আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের নববর্ষ, নববর্ষে বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • মাহমুদ টোকন

দৌড়েও বাবার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না কিশোর ছেলেটি। গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে বাবা হাঁটছেন। বাড়িতে বাজার পৌঁছে বাবাকে যেতে হবে জেলা শহরে। কিছুটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছেন বাবা। শিশুটি পিছিয়ে পড়েছে। শিশুটি নিকটবর্তী হলে বাবা হাঁটছেন। বেলা ১০টার মধ্যেই ঝাঁঝালো রোদ। সূর্য তেতে উঠছে এর মধ্যেই। ঘেমে উঠছেন বাবা, ছেলেটিও। কিন্তু বাবার মুখে বিরক্তি নেই। বাবার এক হাতে চটের ব্যাগ, অন্যহাতে দুধের ঘটি। তখনকার দিনে সার আসত এসব ব্যাগে। মা কেটে সাইজমতো বানিয়ে দিয়েছেন বাজারের জন্য। ব্যাগের মাঝখানে সার কোম্পানির লালকালিতে দেয়া গোলমতো ছাপ এখনও স্মরণে আসে। ব্যাগের ভেতর থেকে লেজ দিয়ে উঁকি মারছে সোমত্ত ইলিশ। এরপরে এ শিশুটিই মায়ের হাতের পায়েস খেয়ে নতুন কিংবা তোরঙে ওঠানো জামা গায়ে দাদার কাঁধে চড়ে বিকেলে মেলায় যায়। ফেরে হাতে নিয়ে বাঁশি এবং জিলিপির ঠোঙা। রাতে হয়ত কোন কবিগানের আসরে ঢুলু ঢুলু চোখে সে বিস্ময় ভরে কোন পালা শোনে।

এ যেন জীবন সিনেমার ফ্লাসব্যাক। সাদাকালো দিন। পহেলা বৈশাখের কথা মনে হলে নিজস্ব এমনই একটি-দুটি স্মৃতি জেগে ওঠে। এটি-ই গ্রামবাংলার আসল সিন। একবারে খাঁটি বাংলার জীবন। ওই যাপনটুকু মাত্র হেরফের হতে পারে বাকি সব এক। তবে সকল শিশুরাই যে এমন সুযোগটি পেয়েছে তা নয়, অনেকের নববর্ষ উদ্যাপন তো দূরের কথা, দু’বেলা পেট উনো-উদ্যাপনও হয় না। কেউ কেউ জানেও না নববর্ষ কী কিংবা পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা। আবার পান্তা-ইলিশের ডামাডোল তখনও শুরু হয়নি। এ আদিখ্যেতা তো এই সেদিন! তারপরেও এদেশী মানুষের বছরজুড়ে ভাল থাকার কামনায় স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যাপনের স্যুভেনির হচ্ছে পহেলা বৈশাখ।

এই সময়

এখন দিন বদলে গেছে। বৈদ্যুতিন দুনিয়া দূরকে অতি নিকটে নিয়ে এসেছে। আর কর্পোরেট সংস্কৃতি ব্যবসা ঢুকিয়ে দিয়েছে সকল উদ্যাপনে। সে সংস্কৃতি হোক আর পণ্য হোক। এমনকি ব্যক্তি মানুষের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে এটি প্রত্যক্ষ করা যায়। যদিও শহুরে বর্ণাঢ্য উদ্যাপন গ্রামকে ম্রিয়মাণ করে উঠতে চায় তথাপিও বাংলার বিশেষ করে বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শহরে গ্রামে অনেকটা একইরকম। মানুষের সারাবছর ভাল থাকার প্রত্যাশার প্রোটোটাইপ। তবে অন্যান্য শহর ও গ্রামবাংলার তুলনায় আয়োজনের বর্ণাঢ্যতা রাজধানী ঢাকা শহরে বিশাল। এবং সকল জায়গায় সকল মানুষ যে পহেলা বৈশাখ এভাবে পালন করে বা করতে পারে তা-ও নয়। তা সত্ত্বেও বছরের প্রথমদিন সাধ্যানুযায়ী ভাল খাওয়া, থাকা এবং কোনো বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়ানোর মূল্যবোধটুকু প্রায় সবাই ধারণ করে।

অন্যদিকে নব্যধনী, হঠাৎ বিত্তবান (বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনীকশ্রেণী এরকম), অপসাংস্কৃতিক বিত্তশালীরা অবশ্য সংস্কৃতির সীমারেখা মাড়িয়ে আলাদা পার্বণে মত্ত হয়। তাদের বেশিরভাগই বহুজাতিক ব্র্যান্ডের দোকান, মল, তারকাযুক্ত হোটেলে ফুরফুরে পাঞ্জাবি পরে, চটি গলিয়ে উদাসভাবে ঢুঁ’ মারেন। যেন অন্যগ্রহ থেকে এলেন বাবু! একশ্রেণী আবার রাস্তায় উদ্দাম গাড়ি হাঁকিয়ে, ধামাকা গান বাজিয়ে আনন্দ নেয়। কেউ আবার বিজাতীয় কায়দায় জড়াজড়ি করে রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ে ঠেস দিয়ে পিঠে পায়েস সঙ্গে ইয়াবা জাতীয় নেশাদ্রব্যে আয়েশ করেও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেন।

এক ঝলক ইতিহাস

পূর্বে বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস প্রথম ছিল না। বৈশাখকে শীর্ষমাসে তুলে আনার কৃতিত্ব মোঘল সম্রাট আকবরের। অনেক সংস্কার ও উদ্যোগের মধ্যে সম্রাট আকবরের এ উদ্যোগটিও বিশেষ স্মরণযোগ্য। বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠাই শুধু নয় নতুন আঙ্গিকে বাংলা সনের প্রবর্তনও হয় তাঁর হাত ধরে। বছর মাস দিন নিয়ে বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে গণনা পদ্ধতির অসামঞ্জস্য ছিল তখন সুস্পষ্ট। সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’র খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন ধরনের ‘ফসলি সন’ প্রবর্তনের নির্দেশনা প্রদান করেন। এ দায়িত্ব পান আকবরের রাজজ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী। তিনি প্রচলিত সন গণনার পদ্ধতির সঙ্গে হিজরী চান্দ্রসনের অনুকরণে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছরের সমন্বয় ঘটান। প্রবর্তন করেন নতুন সন। পুরোনো পদ্ধতির জটিলতা ভেঙ্গে মাসগুলোর পুনর্বিন্যাস করেন তিনি। তাতে বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন থেকেই মূলত বৈশাখ মাস বছরের প্রথম মাস হিসেবে এবং পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণের দিন বলে চিহ্নিত। তবে এর আগে অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ওঠার প্রাক্কালে নবান্নের মধ্যমে যে নববর্ষ উদ্যাপনের প্রচলন ছিল তা আকবরের এই উদ্যোগে অস্তমিত হয়। নতুন ধান ওঠা, নবান্ন উৎসব, প্রকৃতির সৌম্য রূপের অগ্রহায়ণের বিপরীতে রুদ্র বৈশাখকে বাংলার প্রথম মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়ায় সম্রাট আকবর অভিযুক্তও বটে! ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) নতুন করে ক্যালেন্ডার বিন্যাস করা হয়। এতে বাংলাদেশে ১ বৈশাখ একদিন আগে নিয়ে আসা হয় তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশ থেকে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বাংলা সনের ১ দিন পার্থক্য হয়। ফলে ১ বৈশাখসহ নজরুল, রবীন্দ্রজয়ন্তী দুই বাংলায় একদিন আগে পরে পালিত হয়। অথচ সময়ের ব্যবধান মাত্র আধঘণ্টা। তবে এই বিন্যাসে যতটা না আন্তরিকতা বা শুভউদ্যোগ ছিল তার থেকে অধিক ছিল রাজনীতি এবং পাকিস্তানী শাসকদের তুষ্ট করার প্রচেষ্টা। আর সুবিধাবাদী ধর্মীয় বিদ্বেষও যে ছিল না তাও বলা মুসকিল।

১৯৫৪ সালে ১ বৈশাখ প্রথম ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা করেন তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক। ১৯৬৪ সালে অর্থাৎ এর দশ বছর পরে এ ঘোষণা কার্যকরের সিদ্ধান্ত জানায় তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার। ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে আয়োজিত হয় নববর্ষ উৎসব।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ

গত ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। গ্রামের প্রশাখা রাস্তাটিও এখন আর শুধু মাটির নেই। সে কারণে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে প্রান্তিক মানুষটিরও। উত্থান ঘটেছে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার। ফলে ঢাকার যে কোন প্রভাব সারাদেশে পড়ে খুব সহজেই। সে ফ্যাশনই হোক আর খেলা হোক। বাংলাদেশে প্রায় সর্বত্রই কোন না কোনভাবে নববর্ষের প্রথম দিনটি উদ্যাপিত হয় খাদ্যে, পোশাকে এবং আনুষ্ঠানিকতায়।

মাছে ভাতে বাঙালী হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে মাছের আক্রা প্রায় সর্বত্রই। চাষাবাদ করা কিছু মাছ পাওয়া গেলেও নদী-খাল ভরাট এবং দখল, দূষণ এবং ফসলে পেস্টিসাইড ব্যবহারের ফলে খাল-বিল-নদীতে দেশীয় মাছের পরিমাণ অত্যধিক কমে গেছে। পায়েস, মিষ্টি, ফল এবং ইলিশ মাছ নববর্ষ পার্বণের অন্যতম উপাদান। এখন পোষাকও। ইলিশ এবং দুধ অতিবাণিজ্যিক পণ্যের প্যাকেটে ঢুকে গেছে। তবুও উদ্যাপন থেমে থাকে না। ইলিশ দূর্লভ হলেও অন্য মাছ এবং ফল-সবজি দিয়েই পার্বণ সারে বাঙালী। যার কিছু করার সাধ্য নেই তার নিকোনো উঠোনে অন্তত উদ্যাপনের চিহ্নটি লক্ষ্য করা যায়।

এখন খুবই লক্ষণীয় যে সংস্কৃতিক কার্যক্রম ও পরিবেশ ক্রমশ ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে বাংলাদেশে। পাড়ায় পাড়ায়, স্থানীয় এবং জাতীয়ভাবে সংস্কৃতিচর্চা থেমে গেছে। ফলে স্থবীরতায় ভুগছে তারুণ্যের বিকাশ, জ্ঞানচর্চা। ম্রিয়মাণ মানবীক উন্নয়ন। দ্রুত ও স্বল্প পরিশ্রমে বৈষয়িক উন্নয়ন এবং আধিপত্যকেই সবাই গুরুত্ব দিচ্ছে। তারুণ্য এখন এই ফাঁদাক্রান্ত। অভিভাবকরা বেশিরভাগই ভাল রেজাল্ট চায়, ভাল মানুষ সন্তান থেকে। ফলে রাজনীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে সকল উদ্যাপনে এখন অতি আনুষ্ঠানিকতা সে ধর্ম কিংবা সর্বজনীন যাই হোক। এতে অনভ্যস্ত তরুণ এবং শিশুদের জন্য সংস্কৃতি তার মূল্যবোধ ও বিকাশকে শাণিত করছে না।

হিসেবের হালখাতা

১ বৈশাখে গ্রামবাংলায় ছোটবড় প্রায় সকল ব্যবসায়ীরা হালখাতার আয়োজন করে। নিজেদের প্রয়োজনে। উদ্দেশ্য, পুরোনো পাওনা হালনাগাদ করা। ক্রেতার সঙ্গে ভাব-বিনিময়। এখন আগের মতো ছোট পরিসর ও সেই আন্তরিকতা নেই। তবে বেশ জাঁকজমক এবং আনুষ্ঠানিক আঙ্গিক বেড়েছে। ঢাকাসহ মফস্বল শহর এমনকি গ্রামের মাঝারি ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় করে হালখাতা করে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সজ্জিত করা, ক্রেতাকে মিষ্টিমুখ, উপহারসামগ্রী প্রদান ইত্যাদি এর প্রধান অনুষঙ্গ। ঢাকা চট্টাগ্রামের বড় ব্যবসায়ীরা তারকাবিশিষ্ট হোটেলেও এ উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। কিন্তু হালখাতা বলতে সেই ছোট ব্যবসায়ীর রুলটেনেÑ দেনা-পাওনা, ইজা লেখা হিসেবের খাতাটিকে নতুন করে উদ্বোধনের দিনটি মনে উঁকি মারে। সে ঐতিহ্যের দিনগুলো এখন দীর্ঘশ্বাসে।

রমনার বটমূলে ছায়ানট

১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে আয়োজিত হয়ে আসছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। মূলত ছায়ানটের তত্ত্বাবধানে বর্ষবরণের এ মহাযজ্ঞ শুরু হয়। সূর্য ওঠার আগে তবলার লহড়ির মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হলেও রবীন্দ্রনাথের ’এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’র মধ্য দিয়ে বর্ষবন্দনার পূর্ণতা পায়। হাজার হাজার দর্শকে ততক্ষণে ছেয়ে যায় রমনার ঐতিহাসিক বটবৃক্ষের তলা। সমবেতস্বরে এই গান বৈশাখকে যেন সে মুহূর্তে বাংলা মাসের ‘মহারাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। যেন তারই আরাধনা চলে গানে, অর্চনায়। রমনার বটমূলে সারাদিনই সঙ্গীতসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদ্যাপ্ন ও বর্ষবরণের রং ছড়ায়। পাশেই নারকেল বীথি, সেখানে তখন বর্ষবরণে লোকসঙ্গীতের জমজমাট অনুষ্ঠান।

অধিক জনসংখ্যার ছোট্ট এই রাজধানী শহর ঢাকা। নাগরীক বিনোদনের এতই অভাব যে সবাই এ দিনটিতে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ফলে অনেক আনন্দ অনেকক্ষেত্রে বিরক্তিরও উদ্রেক করে। আর শৃংখলা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। কোন কোন টেলিভিশন চ্যানেল এ সকল অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে। এমনকি অনেকে নিজস্ব অনুষ্ঠানমালাও উপস্থাপন করে। সেখানেও নান্দনিকতার থেকে ব্যক্তিবিশেষের প্রচারণা এবং স্থূলতার প্রদর্শনীও আনন্দ ম্লান করে দেয়। তবে টেলিভিশনের কল্যাণে এ সকল অনুষ্ঠান পৌঁছে যায় সারা বাংলাদেশে, প্রান্তিক মানুষের কাছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

বর্ষবরণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রতিবছর একেকটি বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে নানা মূর্তি ও মুখোশ নিয়ে শুরু হয় শোভাযাত্রা। এতে বিষয় হিসেবে প্রধান হয়ে ওঠে কখনও লক্ষ্মীপ্যাঁচা, কখনও লক্ষ্মীর বাহন গজ, কখনও ময়ূর ইত্যাদি। শাঁখ, বাঁশী, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে এ শোভাযাত্রায় চারুকলার ছাত্রছাত্রীসহ সকল ধরনের মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালীর মঙ্গল সাধনার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে পহেলা বৈশাখে ঢাকার রাস্তায়। নানা রঙে, সঙ্গে মিছিলটি প্রদক্ষিণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। অসুস্থ নাগরীক জীবনে এ শোভযাত্রা মানুষকে কৌতূহলী করে, সামান্য হলেও আচমকা আন্দোলিত করে।

পান্তা-ইলিশের আদিখ্যেতা

ঢাকাসহ বাংলাদেশের শহরগুলোয় পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের কদর চরম। অনুপম স্বাদ এবং বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হবার কারণে ইলিশ বেশ রাজকীয় মেনু। এমনিতেই ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সেটি চরম আকার ধারণ করে। শুধু ইলিশ কেন সব কিছুতেই দামের বিষয়ে বাংলাদেশে কোন নিয়মনীতি নেই। যার যেমন ইচ্ছা বাড়ায়। সে ওষুধ, খাদ্য কিংবা ব্যবহার্য যাই হোক। রিক্সা, অটোরিক্সা থেকে দূরপাল্লার বাস সর্বত্রই এ স্বেচ্ছাচার বিদ্যমান। বাজার ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাব প্রকট এখানে। সঠিক নীতিমালার অভাব। অসাধু ও অসৎ ব্যবসায়ীদের আধিপত্য। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে না ওঠা এবং ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ইত্যাদি সাধারণ মানুষকে দারুন বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে গত দশ-পনের বছরে পণ্যের দাম মানুষের জীবন ঝালাপালা করে দিয়েছে। ইলিশ গ্রামে দুর্লভ হলেও ঢাকা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলো তার দেখা মেলে।

পান্তা-ইলিশের কদর এখন বাংলাদেশের মেগাসিটিসহ গ্রামেও। পহেলা বৈশাখের কল্যাণে এটি এখন ফ্যাশান। যতটা না পছন্দ বা আগ্রহে তারও অনেক বেশি আনুষ্ঠানিকতা। শুধু পান্তা, ইলিশ, চিংড়ি ভর্তা, আলুভর্তাকে কেন্দ্র করেই উত্থান ঘটে একদিনের ব্যবসায়ীদের। গ্রামে শহরে। সেখানে বেশিরভাগ বিত্তশালীরা সকালে পান্তা-ইলিশের জন্য ভিড় জমায়। যদিও পান্তার সঙ্গে দরিদ্র গ্রামীণ মানুষ ও কৃষকদের দারিদ্র্যের ইতিহাস জড়িত। তথাপিও বাজার অর্থনীতির কারণে সেটিই হয়ে উঠেছে পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদ্যাপনের এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। এক্ষেত্রে একদিনের বাঙালীপনার প্রভাবটি প্রকট হয়ে ফুটে ওঠে। আপাদমস্তক বেনিয়া দেশী ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর, খাদ্য-বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশাখী আদিখ্যেতা দেখলে মনটা কেমন করে ওঠে। আলুভাজাকে ফ্রেঞ্জফ্রাই এবং মুরগির পাখনাকে উইংস বলে যারা খাওয়ান, তারাও এদিন অতি বাঙালী। বাসনে পান্তায়, দেয়ালে আলপনায় তাদের ফাস্টফুড বা চায়নিজটি তখন দোকান। এমনকি বিদেশী ব্র্যান্ড দোকানগুলোও পান্তা ব্যবসায়ে ক্যাশবাক্স ফাঁপিয়ে তোলে। এরাই ‘ও আমার বাংলা মাগো’ বলে বলে মুখে ফেনা তোলে! আর ইংরেজী এ্যাকসেন্টে ‘শুভ নববর্ষ’ বলে যখন একশ্রেণীর তরুণ-তরুণী বাসন টেনে বসে, চামচ দিয়ে পান্টা (পান্তা) খায় সে এক দেখার ব্যাপার হয় বটে!

হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতির অনুষঙ্গ

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কিছু না কিছু খেলাধুলা অনুষ্ঠান হয়। কোথাও তা ভালভাবে আয়োজিত কোথাও বা অগোছালো। তবে সবকিছুর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি, মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদির প্রভাব থাকে। বাংলাদেশের অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের বলি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই, অন্যান্য প্রায় সকল স্থানেই পুতুলনাচ এবং নাগরদোলায় চড়া মানুষকে প্রভূত আনন্দ দিয়ে থাকে। কোথাও নদীতে নৌকাবাইচও আয়োজন করা হয়। আগে গ্রামে হা-ডু-ডু খেলা ও কলসনৃত্য আয়োজন করা হতো বেশ বড় পরিসরে।

বৈশাখের মিডিয়া

নতুন বছরকে উদ্যাপনে মিডিয়ার ভূমিকা বেশ সরব বাংলাদেশে। প্রায় সকল টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং পত্রিকাগুলো পহেলা বৈশাখের ভালমন্দ বিশেষ আয়োজন করে থাকে। তবে আনন্দদায়ক ও ভাল লেখার ও অনুষ্ঠানের অভাব সবসময়ই এখানে প্রকট। চারদিকে এত মিডিয়া এখন! বাংলাদেশে প্রায় অধিকাংশ ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এবং অবৈধ বিত্তের মালিকরা একটা মিডিয়া করেন। হোক ইলেক্ট্রনিক বা প্রিন্টিং। ভয়েজ হিসেবে এটি খুবই কার্যকর। অনেক টেলিভিশন চ্যানেল নিজেরাই দিনব্যাপী আনন্দমেলা কিংবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পান্তা-ইলিশ, পোশাক, শোভাযাত্রা, রমনার অনুষ্ঠানমালা ইত্যাদির জনপ্রিয়তা এসব মিডিয়ার মাধ্যমেই। ক্ষেত্রেবিশেষে বেলেল্লাপনাও!

ঢাকার বৈশাখ

কনজুমারইজমের উত্থানের ফলে সবকিছুকেই বাণিজ্যের মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। একদিকে এতে যেমন বাণিজ্যও হয় তেমনি উদ্যাপনটাও হয় জাঁকালো। আর অতি আনুষ্ঠানিকতায় প্রকৃত দিবসটির মূল্যবোধটি হারিয়ে যায়। তাতে অবশ্য ব্যবসায়ীদের হেলদোল নেই। তাদের বাণিজ্য হলেই হলো। পহেলা বৈশাখেও লেগেছে বাণিজ্যের উত্তাপ। পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে এর বেশ ভাল প্রভাব পড়েছে। ফলে একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এর প্রস্তুতি চলে সারা বছর। বিশেষ করে চারু-কারু ও পোশাকশিল্পে। ইলিশ, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি সেই প্রাচীনকাল থেকে বাণিজ্যিকিকরণের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বর্ষ উদ্যাপ্ন প্রিয় কিন্তু দুর্লভ হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য। তবে ছেলেদের ফতুয়া-পাঞ্জাবি, মেয়দের শাড়ি-সালোয়ার, কামিজ-কুর্তা বাংলাদেশের শহরে গ্রামে সমান জনপ্রিয় এবং সহজলভ্যও বটে। আর বাংলাদেশে কাপড়টাই এখনও সাধারণ মানুষের নাগালে খাবার ও অন্যান্য জিনিসের তুলনায়। প্রায় সকল ফ্যাশন হাউস কি সাধারণ বিপণি সবাই বৈশাখের জন্য আলাদা কালেকশন রাখে। বিশেষ করে লাল-সাদা হয়ে যায় ঢাকার রাস্তা যার ছটা গ্রাম বাংলায়ও সমানভাবে পড়ে। বিভিন্ন কারুপণ্য এবং কিছু কিছু গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যও এ সময়ে বিক্রি হয়। তবে মাঝখানে সেই মধ্যস্বত্ত্বভোগী আজও বিদ্যমান। কেবলমাত্র রূপ বদলেছে। প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য তাদের নিজেদের হাতে নয়। সে জীবন আজও ক্ষমতাশালীদের রিমোট নিয়ন্ত্রিত। কর্পোরেট হাউজের বিশেষ সেøাগানে প্রান্তিক মানুষের অধিকার এখন দেয়াল লিখন।

লাল নীল দিপাবলী

বাংলাদেশের সব্যসাচী লেখক হুমায়ুন আজাদ বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিকে তুলনা করেছেন হাজার হাজার প্রদিপের সঙ্গে। সে দীপাবলী লাল নীল সবুজ আবার কালোও। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে রচিত এগুলো। এর একেকটি আলো দিচ্ছে আমাদের। বাংলার সংস্কৃতি এবং উদ্যাপনও এর ধারাবহিকতায়। কোথাও আলেকোজ্জ্বল, কোথাও ম্লান, কোথাও বা অন্ধকার। আমাদের উদ্যাপনে ম্লানিমা অধিক কারণ আমরা সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হয়ে উঠিনি আজও। নিজের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে গ্রহণ করেছি ভিনদেশী অমানবিকও অন্ধকার সংস্কৃতিকে। অর্জনের আগে অনেক প্রাপ্তির অন্ধকার আমাদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। সেই অন্ধকারের উপলব্দিই হয়ত আবার আমাদের নতুন আলোর সন্ধান দেবে। উদ্যাপন আরও শাণিত এবং আলোকময় হয়ে উঠবে আমাদের সুশিক্ষায়, বিনয়ে, সহমর্মিতায় এবং নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী উদার বাংলায়। আনন্দ পৌঁছে যাবে শেষ মাইলেজে।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: