কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তুমি কি কেবলই ছবি

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সুশান্ত মজুমদার

আজিমপুর কবরস্থানে বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী চিরনিদ্রায় শায়িত। এই বাক্য দিয়ে বলা যেতে পারে, কাইয়ুম চৌধুরীর ইহজগতের সঙ্গে তাঁর চিরবিচ্ছেদের কথা। তা কি সম্ভব? বয়সের আশি-উর্ধ বিরতিহীন কর্মতৎপর এই মানুষটি তাঁর পছন্দের সুরের অনুরণনের প্রভাবে বুঝি নিরিবিলি ঘুমাতে গেছেন। তখন বেলা-উত্তীর্ণ সদ্যরাত, ঘন হচ্ছে শীত, নীল আকাশ, নীলাভ আকাশজুড়ে ফুটে আছে তারা। নিজেকে পৃথিবী থেকে ছিঁড়ে তাঁর গৃহীত ঘুমের আগে কর্মযজ্ঞের তালিকায় কোন কাজ ছিল না। শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকবেন, উদ্বোধন করবেন ছবির প্রদর্শনীর, ছবির রঙ-রীতি-বিষয়-কলাকৌশল নিয়ে ভাবনার মতো দামী কথা বলবেনÑ সবই স্বাভাবিক। ছবির বাইরে রেখে গেছেন তাঁর স্পর্শÑ আয়ুষ্মান সৃষ্টি। বলতে হয়, হে সংস্কৃতির অভিভাবকÑ তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী। এই তো তাঁর আঁকা আলোচিত বাউল রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে পোস্টার, একাধিক সংবাদপত্রের জন্য আঁকা শিরোনাম রোজ লাখ পাঠকের হাতে যাচ্ছে, কত লোগোÑ কার্ড, হেডিং সর্বত্র উপস্থিতি তাঁর। আপনজনের কাছে ঘরোয়া পরিবেশে গভীর রসিক পুরুষ কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম জীবনে ছবির পাশাপাশি শিশুতোষ ছড়া লিখেছেন। ছড়ার বই আছে তাঁর। শেষ জীবনে এসে গীতল পঙ্ক্তিমালার অনেক কবিতা লিখলেন। গানের শিল্পী ও দেশ-বিদেশের পুরনো দিনের সিনেমা নিয়ে কতই না স্মৃতিকথা। খেলাধুলার স্যুভেনির প্রকাশে শ্রম দিয়েছেন। এই প্রথম প্রচ্ছদÑ আঁকায়, আঙ্গিকে বদলে গেল এদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে প্রকাশিত স্মরণিকা। এক সময় ঢাকায় একুশের স্মরণিকা প্রকাশে ধুম ছিল। অধিকাংশ বেরিয়েছে কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জাসহ। আবৃত্তি-উচ্চারণ বিষয়ে কণ্ঠশীলনের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এমনকি প্রতিবছরের পৌরকর, খাজনা, আয়কর পরিশোধ করে তিনি সুনাগরিকের গুণাবলী বজায় রাখতে ছিলেন সচেষ্ট ও দায়িত্ববান।

কাইয়ুম চৌধুরী উত্তরাধিকারী সূত্রে জ্ঞাত ছিলেন, সঙ্গীতের সাতটি স্বরে মিশে আছে জীবন-পৃথিবী, জগৎ সংসারের বিশদ শক্তি ও অনুভব। তিনি তাই নিংড়ে নিয়ে নিজে আলোকদীপ্ত হয়েছিলেন। এরই উৎসারণ দেখি, তাঁর ছবিতেÑ আধুনিক রীতির সমন্বয়ে তাঁর ক্যানভাসে বাংলা ও বাঙালীর লোকঐতিহ্য ফুটে উঠেছে অসাধারণভাবে।

কাইয়ুম চৌধুরীর ধ্রুপদী সঙ্গীতের নিজস্ব যে কালেকশন তা ঈর্ষাণীয়। চোখের যতœ নেয়ার মতো তিনি এসব আগলে রাখতেন। রেকর্ডপ্লেয়ারে বেজে চলা সুরের মূর্ছনার সঙ্গে চোখ বুজে বুঁদ তাঁর আঙুলের নড়াচড়া দেখতে দেখতে অনেকবার আমার মনে হয়েছে, সঙ্গীতের স্বরগ্রামের ওঠানামার পর্যায়ে সুমধুর কম্পন তাঁর মধ্যে ক্রিয়া করছে। তিনি বুঝি রোজ গান দিয়ে তাঁর কান পরিষ্কার রাখতেন। নচেৎ নির্ভুলভাবে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের নেপথ্যের শিল্পীকে কিভাবে শনাক্ত করতে পারতেন।

কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি মানে বাংলাদেশ, এর প্রকৃতি চরাচর সমূহ রূপ-রস-গন্ধ রঙ ও রেখায় জীবন্ত হয়ে আমাদের নিজস্ব বদ্বীপ ভূখ-ের প্রতিনিধিত্ব করে। ছবি আঁকার শুদ্ধতম মহত্তম সৃষ্টি দিয়ে তিনি শিল্পকলায় আপন স্বতন্ত্র মৌলিক এক ঘরানা নির্মাণ করেছেন। তাঁর ছবির নিচে স্বাক্ষর না থাকলেও আমরা অনায়াসে রঙ-রেখা-বিষয় নিয়ে পরিষ্কার বলে দিতে পারিÑ এ ছবি কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা। চিরায়ত গ্রামবাংলা, অমলিন নিসর্গ, নদী-নৌকো, মৃত্তিকার ধমনীতে টলমল যৌবনের ঢেউ, কিষাণের স্বর্ণস্বপ্ন আমাদের এই নিশ্চিত ভাবনার মুখোমুখি করে যে কাইয়ুম চৌধুরী হচ্ছেন ছবির জীবনানন্দ। তাঁর ছবিতে গাঢ় লাল-সবুজ-হলুদ-নীলের ঋতুর উৎসব, মৌসুমের পরিবর্তন আমাদের চিরকালের চিরঞ্জীব স্মৃতি-সত্তাকে ধরে আছে। আর জল, জলের ওপরে ভাসমান সব নদীর কত ধরনের নৌকা দেখে এমতিতেই আবৃত্তি হয়Ñ সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়। সব কিছুর মধ্যে স্বীয় সৃষ্টিকে পাশে সরিয়ে এখন কাইয়ুম চৌধুরী দীর্ঘ আট দশক পর ঘুমাচ্ছেনÑ গভীর ঘুমের আস্বাদে তাঁর আত্মা লালিত, হে হিম হাওয়া, অগ্রহায়ণ নিশিথের কোকিল তাঁকে জাগাতে চাও কেন। তিনি আমাদের চারুকলায় রুচির অন্যতম নির্মাতা। এদেশের শিল্পকলার শূন্যতা পূর্ণ করার প্রয়াসে কর্মে-প্রেরণায়-স্মৃতিতে তিনি স্মরণীয় থাকবেন।

কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করার শুরু ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর কাজে যোগ দেয়ার পরে। তখনও তিনি অন্তর্মুখী স্বভাবের এবং মৃদুভাষী, নিজের শিল্পসাধনা নিয়ে সার্বক্ষণিক মশগুল। সভা-সমাবেশ-সেমিনারে তখনও তিনি বক্তা বা অতিথি হয়ে ওঠেননি। কিন্তু তাঁর চিন্তায়-মনে-কাজে মুক্তবুদ্ধি, অসম্প্রদায়িকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বাঙালীয়ানা বিশেষ করে জাতির শ্রেষ্ঠকর্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভরপুর। তখন তাঁর কাজই ছিল মুক্তিযুদ্ধকে কতভাবে ছবিতে-পোস্টারে-পত্রিকার কভারে-বইয়ের প্রচ্ছদে আনা যায়। পরিশ্রম করে ছবিতে তিনি তুলে ধরেছেন মুক্তিযোদ্ধা, যোদ্ধার অস্ত্র, জাতীয় পতাকা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে।

একাত্তরে জীবনপণ সংগ্রামে একটি নতুন দেশের জন্য আমাদের দিতে হয়েছে লাখো প্রাণের চরম মূল্য। প্রতি মুহূর্তে একাত্তরের যুদ্ধদিনে আমাদের চারপাশে মৃত্যুর বিভীষিকা। বেয়নেটবিদ্ধ দুঃসময়ের নয় মাসের অভিজ্ঞতায় রচিত আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্য সজীব বাস্তবগ্রাহ্য সময়জয়ী হয়ে উঠেছে কাইয়ুম চৌধুরীর সচিত্রকরণে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জায়মান অনিঃশেষ চেতনা, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জাতির পিতার হত্যাকা-, অন্যায্য সামরিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, স্বৈরাচার বিরোধিতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি নিবিড়ভাবে জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের দীপ্ত চেতনার সারাৎসারই হয়ে উঠেছে। কাইয়ুম চৌধুরীর বর্ণাঢ্য মনোজ্ঞ ছবির ভুবন।

কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে আমার বত্রিশ বছরের যে সখ্য তা গড়ে ওঠে শিল্পসাহিত্যের সাপ্তাহিকী সচিত্র সন্ধানী ও সন্ধানী প্রকাশনীর মাধ্যমে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সারা জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুই হচ্ছেন কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর আঁকা প্রচ্ছদ ছাড়া সন্ধানী প্রকাশনী থেকে কোন বই বের হয়নি। তাঁর আঁকা প্রচ্ছদ ছাড়া নবপর্যায়ের সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী পাঠকের যায়নি। সন্ধানী পত্রিকা বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি হয়ে উঠার পেছনে কাইয়ুম চৌধুরীর ছিল পরামর্শ-মনোযোগ-পরিশ্রম। কাইয়ুম চৌধুরীর ‘সন্ধানীর চব্বিশ বছর’ লেখায় স্মৃতিচারণে বলেছেন : “ভাবতে ভাল লাগে সন্ধানীর গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলির সাথে আমি জড়িয়ে ছিলাম। উষালগ্নে যে ক’জন উদ্যমী পুরুষ এ কাজটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ ওরফে মনুর সাথে আমার হার্দিক সম্পর্ক যা এখনও নির্ভেজাল, অটুট।” লেখার গুণে সচিত্র সন্ধানী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই সব লেখা মলাটবন্দী করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় সন্ধানী প্রকাশনী। এদেশের এমন কোন স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিক নেই যাঁর লেখা বই সন্ধানী প্রকাশনী থেকে বের হয়নি। এসব বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। সুন্দর প্রচ্ছদ, ভালো ছাপার উজ্জ্বল নিদর্শন হওয়ায় সন্ধানীর বই বহুবার পেয়েছে গ্রন্থসৌকর্যের পুরস্কার। একুশের বইমেলায় সন্ধানী প্রকাশনীর বুকস্টল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কতবার যে করায়ত্ত হয়েছে শ্রেষ্ঠ সজ্জার পুরস্কার। সব স্বপ্ন তৈরি হয়েছে যৌথভাবে গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ ও কাইয়ুম চৌধুরীর মণিকাঞ্চন সংযোগে।

সন্ধানী প্রকাশনীর একটি গৌরবময় প্রকাশনা জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি।’ সচিত্র সন্ধানীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই দিনলিপি সমগ্র জাতির অন্তরে প্রোথিত হয়ে আছে। সেই প্রথম ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও কবিতা’ একই বাক্সে দুই ভল্যুম রীতিমতো ঈর্ষা জাগানো প্রকাশনা। সন্ধানী প্রকাশনীই এদেশে মুক্তিযুদ্ধের কল্প কবিতা প্রকাশে পথিকৃত। আজ বহুকোণ থেকে বিভিন্ন নিরিখে সাহিত্যের প্রধান বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। এই মহানকর্ম নান্দনিক হয়েছে একমাত্র কাইয়ুম চৌধুরীর রেখাচিত্রে। আজ প্রচ্ছদ শিল্পের যে পরিবর্তন ও উন্নতি, এমনকি বিমূর্ত প্রচ্ছদের ব্যবহার, শিল্পীর আঁকা ছবির সংযোজন এর গোড়াপত্তন করে সন্ধানী ও কাইয়ুম চৌধুরী। প্রকাশনা শিল্পের দৃষ্টিনন্দন শ্রী মানেই কাইয়ুম চৌধুরী। একমাত্র শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী যঁাঁর আঙুল বাংলাদেশের প্রচ্ছদের বিকাশ শিখরে নিয়ে গেছে। এই তিনি বহু ব্যবহৃত পুরনো শরীরটা ৩০ নভেম্বর রোববার উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের মঞ্চে ফেলে যাওয়ার আগেও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। কাইয়ুম চৌধুরী এদেশের শ্যামল মাটির গভীরে নিজের জন্য শয্যা পাতলেও তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টির আলো কিছুইতেই নিভবে না। শিল্পপিপাসুদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।

প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

০৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: