মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

উৎসবমুখর বিদায় জাভির

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫
  • মাহমুদা সুবর্ণা

জাভিয়ের হার্নান্দেজ। বার্সিলোনা আর স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণ। দুই যুগ আগে তার স্বপ্নযাত্রার শুরু। পরের গল্পটা তো সবারই জানা। সময় যত গড়িয়েছে ততই বার্সার মাঝমাঠের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেন তিনি। গড়েছেন কাতালান জার্সিতে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। অবশেষে শনিবার লা লিগায় হারানো মসনদ ফিরে পাওয়ার সুখস্মৃতি নিয়েই প্রিয় মাঠ ন্যুক্যাম্পকে বিদায় জানালেন বার্সিলোনার এই সফল অধিনায়ক। এখও দুটি ম্যাচ হাতে আছে তার। কোপা ডেল’রে আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল। এরপরই আনুষ্ঠানিক বিদায় বলে দেবেন জাভিয়ের হার্নান্দেজ।

ডিপোর্টিভো লা করুনার বিপক্ষে লা লিগার শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন জাভি হার্নান্দেজ। তবে ম্যাচে বার্সিলোনা ২-২ গোলে ড্র করে। কিন্তু আগেই শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ম্যাচটি ছিল কেবলই আনুষ্ঠানিকতার। ম্যাচ শেষে সর্বপ্রথম ক্লাবের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন কাতালান ক্লাবটির কিংবদন্তি ফুটবলার জাভি। সেই সঙ্গে বলেছেন বিশ্বের সেরা একটি ক্লাবে খেলতে পারাটা সত্যিই গৌরবের, সম্মানের। বার্সিলোনা ছেড়ে কাতারের শীর্ষ ক্লাব আল সাদে যাওয়ার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত করেছিলেন ৩৫ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় বার্সিলোনার হয়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৫০৬ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মূল দলের হয়ে গোল করেছেন ৫৮। এর আগে অবশ্য ১১ বছর বয়সে এই ক্লাবে যোগ দেয়ার পর বার্সিলোনা ‘বি’ দলের হয়েও ৬১ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ডিপোর্টিভোর বিপক্ষে ম্যাচের ৮৬ মিনিটে যখন কোচ লুইস এনরিকে তাকে উঠিয়ে নিয়েছিলেন তখন দীর্ঘ ২৪ বছরের অকৃত্রিম বন্ধুকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান ক্যাম্পন্যুর সমর্থকরা, এটাই ছিল স্বাবাভিক। আর হয়েছেও তাই। দুই গোলে এগিয়ে থেকেও টেবিলের অনেকটাই নিচে থাকা ডিপোর্টিভোর কাছে পয়েন্ট হারানোর পরও এদিনের ন্যুক্যাম্পের পরিবেশটা ছিল অন্যরকম। দারুণ ইতিবাচক। বার্সিলোনার হাতে যখন লা লিগার শিরোপা তুলে দেয়া হয় সেই উৎসবের পাশাপাশি ক্লাবের আইকনকে বিদায় জানানোর জন্য ভিন্ন আয়োজন। জাভির ট্রেডমার্ক জার্সি নম্বর ৬ লেখা সংবলিত টি-শার্ট পরে সতীর্থসহ ক্লাবের সব অফিসিয়ালই জাভিকে সম্মান জানিয়েছেন। বিদায় বেলায় শেষবারের মতো ন্যুক্যাম্পে দাঁড়িয়ে জাভি বলেন, ‘সবাইকে অভিনন্দন, আর ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। বিশেষ করে আজকের দিনটিসহ পুরো মৌসুমে আমাদের সমর্থন করার জন্য সবার প্রতিই কৃতজ্ঞতা। তোমরা হয়ত বুঝতেও পারবে না বার্সিলোনার খেলোয়াড় হিসেবে আমি নিজেকে কতটা গৌরবান্বিত অনুভব করি। যে যাই বলুক না কেন আমরাই বিশ্বের সেরা দল। আমি আমার স্ত্রী, পরিবার, বন্ধুদেরও ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা সত্যিই চমৎকার। কিন্তু এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। আমরা স্প্যানিশ কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লীগও জিততে চাই।’

দীর্ঘদিন ফুটবলকে অসধারণ সব কীর্তি উপহার দিলেও পারফর্মেন্সের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি যতসামান্যই। পাসের ফোয়ারা ছুটিয়েই মিটেনি বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের খ্যাতি। পাঁচবার পেয়েছিলেন ব্যালন ডি’অরের মনোনয়ন। কিন্তু সর্বোচ্চ তৃতীয় স্থানে থেকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে তিনবার- ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে। ২০০৮’র অস্ট্রিয়া ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও কেন জাভি বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পাননি, তা নিয়ে এখনও আফসোসে পোড়েন স্প্যানিশরা। তবে তিনি যা, তার ধারেকাছেও নেই নতুন শতাব্দীর কোন ফুটবলার। ২০০৮ সালে একবার তাই পেপ গার্ডিওলা বলেছিলেন, ‘জাভি হলো বার্সিলোনার ডিএনএ। প্রথম দিন তার খেলা দেখেই আমি বুঝেছিলাম, সে অনেকদিন থাকবে বার্সেলোনার হৃদপি- হয়ে।’

জাভির সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বার্সিলোনার মাঝমাঠ সামলিয়েছেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ক্লাব এবং জাতীয় দলের সতীর্থের বিদায়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। বার্সিলোনার সঙ্গে ইনিয়েস্তার সম্পর্ক দীর্ঘ ১৩ বছরের। জাভি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইনিয়েস্তাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সর্বোপরি অসাধারণ সব অর্জনের জন্য জাভির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে ইনিয়েস্তা বলেন, ‘আমি তাকে প্রশংসা করার সঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। তার মতো একজন মানুষ ও খেলোয়াড় কখনও খুঁজে পাব না। তার মতো ব্যক্তিত্ব ও তার সঙ্গে খেলার যে অনুভূতি এবং একসঙ্গে কাটানো বছরগুলো কোন শব্দে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তিনি একজন অনন্য খেলোয়াড়। প্রকৃতপক্ষে এমন খেলোয়াড়রা বার বার আসে না এবং ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে তার অবদানগুলো ছিল অসাধারণ। তার পাশে আমার পুরো ক্যারিয়ার খেলতে পারাটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ ও সম্মান। তাই আমি বল এটা আসলেই বিশেষ একটি দিন। কিন্তু আমরা কাপ এবং চ্যাম্পিয়নস লীগও জিততে চাই। আমরা আবারও ৭ জুন সব শিরোপাসহ এখানে ফিরে এসে সবাই মিলে উদযাপন করতে চাই। দ্বিতীয়ত জাভিকে বিদায় জানানোর জন্য কিছু বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এত বছর এতকিছু দেয়ার জন্য জাভিকে ধন্যবাদ।’

বিশ্ব ফুটবলে সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডারদের ছোট্ট তালিকা তৈরি করা হলে সেখানে অবধারিতভাবেই চলে আসবেন জাভি হার্নান্দেজ। সে কারণেই স্পেনের পানশালা কিংবা গণমাধ্যমÑসব জায়গাতেই এখন আলোচনার বিষয় একটাই। জাভি কী আসলেই সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডার? প্রকৃতপক্ষে ফুটবলে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা অবান্তর। কারণ এক যুগের ফুটবলারের সঙ্গে আরেক যুগের ফুটবলারের তুলনা চলে না। স্প্যানিশ কোচ ভিসেন্ত দেল বস্ক তা জানেন। আর জানেন বলেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যের অবসরকে রাঙিয়ে দিলেন এই বলে, ‘সে আসলেই অসাধারণ একজন ফুটবলার। আমার মনে হয় না, স্পেন আরেকজন জাভিকে কখনও খুঁজে পাবে।’ ২০০৮ থেকে ২০১২ সালÑ এই চার বছরে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছে ভিসেন্তে দেল বস্কের স্পেন। জাভি ছিলেন সেই দলের প্রাণভোমরা। ৩৪ বছর বয়সে জাতীয় দল থেকে জাভি অবসরের ঘোষণা দেয়ার পর দেল বস্কের অভিমত, ‘একজন অসাধারণ ফুটবলারের প্রতি আমি নিজের শ্রদ্ধা জানাতে চাই। জাতীয় দলে জাভি ছিল একজন অনন্য ফুটবলার। তার মতো আরেকজনকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে স্পেনের জন্য।’ আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের ট্রেবল শিরোপা জয়ের মূল কারিগর হিসেবে জাভিকে চিহ্নিত করে দেল বস্ক বলেন, ‘স্পেনের খেলার ধাঁচ এবং সব সাফল্যের নেপথ্যে জাভির ভূমিকাই ছিল মুখ্য। মাঠ এবং মাঠের বাইরে আমরা তাকে দারুণ মিস করব।’

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫

২৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: