কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘কালো বরফ’-এর অন্তর্জগত

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ

মাহমুদুল হক (১৯৪১-২০০৮) এর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-চব্বিশ পরগনার বারাসাতের কাজীপাড়ায়। ছোটগল্পের মধ্যদিয়ে বাংলা সাহিত্যাকাশে উদয় হলেও, তার ঝোঁকটা বরাবরই উপন্যাসের প্রতি ছিলো সে কথা অনস্বীকার্য।

‘কালো বরফ’ উপন্যাসে দেশভাগের পটভূমি ব্যাপকভাবে উঠে এলেও লেখকের কাছে ছিচল্লিশের দাঙ্গা এবং সাতচল্লিশের দেশবিভাগ প্রাসঙ্গিক বলে কখনই মনে হয়নি। উপন্যাসে তাই আমরা দেখি শেকড় হারাবার বেদনায় তিনি বিমর্ষ, বারংবারই ঘুরে ফিরে দেখাতে চেয়েছেন তার ছিঁড়ে যাওয়ার রহস্য। রহস্য প্রাসাদের সদর কপাটও উন্মুক্ত করে দেন মাহমুদুল হক, দেশভাগের রক্তক্ষরণের ভাষিক শিল্পরুপ প্রকাশিত হয়। শৈশব-কৈশোর তাড়িত এক ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বা উন্মোচিত হয়েছে। সেটা তার একেবারে নিজস্ব, এখানে অন্য কেউ নয়, তার বুদ্ধি-যুক্তি একান্ত তারই মতো করে। হাসান আজিজুল হক এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘তুমি যেখানে বড় হয়েছো, সারাজীবন তার যে দুর্দমনীয় আর্কষণ, কখনও সেটাকে অস্বীকার তো দূরের কথা, কখনই তুমি এটার হাত থেকে নিস্তার পাবে না, তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে, বিশেষ করে সেখান থেকে তুমি যদি অন্যত্র সরে যাও’।

হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ-দাঙ্গা দ্বেষ-ক্ষোভ এবং মিলন তার কাছে বড় বেশি স্বাভাবিক সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বৈরথ। তার কাছে মুখ্য বিষয়টা হলো শেকড়হারা-বাস্তুছাড়া-শৈশবের জীবনহারা মানুষদের কেউ-কেউ অনিকেত বোধে আক্রান্ত হয়ে বয়ে বেড়ায় গভীর অসুখের অস্থিরতাকে, আর তাই দেখি আবদুল খালেককে, কখনও গিরিবালা, কখনও মাধুকে খুঁজতে। জীবন-রহস্যের জটিল দৃশ্যায়ন দেখতে পাওয়া যায় এ উপন্যাসে। তখন মনে হয় সত্যিই মানুষের জীবন কতোটা কঠিন।

আবদুল খালেককে অহর্নিশি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তার শৈশব, অনেক পেছনে ফেলে আসা সেই কৈশোর, আর চিরচেনা সেই সমস্ত কাছের মানুষগুলো। সোনারকাঠি রূপারকাঠিতে মোড়ানো তার সেই স্বর্ণোজ্জ্বল শৈশবই দিনযাপনের ঘানি থেকে মুক্তি দেয়, নিজেকে তখন মুক্ত বিহঙ্গ ভাবে, খুঁজে পায় অন্য আরেক জগত। শৈশব যে কি মধুর তার রহস্য অর্থাৎ কূল-কিনারা কেউ পায়, আবার কেউ পায় না, এই পাওয়া-না পাওয়ার রেশ ধরেই মাহমুদুল হক পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘কালো বরফে’র সাথে।

কালো বরফ নিয়ে বলতে গেলে বলতেই হয়, স্বদেশভাগ-প্রেম-কান্না-রোদনময়তা যেমন দেখি, আবার শুনতে পায় শৈশবের আকুতি। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত দেশ বা মাটিÑ যে দেশ বা মাটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। মফস্বলের কলেজ শিক্ষক প্রথাবিচ্ছিন্ন মানুষ আবদুল খালেক এবং তার অর্ন্তজগতের সম্রাট পোকা, এই নিয়েই তো ‘কালো বরফ’। পোকা আবদুল খালেকের শৈশব, আবদুল খালেক পোকার মেটামরফসিস জাতীয় রুপান্তর। আবদুল খালেক একজন বিচ্ছিন্ন এবং নিঃসঙ্গ মানুষ, যে নিজেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, বলা যায় খানিকটা পিছিয়ে পড়া দলের মানুষ। এই দলছুট মানুষটির, তার শৈশব-কৈশোর ও বর্তমান এবং উভয়ের সমন্বয়ই চিত্রায়িত কতকগুলো স্মৃতি-বিস্মৃতি দৃশ্যপটই ‘কালো বরফ’।

কালো বরফ-এ ছোট-বড় অনেক চরিত্র আছে, আরও আছে মজার অভিজ্ঞতা। জীবনকে এতো কাছ থেকে দেখার সে অভিজ্ঞতা ক’জনের হয়, জীবনসত্ত্বার কতো কিছুই তো আমরা দেখেও দেখি না। শুধু তাই বা বলি কেন, মাহমুদুল হক তার সমস্ত উপন্যাস জগতকে এর ভেতর চালিত করেছে। এবং সমগ্র জীবনকে কেটে-ছিঁড়ে ভাগ-বাটোয়ারা করে কালো বরফ নির্মিত করেছেন। কোথাও ফাঁকির আশ্রয় নেননি, নিজেকে পরিপূর্ণ সম্পৃক্ত করে সাজিয়ে-গুছিয়ে তুলেছেন।

উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সেই বোধহয় প্রথম তার ছিঁড়ে গেল সবকিছু, সে তার আর কখনো জোড়া লাগলো না, আর কখনো জোড়া লাগবে না’। সেই তার মানে সম্পর্কের তার, দেশ ভাঙার তার, হৃদয় ভাঙার তার, আত্মীয়-স্বজন পরিবেশ-পরিচিতি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার তার, বাল্যস্মৃতি আর বাল্যসঙ্গীদের থেকে ছিন্ন হওয়ার তার, যে তার আর কখনো জোড়া লাগবে না এবং সম্ভবও নয়। রেডক্লিফ নামের ব্যক্তিটি ভারতবর্ষের মানচিত্র কাঁটাছেঁড়া করে, বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে হাজার বছরের যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে নিক্ষেপ করেছে, তারই যন্ত্রণায় দগ্ধ একজন ছিন্নমূল মানুষ মাহমুদুল হক। সেদিন রেডক্লিফ কি জানতো দেশভাগ কতখানি হৃদয়াকাশকে ছিন্নভিন্ন করবে উভয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে, যারা হয়তো তেমনভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয় অথবা ওসবের ঘেরাটোপের মধ্যে যেতেও চায় না, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত তারাই বেশি হবে। আবেগ দিয়ে বিচার করলে হৃদয় ভাঙার এই কষ্ট কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়।

মাহমুদুল হকের শৈশব বড় মধুর ছিল বলতেই হয়, সে স্মৃতি কখনও ভোলার নয়, বারংবার হাতছানি দিয়ে ডাকে, নিজেকে তখন আড়াল রাখতে পারে না, পোকার মধ্যে হারিয়ে যায়, নিজেকে শৈশবের পোকাতে দেখতে চায়। সাধুখাঁদের ছেলে পাঁচু কাঁচের যে চুড়ির শেকল উপহার দেয়, সেটি তার বোন ঝুমির, পুঁটি নামের যে আলতাপরা মেয়েটি রোজ পুকুরঘাটে গুচ্ছের পেতল-কাঁসার থানাবাসন মাজতো, কখনও সে মাছের সঙ্গেÑ গাছের সঙ্গে কত কথা বলতো। সেও ছিল পোকার শৈশবের সঙ্গী। আবদুল খালেক সেই পুঁটিকে খুঁজে ফেরে, সে খোঁজার যেন বিরতি নেই। দেশভাগের অন্তবেদনার চেয়েও স্বজন হারানোর কষ্ট তাকে কুঁরে-কুঁরে নিঃশেষ করে, তখন সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে বাস্তব জগত থেকে অন্য কোথাও।

পাঠক অবশ্য জানে আবদুল খালেক মানুষটি একজন গোবেচারা ধোপদুরস্ত ধরনের, সংসারের প্রতি, স্ত্রী বা ছেলের প্রতি তার কোন দায়-দায়িত্ব নেই বা, যেন সে সর্বসময় পালিয়ে বাঁচতে চায়, নিজের কাছ থেকে নাকি সংসারজীবন থেকে তার এই পলায়ন, নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রাখতে চায়, আসলে সে কোন কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে না। একটা হাহাকার একটা রোনাজারি তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, তা হয়তো বাইরের কেউই অনুধাবন করতে পারে না। যৎসামান্য বেতনে সংসার ঠেলেঠুলে চলে, আর তাই ধার-দেনা আর রেখার সার্বক্ষণিক খিটিমিটি ব্যবহার চলতে থাকে। একটু বাড়তি আয়ের আশায় সবাই যখন বিভিন্ন কর্মে ব্যস্ত, সে সময় আবদুল খালেক বেসরকারী কলেজের চাকরির ওপর নির্ভরশীল। নরহরি ডাক্তারের চেম্বারে কদাচিৎ সময় কাটায়, সুখ-দুঃখের গল্প করে, এই ডাক্তার বাবুকেই পাঠক উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের স্বজনব্যক্তি হিসাবে দেখেন।

শৈশবের পোকা (উত্তমপুরষে লেখক বয়ান করেছেন সবিস্তারে, আবদুল খালেকের মুখ দিয়ে) ‘কেনারাম বাবুর দেওয়া নাম, তিনি ছিলেন আব্বার বন্ধু, আমরা ডাকতাম কাকা, কেনারাম কাকাই জানেন আমার নাম পোকা দিয়েছিলেন কেনো, পোকা...পোকা...পোকা আছিস...এই বলে তিনি হাঁকডাক শুরু করে দিতেন।’ কেনারাম কাকার সঙ্গে পোকার বেশ সম্পর্ক ছিলো, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, পান্তুয়া-রসগোলা খাওয়ানো।

মাহমুদুল হক বাঙালীর গল্পকথন-রীতিতে তার নিজস্ব উপস্থাপনা কৌশলের আশ্রয় অত্যন্ত নাটকীয়, তারপরও কোথায় একটা প্রশ্ন যেন রেখেই দেয়। তার উত্তর মেলে না সহজে। মনকে জাগ্রত করে, উন্মেচিত করে কখনও হয়তো আরও প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: