মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কাঠের ফ্রেমে কারুকাজ রঙিন কাঁচে ফুল পাখি সৌন্দর্য হারাচ্ছে সবই

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪
কাঠের ফ্রেমে কারুকাজ রঙিন কাঁচে ফুল পাখি সৌন্দর্য হারাচ্ছে সবই
  • কালের সাক্ষী ‘শশীলজ’

বাবুল হোসেন ॥ সর্বগ্রাসী কাল হরণ করেছে এর সৌন্দর্য। শ্বেতপাথরে তৈরি অর্ধনগ্ন বসনার দৃষ্টিনন্দন নারী মূর্তি ঢাকা পড়েছে শেওলাযুক্ত ময়লার আস্তরণে। অযতœ অবহেলায় খসে পড়ছে দেয়ালের পলেস্তারা। নান্দনিক কারুকাজ করা কাঠের ফ্রেমের ভেতর রঙিন কাচের দরজায় আঁকা ফুল, পাখি, নদী, পাল তোলা নৌকাসহ আবহমান বাংলার প্রকৃতির ছবিও ভেঙ্গে চৌচিড়, খান খান অবস্থা। লোপাট হয়ে যাচ্ছে বাড়ির মেঝেতে বসানো মূল্যবান শ্বেতপাথর, দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতির নানা অংশ। ময়মনসিংহের প্রতাপশালী জমিদার মহারাজ শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর বসতবাড়ি ‘শশীলজ’ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এরকম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। ২০১৩ সালে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের নামে গেজেট নোটিফিকেশন হলেও ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা)-এর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দখল না ছাড়ায় জমিদারি বিলাসের সাক্ষী এই শশীলজ শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। অথচ প্রতœতত্ত্ব বিভাগ এর দখল পেলে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বছরজুড়ে অসংখ্য পর্যটক ও দর্শনার্থী টানতে সক্ষম হত জমিদার স্মৃতি বিজড়িত ও অসাধারণ স্থাপত্য শৈলীর এই রাজবাড়িটি।

সুউচ্চ সীমানা প্রাচীরে ঘেরা নয় একর জমির ওপর ‘শশীলজ’ এর প্রধান ফটক পেরুতেই নজর কাড়ে পাথরে মোড়ানো বৃত্তাকার বেষ্টনির ওপর শ্বেতপাথরে নির্মিত অর্ধনগ্ন বসনার নারী মূর্তি। দীর্ঘদিনের অযতœ আর অবহেলাসহ সর্বগ্রাসী কাল হরণ করেছে এর সৌন্দর্য। শেওলাযুক্ত ময়লার আস্তরণ শ্বেতপাথরের দ্যুতিকে ঢেকে দিচ্ছে। একই অবস্থা বাড়িটির ভেতরে বাইরে। প্রধান ফটক আর নারী মূর্তি পেরিয়ে শশীলজের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন ‘অচল’ ফোয়ারা। বাড়ির মেঝজুড়ে কেবলই শ্বেতপাথর। করিডোর, ডাইনিং, ড্রয়িং, হলরুম ও শোবার ঘর সবখানেই বসানো হয়েছে মূল্যবান এই পাথর। শশীলজের ভেতরে ঢোকার পথে বৃত্তাকার ফোয়ারার পুরোটাই এই শ্বেতপাথরে মোড়ানো। বিদেশ থেকে আনা নামীদামী ঝাড় বাতিগুলো সোজা ওপর থেকে নেমে ঝুলে রয়েছে এই ফোয়ারার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই ফোয়ারার দু’পাশ দিয়ে লম্বা করিডোর পূর্ব থেকে পশ্চিমপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। শশীলজ-এর দুপাশে বিশাল দুটি শোবার ঘর। এর একটিতে রাজা, আরেকটিতে থাকতেন রানী। ফোয়ারা পেরিয়ে মাঝখানে বিশাল জায়গার ড্রয়িং ও ডাইনিং কক্ষ, হলরুম। ৩টি কক্ষের মধ্যে মাঝখানের কক্ষটি কেবল দৃষ্টিনন্দই নয়, আলিশান বলতে যা বোঝায়। এটিতে ঝুলানো রয়েছে বিদেশ থেকে আনা নামীদামী ৩২টি বাতির বিশাল একগুচ্ছ কাচের ঝাড়। এই কক্ষের দুইপাশে আলাদা ঝাড়ে ঝুলছে আরও ১২টি করে বাতির দুই গুচ্ছ কাচের রঙিন ঝাড়। এই কক্ষের দুই পাশে আরও যে দুইটি কক্ষ রয়েছে তাতেও শোভা পাচ্ছে এরকম নজরকাড়া ঝাড়বাতির গুচ্ছ। তবে এসব ঝাড়বাতির সবক’টিই এখন অচল ও ভাঙ্গাচোরা। কিন্তু স্ফটিকের মতো ঝকমকে দেখতে। প্রতিটি কক্ষেই চমৎকার ভেন্টিলেশন। ড্রয়িং, ডাইনিং ও হলরুমের প্রতিটিতে এক ডজনের মতো করে কারুকাজ করা কাঠের দরজা। কাঠের ফ্রেমের ভেতর রঙিন কাচ পার্টিশান করে লাগানো। তাতে শোভা পাচ্ছে ফুল, পাখি, নদী, পাল, তোলা নৌকা, বক, রাজহাঁস, পেখম তোলা ময়ূর, শান্তিরপ্রতীক পায়রাসহ প্রকৃতি-আবহমান বাংলার ছবি। প্রতিটি কাঠের ফ্রেমের দরজার ভেতর রঙিন ও সাদা কাচে দুর্লভ এসব চিত্রকর্ম আঁকা রয়েছে নিখুঁতভাবে। এ সবের অনেক কিছুই এখন ভেঙ্গে চৌচির, খান খান অবস্থা। একটি কক্ষের পুরো মেঝ থেকে তুলে নেয়া হয়েছে শ্বেতপাথর। এর বাইরে ড্রয়িং ও ডাইনিং কক্ষের প্রতিটি দরজায় লাগানো রয়েছে নামীদামী কাচের পাত। যা রাতের বেলায় জ্বলজ্বল করত। এসবও লোপাট হয়ে যাচ্ছে। শশীলজের প্রতিটি জানালাতে লাগানো রয়েছে নেট। যেনো মশা মাছিও ঢুকতে না পারে। এসবও বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাজ বাড়ির জানালা, দরজা ও করিডোরের নিরাপত্তা বেস্টনীতে বসানো লোহার গ্রিলও লোপাট হয়ে যাচ্ছে। শশীলজের দুই পাশে রাজা ও রানীর শোবার ঘরেও লাগানো ছিল নামীদামী পাথরের ফিটিংস। বাথরুমে বিদেশ থেকে আনা বাথটাবসহ নানা ফিটিংস পড়ে আছে যত্রতত্র। কেবল বিনষ্টই নয়, দিনের বেলাতেই লোপাট হচ্ছে অনেক মূল্যবান ফিটিংস। শশীলজের পেছনেই রয়েছে শান বাঁধানো ঘাটের বিশাল পুকুর। ঘাটের ওপর দ্বিতল স্নœানাগার। তিন দিক থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে এই ¯œানাগারে। দ্বিতল ¯œানাগারের পুরো মেঝ মোঝাইক করা। ¯œানাগারের ওপরে ও নিচের দুই পাশে আলাদা কক্ষে কাপড় পরিবর্তন করার ব্যবস্থা ছিল। ¯œানাগার থেকে শ্বেতপাথর বিছানো সিঁড়ি নেমে গেছে পুকুরের ঘাট হয়ে নিচ পর্যন্ত। দৃষ্টিনন্দন এই ¯œানাগারের এক পাশে ছিল মিনি মিউজিয়াম। রানীর বিনোদনে এতে রাখা হত বাঘ ও হরিণসহ নানা জাতের বন্য প্রাণী। শশীলজ থেকে সখীবেষ্টিত হয়ে রানী চলে যেতেন পুকুর ঘাটের এই ¯œানাগারে। বিনোদন আর জলকেলির পর শ্বেতশুভ্র হয়ে ফিরতেন রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে। তারপরও রাজা, মহারাজাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত মেলা নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। রাজবাড়ির বিশাল ক্যাম্পাসে নাগলিঙ্গম ও লক্ষ্মীবিলাসসহ অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষরাজি রয়েছে। পরিচর্যার অভাবে এসব বৃক্ষও এখন বিলীনের পথে। প্রচার রয়েছে, জমিদাররা হাতি পুষতেন। হাতির পছন্দের খাবার ছিল এই নাগলিঙ্গমের ফল। আহমদ তৌফিক চৌধুরীর ‘শহর ময়মনসিংহের ইতিকথা’ থেকে জানা যায়, মুক্তাগাছা থেকে ময়মনসিংহ শহর নিয়ন্ত্রণ করতেন মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। পরবর্তীতে সুষ্ঠুভাবে শাসন কাজ পরিচালনার জন্য পালিত পুত্র শশীকান্ত আচার্যের নামে ময়মনসিংহ শহরে নির্মাণ করলেন দ্বিতল পাকা বসত বাড়ি শশীলজ। এতে ওপরে ওঠার জন্য একটি মিউজিক্যাল স্টেয়ার কেস লাগানো ছিল। ফ্রান্স থেকে আমদানি করা এই স্টেয়ার কেস বেয়ে ওপরে ওঠার সময় একধরনের মিউজিক বেজে উঠত। ১৮৫৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মহারাজের এই দ্বিতল বসতবাড়ি ধসে পড়ে। দুর্গাপুরের জমিদার রাজা জগৎ কিশোরের ১২ বছরের কিশোর পুত্র দেয়াল চাপা পড়ে মারা যান এই ভূমিকম্পের সময়। মহারাজ শশীকান্ত তখন কলকাতায় ছিলেন। টেলিগ্রামে ভূমিকম্পের এই খবর পাঠানো হলে শশীকান্ত অপর প্রান্ত থেকে জানতে চেয়েছিলেন, হুয়াট ইজ এবাউট মাই স্টেয়ার কেস? এর পর থেকে ময়মনসিংহ শহরে দীর্ঘদিন পাকা দ্বিতল বাড়ি নির্মাণে মহারাজের বারণ ছিল। পরে সেখানে নির্মাণ করা হয় আজকের এই একতলার সুরম্য দালানবাড়ি। প্রচার রয়েছে, শশীলজ থেকে সুরঙ্গপথে মুক্তাগাছা রাজবাড়ীর যোগাযোগ ছিল। ভূমিকম্পের পর লাল রংয়ের ইটে নির্মিত একতলার পুরো শশীলজে বাসা বেঁধেছে পাখি, গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য আগাছা পরগাছা। অথচ শশীলজটি বিগত ১৯৫২ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ হিসেবে। এখনো শশীলজের বসতভিটায় চলছে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা)-এর প্রশাসনিক ভবন ও একাডেমিক ট্রেনিং কার্যক্রম। যদিও নয় একরের এই বিশাল ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যে বহুতল ভবনের স্থাপনায় একাডেমিক, ট্রেনিং, ডেমনেস্ট্রেশন স্কুল ও বিএড শিক্ষার্থীদের আবাসিক হোস্টেলের কার্যক্রম চলছে। রয়েছে অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার। প্রচার রয়েছে, নজরদারি না থাকায় ক্যাম্পাসে ঘরবাড়ি তোলে অবৈধভাবে বাস করছেন অনেকে। এসব অবৈধ দখলদার সরকারী কর্মচারীদের বাসায় সরকারী পানি সরবরাহ ও বিদ্যুত সংযোগও রয়েছে। যার বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে কলেজ কর্তৃপক্ষকে। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পাসের ভেতর নির্জন জায়গায় দিনে রাতে নেশাখোরদের আড্ডা জমে। স্থানীয় প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের নামে গেজেট নোটিফিকেশন হওয়ার পর শশীলজের কোন ক্ষতি হলে দখলদার কর্তৃপক্ষকে দায় নিতে হবে। এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা)-এর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অমল কান্তি চক্রবর্তী জনকণ্ঠকে জানান, দখল হস্তান্তরের মালিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দখল ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে এখনও এরকম কোন নির্দেশনা পাননি বলে জানান তিনি।

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৪

০৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: