ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

পথে বেরোলেই নারী যৌন হয়রানির শিকার হন

প্রকাশিত: ০৫:১২, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬

পথে বেরোলেই নারী যৌন হয়রানির শিকার হন

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ মিরপুর-১ থেকে বাসে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করেন ফাহমিদা। এক আধটু স্পর্শ অথবা ধাক্কা উপেক্ষা করেই চলতে হয় তাকে। দুদিন আগে অফিসে যাওয়ার পথে বাসের পেছনের সিটে বসে থাকা লোকটি তার পিঠে বার বার হাত দেয়ার চেষ্টা করছিল। বিষয়টি টের পেয়ে প্রচ- ক্ষোভে ফাহমিদা লোকটিকে থাপ্পড় মারেন। এ ঘটনায় উপস্থিত বাসের যাত্রীর অনেকেই তাকে মারতে বাধা দেন আবার অনেকেই ফাহমিদার পক্ষ নিয়ে ব্যাপারটি মিটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। পেশাগত কারণ ছাড়াও পড়াশোনা, কেনাকাটা, চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়া-আসাসহ অনেক কারণেই প্রতিদিন ঘরের বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য নারীকে ঘরের বাইরে আসতেই হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে অর্থনীতির গতিপথ। কিন্তু নারীর গতিপথ রোধ করছে যৌন হয়রানি। তামান্না তাওহীদ নীলক্ষেত কর্মজীবী ছাত্রী হোস্টেলে থাকেন। প্রতিনিয়তই তাকে নীলক্ষেত বইবাজারের ভেতর দিয়েই চলাফেরা করতে হয়। ভিড়ের মধ্যে হরহামেশাই তামান্না ভীত হয়ে দ্রুত চলার চেষ্টা করেন। অতীতের এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কোন একদিন এই পথে চলার সময় হঠাৎ এক আগন্তুক তার গায়ে হাত দেন। প্রচ- ঘৃণা আর ক্ষোভে অস্বস্তির এই অভিজ্ঞতা আজও নিজের মধ্যে চেপে রেখেছেন তামান্না। ঘরের বাইরে প্রতিনিয়ত এভাবেই নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা তারা নিজেদের মধ্যেই চেপে রাখার চেষ্টা করে থাকেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছরের নবেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ২৫৫ উত্ত্যক্তকরণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে ৩২৮ ও ২০১৫ সালে ৪৪৪ যৌন উত্ত্যক্তকরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা সংখ্যায় আরও বেশি বলে মনে করা হয়। কারণ, সব ঘটনার জন্যই পুলিশের কাছে অভিযোগ কিংবা পত্র-পত্রিকায় আসে না। এ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের ৯৭ ভাগ নারী যৌন হয়রানিকে সহিংসতা বলে মনে করেন। ৪৬ ভাগ নারী অশ্লীল ভাষার মুখোমুখি হন, ৮৫ ভাগ নারী মর্যাদাহানিকর উক্তির মুখে পড়েন। এছাড়া ৪৮ ভাগ নারী বাসচালক কিংবা ভাড়া আদায়কারীর কাছ থেকে অবমাননাকর ভাষা শুনে থাকেন। যৌন হয়রানির মতো কর্মকা-ের জন্যই দেশের শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকের প্রবেশ দিন দিন কমছে। গত ৩ বছরে নারী শ্রমিকের প্রবেশ কমেছে ২.৫ ভাগ। ২০১১ সালে শ্রমবাজারে নারী শ্রমিক ছিল ৩৬ ভাগ যা ২০১৩ সালে এসে দাঁড়ায় ৩৩.৫ ভাগে। শাপলা আক্তার ধানম-ির একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্রী। প্রতিদিন রামপুরা থেকে তাকে বাসে যাতায়াত করতে হয়। প্রতিটি বাসের সামনের ১০ সিট নারী ও প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বরাদ্দ থাকলেও বেশিরভাগ সময় তাতে পুরুষদেরই বসে থাকতে দেখা যায়। শাপলা বললেন, মেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেও তারা ওঠেন না বরং বলতে গেলে ঝগড়া করেন। অনেকেই বলে ওঠেন, যে আগে উঠবে সে আগে বসবে। এজন্য অনেক নারী দাঁড়িয়েই যাতায়াত করেন। এর ফলে ভিড়ের মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষরা উত্ত্যক্ত করার সুযোগ পান। সরকারের আইন থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের ঘৃণিত ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। কারণ, বেশিরভাগ নারীই এসব ঘটনায় পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানানোর সাহস পান না। অভিযোগকারীরা যদি তাদের অভিযোগ না জানান তবে অপরাধীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। এজন্য দেশের নারীর ওপরই বর্তায় যৌন হয়রানি কমানোর দায়িত্বটি। সরকারী উদ্যোগে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে হটলাইন ১০৯২১ কার্যকর করা হয়েছে, যা এখনও বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। টোল ফ্রি হেল্পলাইনটি (১০৯২১) সবার কাছে পৌঁছে দিতে ২০১৭ সালের পাঠ্যবইয়ের পেছনে এবং বাসের দেয়ালে লিখে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারার অধীনে যৌন হয়রানির ৩-৭ বছরের কারাদ- ও অর্থদ- সাজা দেয়ার বিধান রয়েছে। ২০০৯ সালের ১৪ মে উচ্চ আদালতের নীতিমালাতেও শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা আছে। কর্মস্থল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে ওই নীতিমালার ১১ ধারা অনুসারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারেন।