকারের দিক থেকে সব মানুষ সমান। রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক জাতি বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক বা অন্য কোন মতাদর্শ বা সামাজিক পটভূমি বা অন্যান্য মর্যাদা নির্বিশেষে সব ধরনের অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগের দাবিদার। এসব অধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে মানবাধিকারও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

জাতিসংঘ কর্তৃক মানবাধিকার ঘোষিত হবার পর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারণা প্রাধান্য লাভ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতিসংঘ সনদ, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিধানে নারী-পুরুষ বৈষম্যকে বিলোপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এতসব আন্তর্জাতিক বিধান সত্ত্বেও, সমাজ জীবনে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা যায়নি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার যুগেও নারী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করতে পারে না। এখনও সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ ভিন্ন সুবিধা ভোগ করে। পুরুষরা প্রায় সকল অধিকার পেলেও, জন্ম থেকেই নারীদের বঞ্চিত হতে হয় মৌলিক অধিকারসহ অন্যান্য সামাজিক অধিকার থেকেও। নারীর ক্ষেত্রেই মানবাধিকারের সবচেয়ে চরম লঙ্ঘন দেখা যায়। আর এ কারণেই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ। আমাদের দেশেও নারীর মানবাধিকার রক্ষায় ব্যাপকহারে নারী উন্নয়ন নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সমাজ থেকে নারীর প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন দূর করা সম্ভব হয়নি।

সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিষ্ঠা পেলেও, নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক কাটেনি এখনও। দেশে নারী নির্যাতনের হারও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ১০ মাসে ৩ হাজার ৯০৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সম্প্রতি মহিলা পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। দেশের ১৩টি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মহিলা পরিষদ এ জরিপ প্রকাশ করে। নারী নির্যাতনের এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়াও পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা, পুলিশ নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া, নারী ও শিশু পাচারসহ অন্যান্য নির্যাতনও রয়েছে। নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনাই পত্রিকার পাতায় আসে না। তাই এ সংখ্যা আরও বেশি বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন।

এদেশে নারী মুক্তি আন্দোনের সূচনা হয়েছে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার হাত ধরে। শত বছর আগে বাঙালী নারীর অধিকার আদায়ে যে দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। শতবছর আগে বেগম রোকেয়া যে সমাজ প্রেক্ষাপটে নারীর অধিকার ও মুক্তির আন্দোলনের সূচনা করেন, আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এখনও তা কার্যকর। বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার যে মাত্রা দেখা যায়, তাতে নারী আন্দোলনের অগ্রণী পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার সময় থেকে যে খুব একটা এগিয়েছি, এমন বলা যায় না।

বর্তমানে দেশে নারী ক্ষমতায়ন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা গুণে নারীরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু বাতির নিচে অন্ধকারের মতো নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনও বেড়েই চলেছে। দেশে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ। প্রতিবছর বাঙালী নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়ার প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করে ৯ ডিসেম্বর পালিত হয় রোকেয়া দিবস। কিন্তু দুঃখজনক হলো এই যে, বেগম রোকেয়ার প্রয়াণের এত বছর পরও দেশের নারীরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। পরিবার ও সমাজে নারীরা এখনও যে প্রবল বৈষম্যের শিকার, তা রোকেয়ার তৎকালীন প্রেক্ষাপট থেকে তেমন ভিন্ন কিছু নয়। তবে সময় পাল্টেছে। পাল্টেছে নারী নির্যাতনের পদ্ধতিও। বেগম রোকেয়ার আমলের মতো কঠোর পর্দাপ্রথা না থাকলেও, নারীর প্রতি এসেছে ফতোয়া। নারীর অগ্রযাত্রায় পড়ছে মৌলবাদের কালো ছায়া। পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে নারীর মানবাধিকার। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর মতামত এখনও তেমন প্রাধান্য পায় না। এ অবস্থায় নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

অপরাজিতা ডেস্ক

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

১২/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: