মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ধরাছোঁয়ার বাইরে তামিম

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫
ধরাছোঁয়ার বাইরে তামিম
  • মোঃ মামুন রশীদ

নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা ওপেনার হিসেবে। তামিম ইকবাল দেখিয়েছেন ধারাবাহিকতা কেমন হতে পারে। ওয়ানডে সিরিজে টানা দুই সেঞ্চুরি ও একটি হাফসেঞ্চুরি করে সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন। এবার টেস্ট সিরিজেও সেই তামিম ব্যাট হাতে কতটা ধারাবাহিক সেটার স্বাক্ষর রাখলেন। গত বছরের শেষদিকে সফরকারী জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে টানা দুই টেস্টে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টেই শতক হাঁকিয়ে টানা তিন টেস্টেই শতক হাঁকানোর অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এ বাঁহাতি ওপেনার। এবার হাঁকিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। ২০৬ রান করে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক এখন তিনি। পেছনে ফেলেছেন টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গলে করা ২০০ রানের ইনিংসটিকে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বাধিক শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যানও তিনি। ৭টি টেস্ট শতক হাঁকিয়ে তিনি পেছনে ফেলেছেন মোহাম্মদ আশরাফুলকে (৬টি)। হাতছানি দিচ্ছে নিজেকে আরও ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়ার। সেজন্য আর মাত্র ৫৩ রান প্রয়োজন তামিমের। তাহলেই দেশের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হয়ে যাবেন। সর্বাধিক রান করার দিক থেকে পেছনে ফেলবেন সাবেক অধিনায়ক ও ‘মিস্টার ফিফটি’ খ্যাত হাবিবুল বাশার সুমনকে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজের আগেও তামিমকে অনেক সমালোচনার তীর আঘাত হেনেছে। একের পর এক কটূক্তি শুনতে হয়েছে। কারণ ব্যাটে ধারাবাহিকতার অভাব। এমনকি সিরিজ শুরুর আগে ঘরোয়া আসরেও রান পাননি। শেষ পর্যন্ত পাকদের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রস্তুতিমূলক একদিনের ম্যাচে বিসিবি একাদশে না থাকলেও রানে ফেরার জন্য অনুরোধ করে খেলেছেন। সেখানেও ব্যর্থ হয়েছেন। তবে কি বাঁহাতি তামিমের দল থেকে ছিটকে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে? অনেকে কিন্তু তেমন দাবিই তুলেছিলেন! কারণ বর্তমানে বাংলাদেশ দল যেভাবে গড়ে উঠেছে, বিকল্পের কোন ঘাটতি নেই। তরুণ উদীয়মানরা ক্রমাগতই জাতীয় দলে উঁকিঝুঁকি মারছেন। তাঁদেরও তো সুযোগ দিতে হবে! তামিমকে নিয়ে আর কত! তবে নির্বাচকরা তামিমের ওপরে আস্থা হারাননি। বিশ্বাস হারায়নি তামিমের সতীর্থরাও। কারণ তাঁরা সবাই অতীতে দেখেছেন এবং সবাই খুব ভাল করেই জানেন তামিম কি করতে পারেন। তাঁর ভেতরের আগুন দিয়ে নিমিষেই পাড়ার অলিতে-গলিতে খেলা বোলারে পরিণত করতে পারেন বিশ্বমানের বোলারকেও। সেই আস্থার প্রতিদান সত্যিই দিয়ে দিলেন। এ বড় আশ্চর্যের বিষয়! যার ব্যাটে রানখরা, ক্রমান্বয়ে ধারাবাহিকতা হারিয়ে সমালোচনার চাপে মূহ্যমান তাঁর ব্যাটই কিনা গর্জে উঠল। সে বড় ভয়ঙ্কর গর্জন। শিকারি বাঘ ক্ষুধার্ত হয়ে উঠলে যেমন দিগি¦দিক তোলপাড় করে সবকিছু থাবায় ক্ষত-বিক্ষত করতে চায় তেমনি বিধ্বংসী হয়ে গেলেন তামিম। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেল পাকিস্তানের বোলাররা। শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকল না। ওয়ানডে সিরিজে ব্যাট হাতে একাই পাক শিবিরের গর্ব ধুলোয় লুটিয়ে দিলেন তিনি। টানা দুই সেঞ্চুরি হাঁকানোর পর তৃতীয় ওয়ানডেতেও করলেন হাফসেঞ্চুরি। এমন ধারাবাহিকতা কে কবে দেখেছেন? অবশ্যই দেখেছেন সবাই, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলেন। তামিম-ই অনেক বিতর্কের পর ২০১২ এশিয়া কাপের দলে ঠাঁই করে নিয়ে টানা চার ফিফটি হাঁকিয়ে জবাব দিয়েছিলেন। আবারও সেটার পুনরাবৃত্তি করে সব সমালোচনাকে কবর দিয়ে দিলেন।

তামিম একজন ফাইটারের নাম। হাজারো সমালোচনার চাপ কাঁধে নিয়ে যিনি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন দুর্দান্তভাবে তাঁকে মহাবীর বলতেও আর দ্বিধা থাকার কথা নয়। সেটি ওয়ানডে সিরিজে হওয়ার পর টেস্ট সিরিজে তাঁর দিকেই নজর ছিল সবার। প্রথম টেস্টেই অন্যরকম একই গৌরবের ইতিহাস গড়ে দিলেন তামিম বাংলাদেশ দলের জন্য। তবে খুলনা টেস্টের প্রথম ইনিংসে কিন্তু তামিমকে আবারও নেতিয়ে পড়া স্বভাববিরুদ্ধ আচরণে দেখা গেল। মাত্র ২৫ রান করলেন। স্বভাবসুলভ ভাবভঙ্গিটাও দেখাতে পারলেন না। নিদারুণ চাপে পড়ে গেল বাংলাদেশ দলও। প্রথম ইনিংসে ৬২৮ রানের পাহাড় গড়ে পাকিস্তানীরা টাইগারদের কাঁধে চেপে দিল ২৯৬ রানের লিড। এ ধরনের টেস্টে সব সময়ই পিছিয়ে থাকা দলের পরাজয়টাই নিশ্চিত হয়ে যায়। যুগে যুগে সেটাই দেখে এসেছে টেস্ট ক্রিকেট। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আসল ‘রান মেশিন’ ও ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ আখ্যা পাওয়া অধিনায়ক মুশফিকের ইনজুরি! দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাট করা নিয়ে সংশয়। সার্বিকভাবেই হিমালয়সম চাপ টাইগার শিবিরে চেপে বসল! সেই চাপাটাকেই জয় করলেন তামিম। সহযোদ্ধা হিসেবে নিলেন টিকে থাকার লড়াইয়ে নামা আরেক যোদ্ধা ইমরুল কায়েসকে। চতুর্থ দিনের দুটি সেশন অবলীলায় পাক বোলারদের এমনভাবে দু’জন শাসন করলেন যেন আন্তর্জাতিক কোন ম্যাচ নয়, যেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দ্বিতীয় সারির কোন একটি ম্যাচ! পুরো দিনটাই পাকদের জন্য মাটি হয়ে গেল। উইকেট দিলেন না তামিম-ইমরুল। মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন, এমনটাও না। ওয়ানডে মেজাজে ব্যাট চালিয়ে দু’জনে তুলোধুনা করলেন পাক বোলিংকে। ২৭৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি! কস্মিনকালেও কেউ কি ভাবতে পেরেছিলেন এমনটা? হ্যাঁ পেরেছিলেন। সবাই ইতিহাস ঘেঁটে বের করলেন ১৯৬০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এভাবেই গর্জে উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের কলিন কাউড্রে ও জিওফ পুলার। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁরা গড়েন ২৯০ রানের জুটি যা টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় ইনিংসের সেরা জুটি।

টেস্টের পঞ্চম দিন নাকি সবচেয়ে ভয়াবহ! আর যদি হয় দিনের প্রথম সেশন সেটাতো ব্যাটসম্যানদের উইকেটে টিকে থাকা বিভীষিকাময় এক অভিজ্ঞতার সামিল হওয়া। কিন্তু তামিম-ইমরুল অনড় থাকলেন। আরও ৩৯ রান যোগ করলেন এক ঘন্টায়। দু’জনেই ১৫০ রান পেরিয়ে গেলেন। ৩১২ রানের জুটি গড়ে ৫৫ বছর আগে গড়া কাউড্রে-পুলারের রেকর্ড ভেঙ্গে দিলেন। ইমরুল ফিরে গেলেও তামিম থামেননি। তা-ব চালিয়েই গেছেন। ছুঁয়েছেন আরেকটি মাইলফল। ছক্কা হাঁকিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন, দ্বিতীয় বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে দ্বি-শতক! শেষ পর্যন্ত ৭৪.১০ স্ট্রাইকরেটে ২০৬ রান করে ফিরে গেছেন তিনি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক হিসেবে। কাউড্রে ১৭৫ আর পুলার ১৫৫ করেছিলেন। আর এ ইনিংসে ইমরুল ১৫০ ও তামিম ২০৬ রান করে তাঁদের ছাড়িয়ে গেলেন। দেশের মাটিতে প্রথম দ্বি-শতক বাংলাদেশের পক্ষে।

শুধু কী এক ইনিংসে সবচেয়ে বড় ইনিংসটিই তামিমের দখলে, টেস্টে সবচেয়ে বেশি শতকও এখন তামিমের দখলে। এরআগে মোহাম্মদ আশরাফুল সর্বাধিক ৬টি শতক করেছিলেন। তামিম চতুর্থদিনেই আশরাফুলকে পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারের সপ্তম শতক তুলে নিয়েছেন। সেই সঙ্গে টানা তিন টেস্টে শতকও হাকিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে এরআগে গ্যারি সোবার্স, সুনীল গাভাস্কার, ব্রায়ান লারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, রিকি পন্টিং, মোহাম্মদ ইউসুফ, বীরেন্দর শেবাগ, কুমার সাঙ্গাকারা, জ্যাক ক্যালিস, ইউনুস খান, মোহাম্মদ হাফিজসহ ৫০ জনেরও বেশি টেস্টে টানা তিন ম্যাচে শতক করেন। সেই তালিকায় তামিমও যুক্ত হয়ে গেলেন। তবে বাংলাদেশের হয়ে টানা দুই টেস্টে শতক করা মুমিনুল হক, খুলনা টেস্টে শতক করে টানা দুই ম্যাচে শতক করার গৌরব অর্জন করা ইমরুল কায়েসকে পেছনে ফেলে তামিম এখন টানা সেঞ্চুরি করার দিক দিয়েও সবার উপরেই আছেন। ৩৮ টেস্টে তামিমের রান ২৯৭৪! আর সর্বাধিক রানের মালিক হাবিবুলের ৫০ টেস্টে আছে ৩০২৬! ৫৩ রান করলেই তাঁকে ছাড়িয়ে যাবেন তামিম। চলে যাবেন আরও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁকে ছোঁয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন সাকিব আল হাসান। সমান ৩৮ টেস্টে তাঁর রান ২৬৩০! ৩৪৪ রান পিছিয়ে এখনও তিনি তামিমের চেয়ে।

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫

০৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: