কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বৈশাখ ও নারীর সমৃদ্ধি

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

বৈশাখী মেলা আমাদের বাঙালী জীবনের চিরায়ত সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়। তাই অন্য মেলা বা আয়োজনগুলোর সঙ্গে বৈশাখী মেলার বৈশিষ্ট্যগত ও অনুষঙ্গগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কারুপণ্য সামগ্রী থেকে শুরু করে, পোশাক-পরিচ্ছদ, মিঠাই, মন্ডা, মুড়ি, মুড়কি ও নানা ধরনের খাবার বিক্রির রেওয়াজ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বৈশাখী মেলাগুলোতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মেলার ব্যাপ্তি। মেলার আনা পণ্য সামগ্রীগুলোতে এসেছে বৈচিত্র্য। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় যে, বৈশাখী মেলার পণ্য সামগ্রীগুলোর সঙ্গে বাংলার নারী শিল্পীদের সম্পর্ক নিবিড় ও অটুট। আর এভাবেই বাংলার নারীর জীবনধারায় এসেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বিষয়টি আনন্দের ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এবার বর্ষবরণ উৎসবে নারী নির্যাতনের ঘটনার মাধ্যমে একটি মহল ঐতিহ্যবাহী বাঙালীর সংস্কৃতির ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বিষয়টি দুঃখজনক ও অমানবিক। আশা করা যায়, অপরাধীদের চিন্থিত করে তাদের শাস্তির মাধ্যমে আবার আগামী বছর সবাই বর্ষবরণের আনন্দ উৎসবে মেতে উঠবে।

গ্রামীণ মেলার এই উৎসবের ধারা শহরে এসে বিবর্তন লাভ করে। শহরের মেলাগুলোতে বায়স্কোপের জায়গায় দেখা যায় মুখোশ, আর মিঠাইর স্থান দখল করেছে ফুচকা আর চটপটি। আরও থাকে পান্তা- ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ। কোথাও কোথাও হয় পুতুলনাচ, আবার কোথাও বা নাগরদোলার উপস্থিতি চোখে পড়ে। তবে মেলা শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় হয়ে থাকে। যে মেলাগুলোর প্রধান আকর্ষণ হরেক রকমের কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের উপস্থিতি। এই শিল্পপণ্যগুলোর প্রায় ৯০ ভাগই তৈরি করেন নারীরা। বৈশাখী মেলা ও নানা আয়োজনের সঙ্গে নারীদের মেধা ও শ্রম যুক্ত হওয়ার কারণে দেশের অর্থনৈতিক চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আর পোশাকের বিষয়টিতে যুক্ত হয়েছে এমন এক বৈচিত্র্য, যা গ্রামের চেয়ে শহরের আনুষ্ঠানিকতাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আর এই পোশাকের কথা এলেই প্রথমেই চলে আসে নারীদের পোশাকের বিষয়টি। বিশেষভাবে বৈশাখী পোশাকের কথা এলেই প্রথমে আসে নারীর সেই চিরন্তনী পোশাক শাড়ির কথা। এমনটি ভাবা হচ্ছিল আজ থেকে দুই বা তিন দশক আগে। বর্তমানে এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন বৈশাখী পোশাক মানেই হচ্ছেÑ শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতার পোশাকের কথা। অবশ্য পোশাকের একপেশে ধারনাটিকে সর্বজনীন রূপ দিতে কিছু ফ্যাশন হাউস বেশ ভূমিকা রেখেছে। বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেইÑ এই পোশাকগুলোর প্রতিটি স্তরে থাকে নারীদের হাতের ছোঁয়া। দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁতপল্লীর নারীরা ঘরকন্যার কাজের পাশাপাশি চরকায় সুতা কাটা, মাকুতে সুতা বুননের কাজসহ সুতা রং করার কাজটি করে থাকেন। তাছাড়া শহরের আধুনিক ফ্যাশন হাউসগুলোর ব্লক, বাটিক, হাতের কাজগুলোর সঙ্গেও জড়িত আছে নারী কর্মীরা। অনেক ফ্যাশন হাউসের মালিক নারী, আবার অনেক ফ্যাশন হাউসের প্রধান ডিজাইনার নারী। তারা নিয়মিত বৈশাখী পোশাক তৈরি ও বিপণন করে নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি কারুশিল্প ও ফ্যাশন হাউসগুলোকে সমৃদ্ধ করছে।

ঢাকার ধানম-ির রাপা প্লাজার ৪র্থ ও ৫ম ফ্লোরে ‘জয়ীতা’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তারা একত্রিত হয়ে পণ্য বিক্রয় করছেন। উদ্যোক্তারা বৈশাখে বিভিন্ন পোশাক, কারুপণ্য, হস্তজাত পণ্য তৈরি করে বেশ পরিচিতি লাভের পাশাপাশি পণ্য বিক্রির মুনাফাও লাভ করছেন। জানা গেছে, বৈশাখ ও ঈদ এই দুই সময়ে সবচেয়ে বেশি পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। সবচেয়ে বেশি আছে নারী-পুরুষের পোশাকসহ গৃহসজ্জার সামগ্রী। প্রতিটিতেই লেগেছে বৈশাখী রং আর মোটিফ। এখানে পাওয়া যায় দেশের বিভিন্ন স্থানের পণ্য। বৈশাখে পাওয়া যায় চট্টগ্রামের নকশী পাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁওয়ের হাতি, ঘোড়া, পুতুল ও কাঠের কারুপণ্য ও নকশী হাতপাখা, সিলেটের শীতলপাটি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য এবং টাঙ্গাইলের বাঁশ ও বেতের সামগ্রী। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, ‘জয়ীতা’য় নারী নেপথ্য কারিগর রয়েছে প্রায় দুই লাখ। যারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের একটা শক্তিশালী অংশ। দু’বছর আগে জাতীয় মহিলা সংস্থা প্রাঙ্গণে বৈশাখ উপলক্ষে ১৩ দিনব্যাপী এক মেলায় অংশ নেয় ঢাকার ৪০ জন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা। মেলায় সাধারণত স্থান পায় পোশাক, নকশীকাঁথা, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশনকভার, থ্রি-পিস, গৃহসজ্জা, মাটির তৈরি পণ্য ও হস্তশিল্পর বিভিন্ন সামগ্রী। মেলায় প্রচুর ক্রেতার আগমন ঘটে। নারীর তৈরি পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে বৈশাখী মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঙ্গে ছিল বৈশাখী নানা পিঠা ও মিষ্টান্নের আয়োজন।

ঢাকা বা অন্যান্য শহরের ফ্যাশন হাউসগুলোয় পেশাদারি ডিজাইনাররা পোশাক তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও দেশের আনাচে-কানাচে যে লাখ লাখ হস্ত ও কারুশিল্পী রয়েছে, তাদের অধিকাংশই অপেশাদার নারীকর্মী। তৃণমূল পর্যায়ের এসব কারুশিল্পী কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই উত্তরাধিকার সূত্রে এসব পেশার সঙ্গে জড়িত। বৈশাখী মেলা তাদের এক অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কুটিরশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে বৈশাখী মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বলা যায় বৈশাখী মেলার আয়োজনের মাধ্যমে এই কারুশিল্প প্রতিষ্ঠা লাভ করছে এবং তাদের অর্থনীতিক উন্নয়নের মাধ্যমে এসব নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। তবে নারীর কারুশিল্পের বিষয়টিকে আরও ব্যাপকতা দেয়া প্রয়োজন। অবশ্য বিসিক ঢাকায় বৈশাখী মেলার আয়োজনের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানায়। তবে বিসিক কর্তৃক কারুশিল্পীদের প্রতিটি জেলায় মেলার আয়োজন করতে পারলে কারুশিল্পীরা আরও ব্যাপক হারে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলার গ্রামীণ উদ্যোগী ও প্রতিভাবান নারী কারুশিল্পীরা বিপুল উৎসাহ লাভ করবে এবং বৈশাখী আয়োজনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে ঐতিহ্য রক্ষার মাধ্যমে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিও লাভ করবে।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: