আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সমাধানের আশ্বাস

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫
  • জলাবদ্ধতা, যানজট আর সুপেয় পানির তীব্র সংকট
  • ওয়ার্ড পরিক্রমা ৩৪, ৩৫ ও ৩৬

আনোয়ার রোজেন ॥ পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলো নিয়েই ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩৪, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড। এই তিন ওয়ার্ডের সঙ্কট- বিশুদ্ধ পানি, জলাবদ্ধতা আর যানজট। ছন্দ মিলিয়ে এভাবেই নিজেদের দীর্ঘদিনের সমস্যার কথা তুলে ধরছেন এসব ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। শাঁখারিবাজারের এক বাসিন্ধা বললেন, খাওয়ার পানি না দিতে পারলে এইবার ভোটও দিমু না। লাইনে দাঁড়ানো অন্য পুরুষ-মহিলাদের মনোভাবও যেন তার মতোই। অল্প বৃষ্টিতেই ড্রেন উপচে ময়লা পানি ওঠে। ওয়ার্ডগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। তবে অনেকেই আশা করছেন, রাতারাতি এসব সমস্যার সমাধান না হলেও নির্বাচিত কাউন্সিলর থাকলে অন্তত উদ্যোগ তো নিতে পারবেন! ভোটারদের সেই স্বপ্নই দেখাচ্ছেন প্রার্থীরা। তিন ওয়ার্ডেই প্রচার চলছে বিরামহীন। পোস্টার-ব্যানার-লিফলেটের পাশাপাশি প্রার্থীরা ঝুঁকছেন ডিজিটাল প্রচারে।

৩৪ নম্বর ওয়ার্ড ॥ আগে ৭০ নম্বর ওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিল। পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার, সিদ্দিকবাজার, সুরিটোলা, বঙ্গবাজার ও এর আশপাশের কয়েকটি এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। ওয়ার্ডভুক্ত এলকাগুলো হলোÑ সুরিটোলা, নবাবপুর রোড, নাজিরাবাজার লেন, সিদ্দিকবাজার, হাজী ওসমান গণি রোড, কাজী আব্দুল হামিদ লেন, কাজী আলাউদ্দিন রোড, লুৎফর রহমান লেন, টেকেরহাট লেন, মাজেদ সরদার রোড। মোট ২৩ হাজার ৫১৭ জন ভোটার ওয়ার্ডের ১৩টি ভোটকেন্দ্রে তাদের নির্বাচনী রায় দেবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৯১ জন আর নারী ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ৪২৬।

প্রার্থী পরিচিতি : নির্বাচনী দৌড়ে এই ওয়ার্ডে মোট কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন আটজন। কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার উদ্দীন আহমেদ আফজাল সিদ্দিকী (লাটিম প্রতীক) পেয়েছেন দলীয় সমর্থন। ব্যবসায়ী মোঃ মামুনের ঝুড়ি প্রতীকে আস্থা রেখেছে বিএনপি। এছাড়া অন্য ছয় প্রার্থীর বিএনপি-আওয়ামী লীগ হিসেবে কম বেশি পরিচিতি থাকলেও সেসব ঝেড়েমুছে প্রত্যেকেই নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাবি করছেন। এই প্রার্থীরা হলেনÑ এসএম নাজিম উদ্দিন (এয়ার কন্ডিশনার), নাছির আহমেদ খান (ঠেলাগাড়ি), মীর সমীর (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট), মোঃ জহির উদ্দিন পিন্টু (মিষ্টি কুমড়া), মোঃ নওয়াব মিয়া (রেডিও) ও শেখ মোঃ আবেদ উদ্দিন (ঘুড়ি)। ২০০২ সালের নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি। সে সময়ে নির্বাচিত বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলরও মারা গেছেন বছর কয়েক হলো। ১৯৯৪ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচনে লড়ে কাউন্সিলর হয়েছিলেন মীর সমীর। তিনি এবার লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোটের অতীত হিসব-নিকাশ এবার খাটবে না। নাগরিক সমস্যা সমাধানে যাকে প্রত্যয়ী মনে হবে, তিনিই হাসবেন শেষ হাসি। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সারওয়ার উদ্দীন আহমেদ আফজাল সিদ্দিকী বলেন, ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা, অনুন্নত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ও সুপেয় পানির সমস্যা প্রকট। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হব। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মীর সমীর জনকণ্ঠকে বলেন, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার বেহালদশা নাগরিকদের প্রধান দুর্ভোগ। ওয়াসার খাবার পানিতেও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এবার নির্বাচিত হলে এসব সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেব। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও স্থানীয় পঞ্চায়েত সভাপতি এসএম নাজিম উদ্দিন বলেন, বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে ওয়ার্ডের শিক্ষিত বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।

৩৫ নম্বর ওয়ার্ড ॥ ডিসিসির সাবেক ৭১ নম্বর ওয়ার্ডটি নতুন ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড। ওয়ার্ডটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বংশাল থানার অন্তর্ভুক্ত। আনন্দ মোহন বসাক লেন, ইংলিশ রোড, গোলকপাল লেন, নবাব ইউসুফ রোড, নবাবপুর রোড (আংশিক), নয়াবাজার সুইপার কলোনি, পুরান মোগলটুলী, ফ্রেঞ্চ রোড, বংশাল রোড (আংশিক), বংশাল লেন, ভিতরবাড়ি লেন, মালিটোলা রোড, মালিটোলা লেন, হাজী আবদুল্লা সরকার লেন ও হাজী মাইনুদ্দীন রোড নিয়ে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত। ওয়ার্ডে রয়েছে বহু বছরের পুরনো মানসী সিনেমা হল ও ঐতিহ্যবাহী বংশাল পুকুর। ওয়ার্ডের ১০টি কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১৫ হাজার ৫১৩। পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ৫২২ জন আর নারী ভোটার সংখ্যা ৬ হাজার ৯৯১।

প্রার্থী পরিচিতি : মনোয়নপত্র জমাদান, যাচাই-বাছাই, বাতিল ও প্রত্যাহার শেষে এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদের লড়াইয়ে টিকে আছেন পাঁচ প্রার্থী। পাশাপাশি অন্য ওয়ার্ডের প্রার্থীদের তুলনায় শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে এই ওয়ার্ডের প্রার্থীরা অনেকটা নিষ্প্রভ। নবম শ্রেণী উত্তীর্ণ গোলাম মোস্তফাকে (ঘুড়ি প্রতীক) সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ আর হলফনামায় নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ উল্লেখ করা ইয়াকুব সরকার (লাটিম) পেয়েছেন বিএনপির সমর্থন। এছাড়া স্বতন্ত্র তিন প্রার্থীর মধ্যে মোঃ শরীফ হোসেন (ঝুড়ি) অষ্টম শ্রেণী উত্তীর্ণ, হাজী মোঃ আবু সাঈদও (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট) অষ্টম শ্রেণী পাস। প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা (উচ্চ মাধ্যমিক পাস) সাহেদুল হাসানের (ঠেলাগাড়ি)।

নির্বাচনী কার্যালয়ের পাশাপাশি প্রার্থীদের বাসাবাড়িতেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকছে সমর্থকদের ভিড়। ব্যতিক্রম কেবল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর বেলায়। বাড়িতে সমর্থকদের আনাগোনা না থাকলেও ওয়ার্ডজুড়ে টাঙানো পোস্টারে নিজের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জানান দিচ্ছেন ইয়াকুব সরকার। তবে ভোটাররা বলছেন, সমর্থকদের ভিড় প্রার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষা উতরাতে খুব বেশি কাজে আসবে না, কৃতকার্য হতে মনজয় করতে হবে ভোটারদেরই। প্রার্থীরা সে চেষ্টাই করছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী গোলাম মোস্তফা বলেন, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করে ওয়ার্ডকে মডেল হিসেবে গড়তে চাই। স্বতন্ত্র প্রার্থী সাহেদুল হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি মালিটোলার বাসিন্দাদের জন্য কবরস্থান প্রতিষ্ঠা করা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওয়ার্ডে একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা আমার নির্বাচনী অঙ্গীকার। হাজী মোঃ আবু সাঈদ বলেন, দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি না থাকায় গ্যাস, বিদ্যুত, জলাবদ্ধতা ও স্যুয়ারেজ সমস্যায় ওয়ার্ডবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নির্বাচিত হলে জনদুর্ভোগ কমানোকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেব। মোঃ শরীফ হোসেন বলেন, নির্বাচিত হলে নারী নির্যাতন ও বাল্যবিয়েমুক্ত একটি আদর্শ ওয়ার্ড গঠনে সচেষ্ট হব।

৩৬ নম্বর ওয়ার্ড ॥ ওয়ার্ডটি আগে ৭২ নম্বর ওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিল। এই ওয়ার্ডটিও ঢাকার একটি প্রাচীন জনপদ। ঢাকার অন্য অংশের তুলনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসতি এখানে বেশি। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারিবাজার, ইসলামপুর, ঢাকা জর্জকোর্ট এলাকাসহ এর আশপাশের আরও কিছু এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ আশিক লেন, আওলাদ হোসেন লেন, প্রসন্ন পোদ্দার লেন, উচ্ছব পোদ্দার লেন, রাখাল চন্দ্র বসাক লেন, হরিপ্রসন্ন মিত্র রোড, কোতোয়ালি রোড, শাঁখারিবাজার উত্তরাংশ (১-৬৫ নম্বর হোল্ডিং), কোট-কাচারি, ডিসিকোর্ট, জর্জকোট, কৈলাশ ঘোষ লেন এবং ইসলামপুর (আংশিক)। ওয়ার্ডের ১০টি কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ১৭ হাজার ১৯৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ হাজার ৬২৩ আর নারী ভোটার সংখ্যা ৭ হাজার ৫৭৬।

প্রার্থী পরিচিতি : কাউন্সিলর পদে নির্বাচনী দৌড়ে টিকে আছেন সাত প্রার্থী। ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জন বিশ্বাস (ঝুড়ি প্রতীক) দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জামাল উদ্দিন মোঃ আকবর বাবলা (লাটিম)। বিএনপি এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে কোন প্রার্থী দেয়নি। বাকি পাঁচজনের পরিচিতি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এরা হলেনÑ সাবেক কাউন্সিলর আহাম্মদ আওরঙ্গজেব কবীর (রেডিও), বিশ্বজিত ধর (ঘুড়ি), মঞ্জুর হাসান রিন্টু (ঠেলাগাড়ি), মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (টিফিন ক্যারিয়ার) ও মোঃ জাহাঙ্গীর ইসলাম (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট)।ওয়ার্ড ঘুরে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এই ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যা পানি। তা সে হোক খাওয়ার জন্য ওয়াসার পানি কিংবা অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা। ওয়াসার পাইপে খাওয়ার পানি সব সময় পাওয়া যায় না। যদিও পাওয়া যায় দুর্গন্ধের কারণে তা পানের অনুপযোগী। স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অল্প বৃষ্টিতে ড্রেন উপচে ময়লা পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ওয়ার্ডবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের সাধারণ চিত্র। আছে মাদকের সহজলভ্যতা ও মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্য। ভোটাররা এসব সমস্যার সমাধান চান। প্রার্থীরাও তাদের প্রচারে সব সমস্যা মিটিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, নির্বাচিত হলে খাওয়ার পানির ও স্যুয়ারেজ সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেব। জামাল উদ্দিন আকবর মোঃ বাবলা বলেন, নির্বাচিত হলে পানির সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। মঞ্জুর হাসান রিন্টু বলেন, সন্ত্রাস, মাদক ও জলাবদ্ধতামুক্ত ওয়ার্ড গড়তে চাই। অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সুযোগ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোট চাইছেন আহাম্মদ আওরঙ্গজেব কবীর। আর পানি সমস্যার সমাধান ও পুরাতন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন জাহাঙ্গীর ইসলাম।

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫

২৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: