মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রত্যন্ত জনপদেও এগিয়ে আসছে মেয়েরা

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫

তন্বি আখতার, রাজিবা মনজিল, তানিয়া আখতার, জাকিয়া আখতার, তানজিলা আখতার। ওরা সবাই বয়সে এখনও কিশোরী। অধিকাংশের পরিবার গরিব। এমন আরও অনেক প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে ওরা কৃষির মতো ‘ব্যতিক্রমী’ একটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে। বাড়ির আঙ্গিনা থেকে শুরু করে ক্ষেত-খামারে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ভবিষ্যত নিয়ে দেখছে উচ্চতর স্বপ্ন।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে পাতাবুনিয়া আদর্শ কৃষি ও কারিগরি কলেজের ওরা নিয়মিত ছাত্রী। এসএসসিতে কেউ কেউ ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করেছে। পেশা হিসেবে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতেই ওরা এখানে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা পড়ছে। কৃষি ডিপ্লোমা পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী তন্বি আখতার জানায়, কৃষি ডিপ্লোমা পাস করে আত্ম কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যদিও তার স্বপ্ন রয়েছে কৃষি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষার। কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে সে সুযোগ যদি না হয়, তারপরও তাকে কারও বোঝা হয়ে থাকতে হবে না। আর কিছু না হোক বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজি, ফুলের বাগান করেও সংসার চালানো যাবে। গাঁয়ের ক্ষুদ্র দোকানি শাহাজাহান খানের ছোট মেয়ে তন্বি তাই এরই মধ্যে বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজি আর ফুলের আবাদ করে আশপাশের সবার কাছে উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তার বড় বোন তামান্না আখতারও একই প্রতিষ্ঠানে কৃষি ডিপ্লোমা পড়েছে। সে বর্তমানে গলাচিপা কৃষি বিভাগের অধীনে ইন্টার্নি করছে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব আট কিলোমিটার। প্রতিদিন টমটমের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাহনে চড়ে কলেজে আসতে-যেতে হয়। এ কষ্ট সে ভবিষ্যত স্বপ্ন পূরণে মেনে নিয়েছে।

বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটারের পুরো পথটাই হেঁটে আসতে হয় রাজমিস্ত্রি রফিক হাওলাদারের মেয়ে দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী জাকিয়া আখতারকে। এসএসসিতে ভাল ফল করায় একাধিক কলেজ থেকে তাকে পড়াশোনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কৃষিকে পেশা হিসেবে নেয়ার তাগিদ থেকে ভর্তি হয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। তার স্বপ্ন উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে কৃষি বিজ্ঞানী হওয়া। এদেশের খেটে খাওয়া কৃষকের হাতে সস্তায় প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়া।

তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী ফরিদা আখতার জানায়, কৃষি ডিপ্লোমার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সে পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে মাছের চাষ করতে চায়। এর প্রাথমিক প্রস্তুতি সে ইতোমধ্যে নিতে শুরু করেছে। মাছের রোগ প্রতিরোধে দক্ষতা অর্জনে সে জোর দিয়েছে। তার আরও লক্ষ্য আশপাশের গাঁয়ের পরিত্যক্ত পুকুরগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। গাঁয়ের ক্ষুদ্র মৎস্যচাষী কালাম মাতবর অভাবের মধ্যেও পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ তানজিলা আখতারকে পাতাবুনিয়া আদর্শ কৃষি ও কারিগরি কলেজে পড়াচ্ছেন। তার স্বপ্ন মেয়েটি কৃষি বিজ্ঞানী হোক। বাবার সে স্বপ্ন পূরণে অবিচল তানজিলা তাই প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে অবালীলায়। সে এবার চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্রী। তানজিলা জানায়, কৃষিপ্রধান এ দেশে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে যেখানে কৃষিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হয়ে ওঠার কথা। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেখানে কৃষি শিক্ষাকে তুচ্ছ করে দেখা হয়। এ মানসিকতা পরিবর্তনের এখনই সময়। তা হলে দেশ কৃষিতে আরও সমৃদ্ধ হবে।

ওপর থেকে যাই দেখা যাক না কেন, সমাজ ও দেশটা যে পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি শিক্ষায় গাঁয়ের মেয়েরাও ছেলেদের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে, তা এ নিভৃত পল্লীর প্রতিষ্ঠানে না এলে বোঝা যাবে না। সবুজে ছাওয়া নির্জন প্রান্তরে স্থাপিত পাতাবুনিয়া আদর্শ কৃষি ও কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মহসীন উদ্দিন জানান, ১৯৯৮ সালে যখন এ প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে, ৩১ শিক্ষার্থীর মধ্যে তখন মাত্র সাত ছাত্রী ছিল। এখন এতে ২২৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ জনই ছাত্রী। এ প্রতিষ্ঠানে কৃষি শিক্ষায় মেয়েদের আরও এগিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সারাদেশে পাঁচটি এমপিওভুক্ত কৃষি কলেজ রয়েছে। যার অন্যতম এটি।

সহকারী ইনস্ট্রাক্টর ইমাম হোসেন জানান, এখান থেকে পাস করা বহু ছাত্রী দেশের নানা জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫

১৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: