রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুস্তাফিজের গুণগান সবার মুখে

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫
  • বিউটি পারভীন

চোখ ঝলসানো ঝলমলে এক অভিষেক! সবাইকে চমকে দেয়ার মতো নিজেকে প্রদর্শন। ভারতীয় ক্রিকেট দলের কাছে অনাহুত আগন্তুক হিসেবে এসে সর্বনাশ ডেকে এনেছেন। এভাবেই বাংলাদেশের বোলিং বিভাগে ভোরের নতুন সূর্যের মতো উদিত হয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। ১৯ বছর বয়সী এ পেস বিস্ময় ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক সিরিজেই বাজিমাত করেছেন। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সর্বাধিক ১৩ উইকেট নিয়ে নয়া বিশ্বরেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন। এ কারণে ক্রিকেট বিশ্বের চারদিকে এখন শুধু মুস্তাফিজ নামে স্তুতিবাক্য। সতীর্থরা তো বটেই ভারতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটাররা এবং বিশ্ব ক্রিকেটের সাবেকরা মুস্তাফিজের অভূতপূর্ব এ আগমন নিয়ে অবাক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

মুস্তাফিজ কোথা থেকে এলেন? প্রথম ওয়ানডেতে স্কোয়াড ঘোষণার পর বাংলাদেশ দলে চার পেসারের নাম দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিল বৈকি ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে চার নম্বর পেসার হিসেবে একেবারে অচেনা, অজানা মুস্তাফিজুরের নাম দেখেও সেদিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেয়নি ভারত। কিন্তু বাংলাদেশ ইনিংস শেষ করার পর ভারতীয় ইনিংসের শুরুতেই বোলিং প্রান্তে কে ওটা? বার বার চোখ রঙ্গাতে লাগলেন রোহিত শর্মা ও শিখর ধাওয়ান। ভূত দেখার মতোই চমকে উঠেছে ‘হোম অব ক্রিকেটে’ আগত দর্শক-সমর্থকরাও। কারণ বল হাতে প্রথম ওভারেই এসেছেন ১৯ বছর বয়সী অচেনা মুস্তাফিজ। বিমূঢ়তা কাটার আগেই টানা ৬ বলে একের পর এক সুইং, সেøায়ার আর কাটারে গতবিহ্বল করে দিলেন তিনি ওয়ানডে ক্রিকেটে দুটি ডাবল সেঞ্চুরির বিস্ময়কর অধিকারী রোহিত। প্রথম বলেই তার বিপক্ষে এলবিডব্লিউর জোর আবেদন তুলে স্টেডিয়াম এলাকায় গুঞ্জন তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই গুঞ্জনটা প্রকম্পিত চিৎকারে পরিণত হলো ম্যাচ শেষ হওয়ার খানিক আগেই। কারণ অভিষেক ম্যাচেই ৫০ রানে ৫ উইকেট শিকার করে ভারতীয় ব্যাটিংয়ে ধ্বংস ডেকে এনেছেন মুস্তাফিজ। তরুণ এ রোগা-পলকা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি দীর্ঘের সদ্য কৈশোর পেরোনে শরীরে অনেক তেজ লুকনো আছে। চোখে আগুন না জ্বললেও সুপ্ত আছে টগবগে লাভার আগ্নেয়গিরি। এ কারণেই ধ্বংস ডেকে এনেছেন পরের ম্যাচে আরও ভয়ঙ্করভাবে। নিয়েছেন ৪৩ রানে ৬ উইকেট। ক্যারিয়ারের তৃতীয় ম্যাচেও মুস্তাফিজ দুই উইকেট শিকার করেন।

ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে কোন বোলার ক্যারিয়ারের প্রথম তিন ম্যাচে এমন সাফল্য পাননি। আর সেজন্যই মুস্তাফিজকে নিয়ে এত মাতামাতি চারদিকে। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ বাঁহাতি স্পিনারে। যে কোন প্রতিপক্ষই বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে হিসেব কষে এ দেশের বাঁহাতি স্পিনারদের মোকাবেলার। পরিকল্পনা করে সেভাবেই। কিন্তু সময় বদলেছে। ওই বিষয়টির জন্যই মাশরাফি ভারতকে ভড়কে দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বেছে নিলেন একেবারেই অচেনা মুস্তাফিজকে। ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন তরুণ মুস্তাফিজকে। মুস্তাফিজের অভিষেক নিয়ে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেন, ‘আরাফাত সানি খুব ভাল বোলিং করছিল। ওকে বাদ দেয়া কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা মনে করেছিলাম মুস্তাফিজকে খেলানো দরকার। অনুশীলনে ওকে যেমন দেখেছি, তাতে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত সাহস করে আমরা ওকে নিয়েছি। ফলও পেয়েছি। আসলেই ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ।’ দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আগেই মুস্তাফিজকে চেনা হয়ে গেছে। টানা দু’দিনের বিরতিতে মুস্তাফিজের ভিডিওচিত্র গবেষণায় কাটিয়ে দিয়েছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। কিভাবে তাকে অকেজো করা যায়, কিভাবে তার আক্রমণকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া যায়। এ কারণে বাংলাদেশের কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহেও বলেছিলেন, ‘এবার তার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। আমরা দেখব মুস্তাফিজ দ্বিতীয় ম্যাচে কতটা ভাল করতে পারেন।’ মুস্তাফিজ সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন। উঠলেন হিমালয় উচ্চতায়। গড়লেন বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু মুস্তাফিজকে এভাবেই রাখতে হবে দীর্ঘদিন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক বলেন, ‘মুস্তাফিজ খুব ভাল বোলিং করছেন। আমি মনে করি বেশি প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং সহায়তা করতে হবে একইভাবে চলার জন্য। তিনি এখনও যথেষ্ট তরুণ। আমরা তাকে কিভাবে সামাল দেব সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। এখানে কোন জাদুকরী কৌশল নেই। শুধু নিশ্চিত করতে হবে সে যেন দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ পর্যায়ের অনুশীলন করে। তিনি ১১ উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু আমরা সবসময় তার কাছ থেকে ৫ উইকেট প্রত্যাশা করতে পারি না। আমরা যদি তার প্রতি যতœবান হই এবং যথেষ্ট সমর্থন জোগাই তিনি আমাদের জন্য অনেক বড় ম্যাচ উইনার হয়ে উঠবেন।’ এসব তো গেল বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কথা। ভারতীয়রাও প্রতি মুহূর্তে মুস্তাফিজ আতঙ্কে কাটিয়েছে। কারণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বে এমন অনেক বোলার ভীতিকর হিসেবে পদার্পণ করেছেন, কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। যেমন শ্রীলঙ্কার অজন্তা মেন্ডিস, নিউজিল্যান্ডের শেন বন্ড ও জিওফ এ্যালট। এরা হারিয়ে গেছেন। এ কারণেই ভারতীয় অফস্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন বললেন, ‘তিনি যা করেছেন সে জন্য আসলেই ভাল লাগছে। সত্যি কথা হচ্ছে আমি মনে করি তারা অনেক ভাল বোলার। মুস্তাফিজুর, তাসকিন। আপনাকে এদের কৃতিত্বের প্রশংসা করতেই হবে। এর মধ্যে অনেকেই হয়ত এখন বাইরে চলে গেছে। কিন্তু যখনই তারা ফিরবেন তখনই বিস্ময়ের ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। আমি মনে করি এখান থেকেই তার জন্য চ্যালেঞ্জ শুরু হলো। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে এ নৈপুণ্যই যে কারও চেয়ে ভাল বলে জানি। তাই এখন মানুষ তার নৈপুণ্য দেখার জন্য আসবে।’ ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি বললেন, ‘ওর কব্জির ক্ষমতা বেশ ভাল। একই এ্যাকশনে হুট করে গতি কমবেশি করছে সেটা বোঝাই যায় না। তাই তার সেøায়ারটা মারাত্মক হয়ে যায়।’ প্রথম ওয়ানডের পর দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে একদিন দলের নির্ভরযোগ্য মিডলঅর্ডার সুরেশ রায়না মুস্তাফিজ সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা তার কাটার মোকাবেলার জন্য ভালভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। সবাই তার বিপক্ষে সতর্ক থাকব। যেহেতু তাকে বুঝে উঠতে সমস্যা হচ্ছে তাই আমাদের পরিকল্পনা যতটা সম্ভব মুস্তাফিজকে দেখেশুনে খেলা।’ মাত্র একটা ওয়ানডে খেলেই প্রতিপক্ষ শিবিরের এভাবে ভাবনার ব্যক্তি হয়ে ওঠা কিংবা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকাটা সত্যিই অবাক করার মতো ঘটনা।

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: