হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঊষা গাঙ্গুলীতে মুগ্ধ ঢাকা

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

যান্ত্রিক এই সময়ে মানবিকতা যখন লুপ্তপ্রায় তখন পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) ৭ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনব্যাপী উদ্যাপন করছে সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন স্মৃতি নাট্যোৎসব ও স্মারক সম্মাননা ২০১৫ যাদের হৃদয় থেকে উচ্চারিত স্লোগান ‘মুক্ত করো মানবতা’। মানবতা যে কত প্রকার এবং কি কি ভাবে বিপন্ন তারই একটি নিদর্শন দেখা গেল গত ৮ এপ্রিল জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ ওপার বাংলার নাট্যদল রঙ্গকর্মী প্রযোজিত নাটক ‘রোজনা’ দেখার সুবাধে। রোজনা হিন্দি শব্দ যার প্রচলিত বাংলা প্রাত্যাহিক কিন্তু উৎসমূল আরও গভীরে। ইতালিয়ান সাহিত্যিক দারিও ফো এবং তার স্ত্রী ফ্রাঙ্কারেম রচিত ওয়াকিং আপ নাটক অবলম্বনে হিন্দিতে রূপান্তরের কাজটি করেছেন ঊষা গাঙ্গুলী। সুপ্রভাতে কারখানা গামী এক নারীর ঘরোয়া প্রস্তুতি সেরে ঘরের বাইরে পা ফেলবার মধ্যবর্তী সময়টুকুর মধ্যে যাপিত জীবনের একঘেয়েমি ও বন্দীদশা ফুটিয়ে তুলবার নাটক রোজনা। রোজনা নাটকটির বিন্যাস নির্দেশনা এবং একক অভিনয়ের রূপদানে ঊষা গাঙ্গুলী।

ঊষা গাঙ্গুলী অঙ্গুলি হেলনে মাত্র মিনিট দুইয়ের প্রারম্ভিক দৃশ্যায়নে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তীরকে সামনে এগুনোর স্বার্থেই পেছনে টানাটা কেন জরুরী। ঊষা গাঙ্গুলী রূপী মায়ার ঘুম ভাঙ্গছে কারখানার যন্ত্রের ওঠানামার সঙ্গে নিজের আতঙ্কের গোঙানীর শব্দে। মায়ার ভয়, যান্ত্রিক ব্লেড তার আঙ্গুলের ওপর পড়বে, আঙ্গুল হাত থেকে ছিন্ন হবে, অপারগ হাতের কারণে তার চাকরিটা চলে যাবে, চাকরীহীন অর্থসঙ্কট তাকে জীবন ধারনে পিষে ধরবে, স্বামী খোকন তার জুতা ছুড়ার মতো লাথি ছুড়বে, কোলের শিশু বিটু অসহায় হয়ে পড়বে, অতএব সতর্ক দৃষ্টি রেখে যেতেই হবে যেন ধারালো ব্লেডের তলে আঙ্গুল কাটা না পড়ে। আর যদি পড়েও তথাপি গলগলে রক্তক্ষরণকে চুপিসারে লুকাতে হবে কারণ ক্ষত প্রকাশ করে ক্ষতির মাত্রা বাড়াবার মতো নির্বুদ্ধিতা করা মায়াদের সাজে না।

সাজার কোন প্রশ্ন না, মায়া ঘুম থেকে উঠেই জেনে যায় ঘড়ির কাঁটায় তখন ৬.৩০। অতএব বিটুকে কাপড়চোপড় বদলানো, খাবারের রান্না, বাজার থেকে সদাই কেনা, কারখানার সঙ্গী স্বামীর জন্যে টিফিন কেরিয়ার গোছানো প্রভৃতি সেরে রওনা দিতে হবে ৭.৩০ এর মধ্যেই কেননা ৮টার মধ্যে কারখানায় ঢুকতে না পারলেই বেতন কর্তন। সন্তানকে বুকে তুলে নিয়ে বাজার করতে বেরিয়েই যত বিপত্তি। ঘর থেকে বেরুবে কিন্তু ঘরের চাবি নিরুদ্দেশ। একদিকে সময় ফুরাচ্ছে অপরদিকে মায়া চাবি খুঁজছে ঘরময় আর মনের পর্দায় ভেসে উঠছে স্বামীর অবহেলার কথা, মালিকের নির্যাতনের কথা, অসহনীয় ভিড়ে চুপসে যাওয়ার কথা, ফুলে ফুলে দোলে দোলে গানের বিপরীতে স্বামীর অর্থবাসনায় ভালবাসার অর্থ দাঁড় করানোসহ নানান ঘটনা। মায়ার উপলব্ধি হয়, সে যেমন কারখানায় মনিবের হুকুমের অধীন ঠিক তেমনিভাবে গৃহে স্বামীর অধীন। তার মুক্তির বারতা দৈব নির্ভর, সংসার-সমাজে হঠাৎ মিললেও মিলতে পারে কখনও কখনও। যেমনিভাবে নাটকের শেষাংসে চাবি খুঁজে পাওয়া আর দৈনিক পত্রিকা কুড়িয়ে পাবার কারণে মায়া বুঝে গেল আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। যান্ত্রিক নিষ্পেষণের হাত থেকে মুক্তি পাবার দিন। স্বামী-সন্তানকে একান্তে পেয়ে সময় কাটাবার দিন।

ঊষা গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় নারী জীবনের স্ট্রাগল এবং পুরুষের নিষ্পেষণ যে মাত্রায় প্রকাশ পায় রোজানা নাটকে সে মাত্রা অনেকটাই সহনশীল। এটার কারণ এই, অভিজ্ঞতা মানুষকে পরিণত করে। পরিণত হলেই তো মনে হয়, যৌবনের না জানি কেমন ছেলে মানুষী ছিল। এবার প্রতিপক্ষ পুরুষ অপেক্ষা যান্ত্রিকতা। যান্ত্রিক বেগ কিভাবে যে আমাদের আবেগশূন্য করে তুলছে, পরস্পরের থেকে, নিজের থেকে, নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে তা দৃশ্যত দৃশ্যমান রোজানায়। ছোট্ট ঘরে হাঁটতে-চলতে ফলা এবং বিমরূপী বাধা সাঙ্কেতিকভাবে সঞ্চায়ন ঘোষের সেটে বোঝায়, আক্রান্ত হবার মতো উপকরণ সর্বত্র সর্বাবস্থায়। সুদীপ স্যান্যালের আলোকে পরিকল্পনায় দৃশ্য থেকে দৃশ্যন্তরের গভীরে প্রবেশ ঘটে পুনরায় বর্তমানে ফিরে আসে সাবলিল ভঙ্গিমায়। সুকান্ত মজুমদারের ধ্বনি প্রক্ষেপণ এতটাই সাবলীল কান্নাকে মায়াকান্না বোধ হয় না, উচ্ছ্বাসে নৈরাশ্যে আসে না, প্রাপ্তীতে খামতি থাকে না। এই নাটকের যদি কোন খামতি থাকে তবে তা দর্শনগত। মঞ্চে উঠে অভিবাদন জানাতে দর্শকসনের লিজেন্ড অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার ন্যূনতম কার্পণ্য করেননি তবুও তার মুখটা মলিন। কারণ হয়ত এই, তিনি তার আজকের অবস্থানের মূল্যায়নে সবার উপরে রাখেন বাবা এবং মাকে। সত্ত্বায় বিশ্বাস করেন, পরিবার সব থেকে বড় শিক্ষক। সেই পরিবারের কাউকে বড় করতে যেয়ে অপরকে ন্যূনতম কারণে ছোট করাটা মেনে নেয়া সত্যিই তাঁর পক্ষে কষ্টকর। কষ্টকর এবং পরিশ্রমী এক ঘণ্টার অভিনয়ে মা হওয়া, চাবির খোঁজে নিরুদশা, দুধের হাঁড়িতে উতলে ওঠানো, মনিবের যান্ত্রিকতা, স্বামীর জুতা ছুঁড়ে ফেলা, চাইনিজ খাওয়ার ছেলে মানসিকতা, প্রেয়সির অনুরাগ, অবহেলিতের লজ্জা, বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল প্রভৃতি ফুটিয়ে তোলায় প্রাণবন্ত-নান্দনিক এবং নিজের থেকে নিজে ছাড়িয়ে যাওয়া। অভিনেত্রী-নির্দেশক ঊষা গাঙ্গুলীর কাছে শুধু একটাই নিবেদন, হয়ত একদিন তিনি ইউরোপের বালি ঝেড়ে বাংলার পলিতে হাত ডুবাবেন। পলি থেকে সোনা ফলাতে ঊষা গাঙ্গুলীর মতো জহরের আজ বড় বেশি প্রয়োজন। প্রয়োজন এক রৈখিকতার বিপরীতে সর্বজনীনতা। রোজনা শুধুমাত্র মায়ার প্রাত্যাহিক জীবনে আটকে থাকবে না বরং মায়ার রোজনা নক্ষত্র খচিত হবে মহাকালের প্রবাহমান ফল্গুধারায়।

ঊষা গাঙ্গুলীর নাট্যদল রঙ্গকর্মী। রঙ্গকর্মীর হয়ে শ্যামা উড়ালের নির্দেশনা দিলেন সৈয়দ জামিল আহমদ যিনি বিশ্বাস করেন, একটা প্রযোজনার মধ্যে দিয়ে যে সকল বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে সেটাই নির্দেশকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে নির্দেশক ঊষা গাঈুলী নির্দেশনা দিলেন নাম-গোত্রহীন নাগরিক সম্প্রদায়ের হয়ে যে দলের দল প্রধান-নির্দেশক আলী যাকের যিনি বিশ্বাস করেন, উদ্দেশ্য নিয়ে শিল্প হয় না। ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আর উদ্দেশ্য নির্ভর শিল্প সৃজনের ফিউশাল ধর্মী নাট্য প্রযোজনা ‘অন্তরযাত্রা’ মঞ্চস্থ হলো গত ৯ এপ্রিল শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন স্মৃতি নাট্যোৎসবের তৃতীয় দিনে। ব্যক্তি এবং শিল্পী ঊষা গাঈুলীর অন্তর-বাহির, বাস্তকতা-কাম্পনা, অন্বেষণ-সৃজন, আক্রোশ-লড়াই, জীবন-শিল্প এর মধ্যেকার টানাপোড়েন নিয়েই নাটকটি। ঊষা গাঙ্গুলী নির্দেশিত-রচিত এবং একক অভিনীত নাটক অন্তরযাত্রা।

জীবনের যাত্রাপথে শৈশব থেকে শুরু করে আজকের পঞ্চাশ উর্ধ যাপিত জীবনের পরতে পরতে চোখ বুলিয়ে স্বগোতক্তি করে চলেছেন কেন্দ্রীয় চরিত্র ঊষা গাঙ্গুলী। অবাঙালী কিশোরীর বাঙালীর মূল স্রোতে মিশে যাওয়া, অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীকে দেখে অভিনেত্রী হবার বাসনা, রঙ্গকর্মীর রিহার্সেল রুমে নার্ভাস হওয়া, তৃপ্তি মিত্রের দিক নির্দেশনায় তেজোদীপ্ত হওয়া, মাধুরীর প্রতিকূলতা সামলে চলা, দলীয় এক কর্মীর জীবন যুদ্ধে পরাজয়, সাওতাল মেয়েদের সামনে অভিনয়ের দাবি মেনে মরতে না পারার আনন্দ, মুনিয়ার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, মা নাটকে সন্তানের রক্ত ছুুঁয়ে মায়ের বিপ্লবী হওয়া, খোঁজ নাটকে নারী জীবনের অস্তিত্বহীনতা, হিম্মত মাই নাটকে যুদ্ধে সন্তান হারিয়েও যুদ্ধের মাঝে এগিয়ে চলা, আফসারি বেগমকে মঞ্চমায়ায় নিয়ে এসেও মঞ্চেও ধরে রাখতে না পারা, শোক বাড়িতে খাওযার চুক্তিতে কাঁদার চরিত্রাভিনেত্রীর ব্যক্তি শোকের সময় কাঁদতে না পারা, নারীবাদী সত্ত্বা আর মানবতাবাদী সত্ত্বার লড়াইয়ের অমীমাংসিত সমাধান, অভিনয় জীবন-নির্দেশনা জীবনের মধ্যে দিয়ে সমাজ-সন্ত্রাস-নারী ও শিশু নিগ্রহের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানবতার পক্ষে কণ্ঠ তোলা, জীবন দিয়ে শিল্প সৃজনের পক্ষে অবিরাম এবং নিরন্তন লেগে থাকার দৃপ্ত প্রত্যয়ের নাটক অন্তরযাত্রা। জীবনের ছায়া এবং কায়াকে জীবন্ত করে তোরার ভাবনায় ঊষা গাঈুলী অন্তরাত্মার আবিষ্কারক।

আবিষ্কারকে প্রয়োগের পথে তাঁর প্রথম দক্ষতা, নিজেকে নিজে যথার্থ রূপে অনুকরণ করা। ঊষা গাঈুলীর চরিত্রে রূপদান যা তা ব্যাপার না। দ্বিতীয়ত, চরিত্র থেকে চরিত্রের এক এবং একাধিক রূপান্তর নিমিশেই সম্পন্ন করা। তৃতীয়ত, খালেদ চৌধুরীর সেটে বর্গাকৃতি-ত্রিভূজাকৃতি আর বৃত্তের বলয়ে চলমান যাপিত জীবনকে পুরোপুরি আটকে ফেলা। চতুর্থতা, তাপস সেনের আলোয় মঞ্চের যে কোন জোনকে কেন্দ্রীয় জোনের মতো জোরালো করে জীবনের গভীরতাকে গভীরতর করে তোলা।

চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতে অভিনেত্রী ঊষা গাঙ্গুলী অভিনয়ের যে বহুমাত্রিকতা আনলেন তা ভুুলবার নয়। কৈশোরের বায়না, অভিনয়ের শিহরন, বিপ্লবীর তেজোভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা, কাদুনীর বিলাপ, অভিনেত্রীর ব্যাকুলতা, শিল্পীর অতৃপ্তি কিন্তু ব্যক্তির তৃপ্তি প্রভৃতির অভিব্যক্তিতে ঊষা গাঙ্গুলী অনন্য। তবে ‘এই ঊষা গাঙ্গুলীর থেকে হিম্মত নাই চরিত্রে ভাল আর কে হতে পারে’ কথাটা যেমন নিজের প্রশাংসা নিজে করে ফেলায় বিব্রত বোধের জন্মদেয় ঠিক তেমনি ভাবে কানন দেবীদের মতো মহীয়সী অভিনেত্রীদের বাইরে রেখে নিজেকেই যখন নিজের মানদ-ে অপরদের চিনাতে হয় তখনই একটু ছেলে মানুষী লাগে বইকি। অবশ্য একজন শিল্পী নিজের পোট্রেট নিজে আঁকবেন না এ কথা ভাবাও ছেলে মানুষী।

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

১৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: