কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তবু ভালোবাসা জেগে থাকে প্রাণে

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • অরূপ তালুকদার

রবীন্দ্রনাথের পরে কোন বাঙালী কবি এই বাংলার জল হাওয়া মাটি আর প্রকৃতিকে জীবনানন্দের চাইতে বেশি ভাল বেসেছেন বলে আমার অন্তত মনে হয় না। কেননা শত দারিদ্র্য, কষ্ট, অবহেলা, অনাদর আর না পাওয়ার বেদনা সত্ত্বেও তিনি এই বাংলাতেই থাকতে চেয়েছেন সবসময়। দিনের পর দিন চাকরি নেই, আর উপার্জন নেই, সংসার চালাবার মতো তেমন প্রয়োজনীয় অর্থবিত্ত না থাকা সত্ত্বেও কখনও চাননি বাংলা ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে কোন কাজ করতে। যদিও তেমন সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি কখনও কখনও আত্মীয়স্বজন বা শুভার্থীদের কাছ থেকে। তবে একবার শুধু গিয়েছিলেন দিল্লীতে রামযশ কলেজে অধ্যাপনার কাজে। এই সুযোগটি করে দিয়েছিলেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের ভাইপো সুকুমার দত্ত। কিন্তু সেখান থেকেও কয়েক মাস পরে প্রায় পালিয়ে এসেছিলেন বিয়ে করা উপলক্ষে ছুটি নিয়ে। পরে আর ফিরে যাননি। এ থেকে বোঝা যায়, কিভাবে বাংলার প্রকৃতি আর মনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল, হয়ত তাঁর অজান্তেই। ত্রিশ বছর পার করা জীবনানন্দের সবে একখানা কাব্যগ্রন্থ বেরুলেও সে সময় তাঁর তেমন খবর ছিল না। অথচ এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, জীবনানন্দের সমসাময়িক অনেক কবিই পরিচিতি লাভ করেছিলেন কাব্যামোদিদের কাছে। কিন্তু তিনি ছিলেন তখন যেন সবার পেছনে। তাঁর সমসাময়িক, যদিও বয়সে তিনি তাঁদের চাইতে বড়। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, তিনি খ্যাতি বা পরিচিতিতে তখন এদের কাছাকাছিও ছিলেন না। সে সময় প্রকাশিত কোন কাব্য সঙ্কলনেও তার কোন কবিতা স্থান পায়নি। এমন পরিস্থিতিতে স্বভাবতই তিনি আপন মনোকষ্টে কাতর হয়ে থাকতেন।

জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ বলেছেন, এই রকম সময়ে জীবনানন্দ কর্মহীনতার দৈনন্দিন বিড়ম্বনায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন; দারিদ্র্যের ও পরমুখাপেক্ষিতার কারণে হতাশাগ্রস্ত, অপমানাহত বিক্ষুব্ধ, আত্মধিক্কার পীড়িত এবং কখনও কখনও সামান্য পরশ্রীকাতর এবং ঈর্ষান্বিত। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে আলোচনা বা কথা বলার আগে তাঁর এই বাস্তব জীবন চর্চার বিষয়টি আমাদের মনে রাখা জরুরী বলেই মনে হয়। কারণ কোন কবি যখন কবিতা রচনা করেন তখন তাঁর মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হয় বৈকি।

আমরা জীবনানন্দকে রূপসী বাংলার কবি, ‘নির্জনতম কবি’ বা ‘আত্মমগ্ন কবি’Ñযাই বলি না কেন-সবটাই ঠিক। কিন্তু তার পরেও বলা যায়, তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে অবহেলিত কবি ছিলেন তিনি। যিনি তাঁর জীবদ্দশায় অবহেলিত ও নিন্দিত হলেও মৃত্যুর পরে নন্দিত কবিদের একজন হয়ে উঠেছেন। এখন কত ঘটা করেই না তাঁর জন্মদিন মৃত্যুদিন পালিত হচ্ছে। ঘোষিত হয় তাঁর নামে পুরস্কারও। কিন্তু জীবনের সেই অস্থিরতার দিনগুলোতেও আপনমনে, বলা যায় সবার অগোচরে কবিতা লিখেছেন, কখনও কখনও গদ্যও লিখেছেন, যার মধ্যে আছে গল্প আর উপন্যাসও। তার মৃত্যুর পরে ধীরে ধীরে পাঠকদের হাতে পৌঁছেছে সে সব লেখা।

একেবারে প্রথম দিকে ‘ঝরাপালক’ প্রকাশিত হওয়ার পরেও কিন্তু পাঠকদের মনোযোগ তেমনভাবে আকর্ষণ করতে পারেননি তিনি। কিন্তু ‘ধূসর পা-ুলিপি’ প্রকাশের পর পরই অভূতপূর্ব সাড়া পান তিনি। প্রকৃতপক্ষে এই দুটি কাব্যগ্রন্থের কাব্য ভাষাই ছিল যেন একেবারে আলাদা। ধূসর পা-ুলিপির কবিতাগুলোই বলা যায়, রবীন্দ্র উত্তরকালে বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

যেমন : একে একে হরিণেরা আসিতেছে গভীর বনের পথ ছেড়ে,/সকল জলের শব্দ পিছে ফেলে অন্য এক আশ্বাসের খোঁজে/দাঁতের-নখের কথা ভুলে গিয়ে তাদের বোনের কাছে অই/সুন্দরী গাছের নিচে-জ্যোৎস্নায়!/মানুষ যেমন করে ঘ্রাণ পেয়ে আসে তার নোনা মেয়ে মানুষের কাছে/ হরিণেরা আসিতেছে।/তাদের পেতেছি আমি টের/অনেক পায়ের শব্দ শোনা যায়, ঘাই মৃগী ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায়।’

ধূসর পা-ুলিপির এই কবিতাটির নাম ক্যাম্পে। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। বড় করুণাবশত! সম্ভবত বিষ্ণু দে কবিতাটি নিজে নিয়ে গিয়ে দিয়েছিলেন সুধীন দত্তকে। ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশের পর কবিতাটির কোন কোন অংশ সম্পর্কে অশ্লীলতার অপবাদও উঠিয়েছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু তা-ই যদি হয় তাহলে কবি হিসেবে অপছন্দের জীবনানন্দের কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো সম্পাদকও কেন প্রকাশ করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।

‘নোনা মেয়েমানুষ’ শব্দ দুটি আসলে কতটা অশ্লীল সেটা বোঝাবার জন্য তর্কে শামিল হয়েছিলেন সে সময়ের অনেক কবি এবং সমালোচক। তাহলে কি জীবনানন্দের নতুন কাব্যভাষা সুধীন দত্তেরও মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিল?

জীবনানন্দের কবিতাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘চিত্ররূপময়’Ñএ কথার যথার্থতা আমরা কি পরে পাইনি! যে-কাব্য ভাষার জন্য জীবনানন্দ তৎকালীন সময়ের এবং তাঁর সমসাময়িক সব কবি থেকে আলাদা হয়ে গেলেন, বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করলেন, সেটা বুঝতে আমাদের কতটা সময় লাগল?

নির্দ্বিধায় বলা যায়, জীবনানন্দের এই নতুন কাব্যভাষার শুরু হয়েছিল ধূসর পা-ুলিপি থেকেই। যেমন : মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে/ আমার মুখের দিকেÑ ডাইনে আর বাঁয়ে/ পোড়ো জমি-খড়-নাড়া মাঠের ফাটল,/শিশিরের জল! মেঠো চাঁদ-কাস্তের মতো বাঁকা, চোখা-/ চেয়ে আছেÑএমনি সে তাকিয়েছে কত রাত নেই লেখাজোখা/(মাঠের গল্প) অথবা আমার এ গান/কোনদিন শুনিবে না তুমি এসে-/আজ রাত্রে আমার আহ্বান/ভেসে যাবে পথের বাতাসে- তবুও হৃদয়ে গান আসে। (সহজ), কিংবা মনে পড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার,/ কহিলাম, শোনো তবে-/শুনিতে লাগিল সবে,/ শুনিল কুমার;/ কহিলাম, দেখেছি সে চোখ বুজে আছে;/ ঘুমোনো সে এক মেয়ে-নিসাড়পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে; সেইখানে আর নাই কেহ-/একঘরে পালঙ্কের পরে শুধু একখানা দেহ/পড়ে আছে-পৃথিবীর পথে পথে রূপ খুঁজে/ তারপর তারে আমি দেখেছি গো-সেও চোখ বুজে/পড়েছিল-মসৃণ হাড়ের মতো শাদা হাত দুটি বুকের ওপরে তার রয়েছিল উঠি! (পরস্পর)।

ধূসর পা-ুলিপির সাধু চলতি মেশানো এই কাব্যভাষা, কখনও গদ্য, কখনও কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে ধরা দেয় পাঠকের কাছে যেনবা অনেকটা বিভ্রান্তির মতোÑবুঝতে সময় নেয় বেশ খানিকটা, হৃদয়ে ধারণ করতে মুখোমুখি হতে হয় আরও জটিলতার। বোধকে আরও শাণিত করে যেতে হয় কাব্যের গভীরতম উপলব্ধির জগতে।

এরই পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ঝরা পালকের কবিতার কোন লাইনÑ ‘আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরাপালকের ছবি’ ...পরিবর্তনটা বুঝতে একটুও সময় লাগে না।

কবি সমালোচক জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছেন, আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে সে সময় যারা খবর রাখতেন, তাদের কাছে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বাংলা কবিতার পাঁচ প্রধান আধুনিক কবির একজন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ‘আধুনিক’-ও নন, সে অর্থে বিষ্ণু দে ছিলেন আধুনিক, সবচেয়ে বিদগ্ধও নন, যেমন সংবর্ত’র কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সবচেয়ে আবেগমথিত কিংবা রোমান্টিকও নন বুদ্ধদেব বসুর মতো। তাঁর কবিতার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত ছিলেন, তারা তাঁকে উপভোগ করতেন তাঁর চিত্রকল্পের জন্য, তাঁর ইন্দ্রিয়তার জন্য, কিন্তু জীবনানন্দের শিল্প কি মনীষা বিষয়ে বিশেষ শ্রদ্ধা কারও ছিল না।’

প্রকৃতপক্ষে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’-এই দুটি কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অন্য কাব্যগ্রন্থগুলো সম্পর্কে তেমন হয়েছে বলে মনে হয় না। সুরে বেসুরে কবির অনেক কবিতা গানেও রূপান্তরিত হয়েছে। তবু এতসবের পরেও বলতে হয়, জীবনানন্দ দাশ এখনও যেন রয়ে গেছেন অনেকটাই অচেনা আমাদের কাছে। আর হয়ত সে জন্যই, আরও ভাল করে জানতে, কবিকে নতুন করে চিনতে আমরা বার বারই বুদ্ধদেব বসু আর ভূমেন্দ্র গুহের কাছে ফিরে যাই। কখনও কখনও যাই সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কাছেও। জীবনানন্দকে, তাঁর প্রতিভাকে আলোয় আনতে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা ছিল নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অনন্যসাধারণ।

১৯৩৫ সালে ‘কবিতা’ পত্রিকা প্রকাশের পর থেকে জীবনানন্দকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজটি সম্পন্ন করেন বুদ্ধদেব। তিনি কবির গ্রন্থভুক্ত ১৬২টি কবিতার ১১৪টি কবিতাই প্রকাশ করেছিলেন ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘বনলতা সেন’সহ। বুদ্ধদেব মনেপ্রাণে তখন চাইছিলেন জীবনানন্দের কবিতা তাঁর মতো করে অন্যরাও ভাল বাসুক।

আমরা দেশ বিদেশের যত মহৎ কবিদের কথা জানি তাদের অনেকেরই জীবন যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তাদের চলতে হয়েছে জীবনের বন্ধুর পথে। আর হয়ত সে জন্যই দীর্ঘজীবন পাননি অনেকেই। চলে গেছেন অকালেই, বঞ্চিত করে গেছেন সবাইকে। জীবনানন্দেরও জীবনের শেষ দিকের অনেকটা সময় কেটেছে নানা সমস্যায় জর্জরিত বিস্তৃত অবস্থায়। আত্মমগ্ন কবি মুখ ফুটে তেমন কিছু বলেননিও কাউকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়েছিলেন সবার চোখের আড়ালে। তাই প্রায় সময়েই মনোকষ্ট লুকিয়ে, প্রায় নির্বাক, চলাফেরা করতেন আত্মমগ্নতার মধ্যে আনমনে, সবাইকে পাশ কাটিয়ে। যে কারণে তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুও আমাদের বড় মর্মান্তিক বলে মনে হয়েছে। অথচ... অসহিষ্ণু পৃথিবী কি কোনদিন শুনিতেছে/ জীবনের কথা?’

অন্নদাশংকর রায়ের কাছে জীবনানন্দ ছিলেন ‘বিশুদ্ধতম কবি।’ নীহাররঞ্জন রায়ের কাছে ‘মহোত্তম কবি।’ আর জীবনানন্দের জীবদ্দশায় যিনি ছিলেন তাঁর কঠোরতম সমালোচক সেই সজনীকান্ত দাস কবির মৃত্যুর পরে বলেছিলেন, ‘তিনি ভঙ্গি ও ভানসর্বস্ব কবি ছিলেন না। তাহার অবচেতন মনে কবিতার যে প্রবাহ অহরহ বহিয়া চলিত, লেখনীমুখে সজ্ঞান সমতলে তাহার ছন্দোবদ্ধ প্রকাশ দিতে প্রয়াস করিতেন।... এই হানাহানি কলহ বিদ্বেষ কণ্টকিত পৃথিবীতে এই উদার হৃদয় প্রসন্ন প্রেমিক কবিকে পদে পদে আমাদের মনে পড়বে।’

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: