মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাজেট ২০১৫-১৬ বাস্তবায়ন কঠিন তবে অসম্ভব নয়

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

তখন বিকেল। সকলেরই চোখ টিভি পর্দায়। নয়ত কান সজাগ রেডিওতে। গভীর মনোযোগে সবাই দেখছিল, শুনছিল বাজেট বক্তৃতা। এটি গত বৃহস্পতিবারের দৃশ্য। অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার পর এ নিয়ে সর্বমহলে শুরু হয়ে গিয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। যত ভাল বাজেটই ঘোষিত হোক না কেন, সমালোচনা হবেই। সীমিত সম্পদের সাহায্যে অসীম অভাব পূরণ করা অসম্ভব। তবু সব বুঝেও সমালোচনা না করলে ইজ্জত থাকে না আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের। আর তাই ভাল দিকগুলো না দেখে তারা খুলে বসে সমালোচনার ঝুড়ি। এবারও তাই হয়েছে। অথচ এবারের বাজেটের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে।

এক নজরে বাজেট

এবারের অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ২৯৫১০০ কোটি টাকা। এরমধ্যে অনুন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় হবে ১৮৪৫৫৯ কোটি টাকা এবং উন্নয়নমূলক কাজে ১০২৫৫৯ কোটি টাকা। অনুন্নয়নমূলক খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয় হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ঋণের সুদ পরিশোধে। উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ( এডিপি) তে ৯৭০০০ কোটি টাকা এবং এডিপি বহির্ভূত খাতে বাকি অর্থ ব্যয় হবে। বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২,০৮,৪৪৩ কোটি টাকা। এই রাজস্ব আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্র্ড ( এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর থেকে প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ১৭৬৩৭০ কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে প্রাপ্তি ৫৮৭৪ কোটি টাকা, কর ব্যতীত প্রাপ্তি ২৬১৯৯ কোটি টাকা, বৈদেশিক অনুদান ৫৮০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বাজেটের আকার এবং আয়ের মধ্যে ঘাটতি ৮০৮৫৭ কোটি টাকা। এই ঘাটতি জিডিপির ৪.৭ শতাংশ। ঘাটতি পূরণে সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেবে ৫৬৫২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ৩৮,৫২৩ কোটি, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫,০০০ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা নেয়া হবে। আর বিদেশী উৎস থেকে নেয়া হবে ৩২,২৩৯ কোটি টাকা ঋণ ও অনুদান।

অগ্রসর হবে দেশীয় শিল্প

দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে দেশীয় শিল্পের প্রসার ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। এ জন্যই এবারের বাজেটে দেশীয় বেশ কিছু শিল্পপণ্যকে কর অবকাশ সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে অটোমোবাইল প্রস্তুতের মতো ভারি শিল্প গড়ে উঠেছে। এ খাতকে প্রসারিত করতে এ খাতে কর অবকাশ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংযোগশিল্প হিসেবে গাড়ির চাকা উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানকেও কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব টানেল কিলন পদ্ধতিতে ইট প্রস্তুত ও বাইসাইকেল প্রস্তুতকারী শিল্পকেও কর অবকাশের আওতায় রাখা হয়েছে। ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী শিল্প, পোল্ট্রি শিল্প, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি তৈরিকরণ শিল্প এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল ও উপকরণ যে শুল্ক ও কর রেয়াত পেয়ে আসছে, তা বজায় থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কর ও শুল্কে অবকাশ দিয়ে এবারের বাজেটকে দেশীয় শিল্পের অগ্রযাত্রার বাজেটে পরিণত করা হয়েছে।

শিক্ষার আলোয় বাজেট

শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকার যে সর্বদা সচেষ্ট, তা আবারও এ বাজেটের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হলো। জাতীয় বাজেটের তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত শিক্ষা ও প্রযুক্তি। এবারের বাজেটে শিক্ষা এবং প্রাথমকি ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ৩১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২১ কোটি টাকা। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী করার জন্য দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘কুদরত-ই-খুদা’ শিক্ষা কমিশন সুপারিশ করেছিল। সেই থেকে প্রতিটি শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষানীতিতে এই সুপারিশ করা হলেও তা সুপারিশেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষাকে ২০১৮ সাল নাগাদ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে যা আশাব্যঞ্জক। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিকটার প্রতি লক্ষ্য রেখে ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি উপজেলায় একটি করে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে গার্লস টেকনিক্যাল স্কুল, ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চারটি বিভাগীয় শহরে চারটি মহিলা পলিটেকনিক এবং সব বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এ বাজেট গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু ও নারীবান্ধব

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। অথচ এই শিশুদের অনেকেই অবহেলায় বেড়ে ওঠছে। বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকার থেকে। এদের কল্যাণের কথা বিবেচনায় এনে এদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য করা প্রথমবারের মতো করা হয়েছে শিশু বাজেট। যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলা যায় নিঃসন্দেহে। সরকার ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি ফর চাইল্ড ফোকাসড বাজেটিং ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে যার মাধ্যেমে শিশুদের কল্যাণে বরাদ্দকৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করা হবে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্তমান সরকারের আমলে নারীর অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃষ্টি কাড়ার মতো। তারপরেও এখনও নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে আছে। সমাজে জেন্ডার ইকুইটি আসেনি। সেদিকে দৃষ্টি রেখে এবারের বাজেটে নারীদের জন্য আগের সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, ক্যাটারিং প্রশিক্ষণ, নারী আইসিটি ফ্রি-ল্যান্সারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করা হচ্ছে যা জেন্ডার ইকুইটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটে সুখবর

এবারের বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে বেশ সুখবর এসেছে। স্টক একচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানি তার পরিশোধিত মূলধনের ২০ শতাংশ শেয়ার আইপিওর মাধ্যেমে ছাড়লে ঐ কোম্পানি ঐ বছরের প্রযোজ্য আয়করের ওপর ১০ শতাংশ কর রেয়াত পাবে। ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে উৎসে কর আদায় থেকে ছাড় দেয়া হয়েছে। নতুন কোন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে চাইলে তার জন্য ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াতের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বাজারের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

বন্ড মার্কেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশেষ করে সরকারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখে বন্ড মার্কেট। এই বন্ড মার্কেটকে চাঙা করার জন্য এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের সুদের ওপর উৎসে ৫% হারে আরোপিত কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বন্ড মার্কেট রমরমা হয়ে উঠবে আশা করা যাচ্ছে।

প্রবাসীদের প্রণোদনা ও বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা

জনশক্তি রফতানি দেশের রেমিট্যান্সে সর্বাধিক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারপরেও এরা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। আবার এদের অনেকে বৈধ চ্যানেলে টাকা না পাঠিয়ে হুন্ডিসহ অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাচ্ছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এবারের বাজেটে এ দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার ওয়েজ ওনার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, ইউরো ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, ইউরো প্রিমিয়াম বন্ড, পাউন্ড স্টার্লিং ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ও পাউন্ড স্টার্লিং প্রিমিয়াম বন্ডের অর্জিত সুদ আয়কে কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হবে বলে আশা করা যায়।

নতুন পে-স্কেলে স্বস্তি

দীর্ঘদিন ধরেই সরকারী চাকরিজীবীদের স্বল্প বেতনের কারণে জীবনযাপনে নাভিশ্বাস উঠছিল। একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্র্মকর্তা যে বেতন পেতেন, তা বাস্তবিক অর্থে ঢাকাশহরের একজন রিক্সাওয়ালার আয়ের চেয়েও কম ছিল। এবারের বাজেটে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এদের কল্যাণার্থে ‘সমৃদ্ধি সোপান ব্যাংক’ নামে একটি বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবে। এছাড়া পেনশন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পেনশন ফান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দিয়েছেন, যা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন

দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন। বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন করতে হবে। এ দিকটির প্রতি লক্ষ্য রেখে এবারের বাজেটে ভৌত অবকাঠামো খাতে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মোট বরাদ্দের ৩০.৬% এ খাতে ব্যয় করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লি উন্নয়ন খাতে ১৩.৯%, যোগাযোগ খাতে ৮.৯%, বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে ৬.৩% প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দের মধ্যে দিয়ে সরকার যে শক্ত অর্থনৈতিক ভিত তৈরি করতে বদ্ধপরিকর, তাই জানান দিয়েছে।

বেড়েছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা এবারের বাজেটে বাড়ানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৩০ লাখ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ১২ হাজার থেকে ১১ লাখ ১৩ হাজার, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উপবৃত্তির সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার, দরিদ্র মায়েদের মাতৃকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে এবারের বাজেটে। এছাড়াও ভাতার পরিমাণও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ৬৫ বছর অতিক্রম করেছেন তাদের সবার মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দেশের মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রতি যে বর্তমান সরকারের যে সদিচ্ছা তারই প্রতিফলন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম

কোন জিনিসের দাম বেড়েছে, কোন জিনিসের দাম কমেছে এটাই থাকে বাজেটে সাধারণ মানুুুুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। জনকল্যাণমুখী সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেন না বাড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। এবারের বাজেটেও সেই প্রতিফলনই দেখা গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমিয়ে বিলাসজাত দ্রব্যর দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে। এটাই কাম্য ছিল সাধারণ মানুষের। বিভিন্ন প্রকারের ওষুধ, খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিকের তৈজসপত্র, পোশাক ইত্যাদির দাম কমার ইঙ্গিত রয়েছে এবারের বাজেটে। যা দেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য আশার বাণী বয়ে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ক্ষতিকারক সিগারেট, বিদেশী পণ্য, বিলাসজাত পণ্য, সুপারশপ ও অনলাইনে কেনাকাটায় খরচ বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। তবে এসব জিনিসপত্রের বেশিরভাগই দেশের ধনীক শ্রেণী ব্যবহার করে বিধায় আপামর জনসাধারণের জীবনে এই বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে না বলে আশা করা যায়।

সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি

এবারের বাজেট সাধারণ করদাতাদের জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে। স্বস্তির কারণ করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি। করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ছিল দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। এই ত্রিশ হাজার টাকা বাড়ানোর কারণে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন করের হাত থেকে রক্ষা পেল। এছাড়া নারী ও বয়স্ক, প্রতিবন্ধী এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ছিটমহলবাসীর উন্নয়নে বাজেট

ছিটমহল সমস্যা নিরসনে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি হলেও দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পর তা মিটমাট হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৎপরতার কারণে ভারতীয় সংসদে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল পাস হওয়ায় ছিটমহলবাসীর সমস্যার সমাধানের হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত ছিটমহলবাসী বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে। এবং এদের সকল নাগরিক সুুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে দিকটির প্রতি দৃষ্টি রেখে এবারের বাজেটে ছিটমহলের উন্নয়নে দু’শ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এটি ছিটমহলবাসীর জন্য আশার বাণী বয়ে আনছে।

রয়েছে কিছু সমস্যাও

সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে অনেক খাতে বরাদ্দ কমাতে হয়েছে। করবৃদ্ধি করতে হয়েছে বেশ কয়েকটি খাতে। এই যেমন মোবাইল সিম বা সিমের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবায় ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে যার ফলে মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বাড়বে। বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১২ কোটি ৪৭ লাখের বেশি। আর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী চার কোটি ৪২ লাখের বেশি। দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষই মোবাইল ব্যবহার করে বিধায় এক্ষেত্রে সবাই বেশি ব্যয়ে কথা বলতে বাধ্য হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে গেছে এবারের বাজেটে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪.৮১%, এবার তা ৪.৩০%। ফলে বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে গরিব জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যবিমুখ বাজেট বলে অভিহিত করছেন। এতে পাবলিক সেক্টরের স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং ফুলে-ফেঁপে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে প্রাইভেট সেক্টরের স্বাস্থ্যসেবা। এছাড়া জরুরী অনেক চিকিৎসা উপকরণের আমদানির ওপর শুল্কহার বাড়ানো হয়েছে।

এবারের বাজেটে পোশাক মালিকদের ওপর বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে দশমিক ছয় শতাংশ উৎসেকর আছে, তা বৃদ্ধি করে ১ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে বাজেটে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গার্মেন্টসকর্মীরা। কেননা এই ছুঁতোয় গার্মেন্টস মালিকরা কর্মীদের বেতন নিয়ে টালবাহানা শুরু করতে পারেন।

বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে, তবে অসম্ভব নয়

২ লাখ ৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা এবারের বাজেটের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যার মধ্যে রাজস্ব বোর্ড আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। বর্তমান বছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এ বছরের আদায়ের হার ৩০.৬২% বেশি। অনেক অর্থনীতিবিদই এবার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এই রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কারণ, কর কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়েছে, দক্ষতাও বেড়েছে। চিহ্নিত করা হচ্ছে নতুন নতুন করদাতা। চলতি অর্থবছরে এনবিআর কর আদায়ে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এসবই প্রমাণ করে সম্ভব। তবে এনবিআরকে খাটতে হবে। সঠিক করদাতার সংখ্যা নির্ণয় থেকে শুরু করে কর আদায়ে স্বচ্ছতা সৃষ্টি করতে পারলে এ বিশাল রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের মনিটরিং কার্যক্রমকে বেগবান করতে হবে।

বাজেট নিয়ে আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো ঘাটতি বাজেট। ৮০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার ঘাটতির মধ্যে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ খাত হতে আসবে। যার মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোয় এত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা যাবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাছড়া বিদেশ থেকে অনুদান ও ঋণ যদি কাক্সিক্ষত পরিমাণ না পাওয়া যায় তবে ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি চাপ পড়বে। এতে বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এজন্য সরকারকে বিকল্প অর্থায়নের জন্য আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে বিদেশী অনুদান বেশি সংগ্রহ করা গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

চাচা, ঢাকা কত দূর? এইতো আর অল্প। নাটকের এমন কথামালাকে বর্তমান অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায় নির্দ্বিধায়। মধ্যম আয়ের দেশ হতে আর কত বাকি, এমন প্রশ্নের জবাবে এখন বলা যেতেই পারে এই তো আর অল্প। অল্পকিছু সময়। তারপরেই বর্তমান সরকারের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি পূরণ। সেই প্রতিশ্রুতি, সেই স্বপ্ন পূরণের প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের বাজেটে। ৭% প্রবৃদ্ধি অর্জন যেমন সম্ভব, তেমনি সম্ভব মূল্যস্ফীতিকে ৬.২ শতাংশে নামিয়ে আনা। সম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করা। বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে, তবে সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়ার সামর্থ্যও আছে সরকারের। সেই সামর্থ বাস্তবায়নে সরকার কি শেষ পর্যন্ত সক্ষম হবে?

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫

০৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: