আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বৈশাখ ও বাঙালীর জীবন যাপন

প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২০১৫
  • ড. আয়েশা বেগম

সুদীর্ঘকাল গ্রাম-বাংলার ভূপ্রকৃতি জলার্দ্র নরম; প্রকৃতি সবুজ, স্নিগ্ধ, ছায়া নিবিড়, আর্থব্যবস্থা প্রধানত, কৃষিভিত্তিক, শত দারিদ্র্য দুঃখ কষ্ট দ্বন্দ্ব কলহ সত্ত্বেও সেখানে জীবন ছিল সরল ছন্দে গাথা। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে গ্রামের সেই প্রকৃতি জীবন ও সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তন পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। গ্রীস্মের দাবদাহ কালবৈখাখী তা-ব আমের মঞ্জরির ঘন ঘ্রাণ। বর্ষায় আঁধার করে আসা মেঘ বাদল দিনের অবিরল বৃষ্টি। শরতের ভরাজল। জোৎস্নাপ্লাবিত রাত হেমন্তের মাঠে সুবর্ণধান মাঠের বাঁশি। শীতের শুষ্কতা, বসন্তের হাওয়ায় পলাশ ও শিমুলের রক্তরাগÑ এই অপরূপ রূপ বৈচিত্রে বর্ণ ও গঞ্জের গাঢ়তায় গ্রাম বাংলাকে আর উপলব্ধি ও অনুভব করা যায় না।

কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। জমিচায় বীজ বুনন। ফসল কাটা মাড়াই সকল কাজই হচ্ছে যন্ত্রের মাধ্যমে। শ্রমসাধ্য কাজ সহজ হয়ে উঠেছে কিন্তু জমি চায় চারা নিড়ানি, ফসল কাটা, মাড়াই ইত্যাদি কাজে সম্মিলিত যৌথ যে আনন্দ গান মাঠময়, উঠানময় ছড়িয়ে পড়ত তা হারিয়ে গেছে অলক্ষ্যে। আউশ আমন কাতিয়াইল। বিরুই পাল কাইচ লতা বাজাল পক্সিক্ষরাজ যাত্রামডুক কটক তারা বলজিরি এ সব ধানের জায়গা করে নিয়েছে উচ্চফলনশীল জাতের ধান। হ্রাস পাচ্ছে রবিশষ্যের চাষ। মটর, কলাই, তিল, তিসি, পিঁয়াজ, রসুন আরও কত কি। ফুলের চাষ একটি নতুন সংযোজন।

গ্রামের দরিদ্ররা বাস করত ছনে ছাওয়া ছোট কুঁড়ে ঘরে। সচ্ছল কৃষকদের ঘরে তৈরি হতো টিনের দোচালা বা চারচালায়। অঞ্চলভেদে আকৃতিতে সামান্য পার্থক্য থাকত আজকাল গ্রামে পাকা ঘর প্রতি বাড়িতেই দৃশ্যমান, যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সুবিধাদি। মাটির হাঁড়ি পাতিল পানির কলস কুজো বাসন কোসন ঝিনুক নারকেল মালা পরিত্যক্ত হয়েছে বহু আগে।

এলুমোনিয়াম মেলামাইন কাঁচের মামগ্রী ব্যবহৃত হয় ঘরে ঘরে। আধুনিক আসবাবপত্র খাট আলমারি খাবার টেবিল এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর ব্যবহৃত হয় সম্পন্ন কৃষকের ঘরে বিশেষ করে যে ঘরের এক বা একাধিক সদস্য বিদেশে কাজ করেন। প্রতি ঘরেই থাকে একটি মোবাইল সেট।

মাছে ভাতে বাঙালীÑ বাঙালীর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে এ ধারণাই চিরায়ত। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালীর জীবন ইতিহাসের গবেষণা থেকে অনেক রকমের মাছের নাম পাওয়া যায় যেমন আইড, ইচা, ইলিশ, উলকা, এলেঙ্গা, কাতল, কুড়িশা, কৈ, খয়রা, খরশোলা খলিশা গড়ই গাগর গাঙগেড়ো, চাঁদা, চান্দাগুঁড়া, চিতল, চেং, টেংরা, ডানিকানা, তাপসে, তেচক্ষা, পাঙ্গাশ, পাকাল, পাবদা, পুটি, থলি, বাঁশপাতা, বোয়াল, বাটা, বাচা, বাইম, বেলে ভেদা, ভোলচেঙ্গা, ভোলা, ময়া, মহাশোল, মাগুর, মৃগেল মৌরলা রিঠা, রুই, শোল, গজাল সিঙ্গি’ (হাজার বছরের বাঙালী সংস্কৃতি গোলাম মুরশিদ) এখানে উল্লিখিত অনেক মাছ এখন দুর্লভ। মাছ এখন ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে। শহরে মানুষ আজকাল অনেক স্বাস্থ্য সচেতন তাই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে। ভাতের বদলে রুটি খায় অনেকেই। তরুণ সমাজের আকর্ষণ পাশ্চাত্যের চীনা, থাই ও সুঘলাই খাবারে। গ্রামের মানুষও রুটি চা খেতে পছন্দ করে। তবে ঝাল ও ঝোলে রান্নার যে কৌশল তা গ্রাম জীবনে এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। উঠে গেছে সবরী কলা ও দুধ ভাতের চল। হেমন্তে নতুন ধানে পিঠা পায়েশের যে মহাআয়োজন হতো তাতেও ভাটা পড়েছে। বিয়ের আপ্যায়ন ও অনুষ্ঠানাদিও আয়োজিত হয় শহুরে কায়দায়।

নীহার রঞ্জন রায় বাঙালীর পোশাক সম্পর্কে বলেছেন ‘ধুতি ও শাড়িই ছিল প্রাচীন বাঙালীর সাধারণ পরিধেয়’। যুঘল আমলে ও ব্রিটিশ শাসনকালে নগরের নারী পুরুষের পোশাকে পরিবর্তন এলেও গ্রামের মানুষের পোশাকে ব্যাপক পরিবর্তন হয়নি। হিন্দু ও মুসলমানের পোশাকের এক ধরনের পার্থক্য যদিও বিদ্যমান ছিল। হিন্দু ধর্মীয় পুরুষ ধুতি ও নারীরা একপেরে শাড়ি পরেন আর মুসলিম পুরুষরা লুঙ্গি ও নারীরা একপেরে শাড়ি। অনুষ্ঠানাদিতে হিন্দুরা ধুতির সঙ্গে পাঞ্জাবি ও মুসলিম পুরুষরা লুঙ্গির সঙ্গে পাঞ্জাবি পরেন। পর্দানসিন নারীরা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বোরখা পরেন। বর্তমানে শহুরে পোশাক পরিবর্তনের প্রভাব গ্রাম জীবনকেও আকৃষ্ট করছে। গৃহবধূরা এখন শাড়ির বদলে ম্যাক্সি পরে। স্কুলগামী তরুণীরা সালোয়ার কামিজ ও তরুণরা শর্ট প্যান্ট টিশার্ট ইত্যাদি পোশাক পরে। বিয়ের সাজসজ্জাতেও এখন শহর গ্রামের পার্থক্য প্রায় ঘুচে গেছে। উপজেলার বিপণি কেন্দ্রে একটি করে বিউটি পার্লারও আজকাল আলোক উজ্জ্বলতায় শোভা পায়।

গ্রাম জীবনের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার জীবনোপায়ের উপকরণের পরিবর্তে গ্রামীণ ভাষা ও সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন পরিলক্ষিত। তাদের মুখের ভাষায় অনুপ্রবেশ করছে অনেক ইংরেজী শব্দ যেমন খালা, ফুফু, চাচা, চাচি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আঙ্কল, আন্টি সম্বোধনে হ্যালো ওয়েল কাম শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করছে নিঃসঙ্কোচে নিজস্ব আঞ্চলিক শব্দের পরিবর্তে ব্যবহার করছে মানভাষার শব্দ। পুঁথি পাঠ যাত্রাপালা জারিসারি মারফতি ইত্যাদি ছিল গ্রাম সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। শহুরে সংস্কৃতি ও বিদেশী সংস্কৃতি বর্তমানে গ্রাম সংস্কৃতিকে অপসারিত করছে। গ্রামীণ যুবকদের কাছে ব্যান্ড সঙ্গীত এখন শহুরেদের সমান প্রিয়। ভিন্ন কূল জাতি ও শাসকশ্রেণীর কাছে উপেক্ষিত উপহাসিত হয়েছে। আর্যদের দৃষ্টিতে অনার্যরা ছিল ‘অব্রত’ ‘অদেব’ ‘অযজমান’ ‘মৃধবাচ’ (অস্ফুটবাক) মুসলিম শাসকগণ বাঙালীদের নগ্নদেহ মৎস্যভোজী নীচজাতের মনুষ্যজ্ঞান করতেন। ইংরেজ কর্মকর্তাগণও বাঙালীর আলস্য শৈথিল্য কূটচারিতা নিয়ে কটু সম্ভব্য করেছেন। রেনেসাঁ যুগে বাঙালীর কর্মবিমুখতা সারশূন্যতা পরশ্রীকাতরতা, অগৌরব বোধ করেছেন পীড়িত ও বেদনাবোধ করেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ জাগ্রত প্রাণ মনীষীরা। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করা যায়। তিনি বলেনÑ ‘আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না, আড়ম্বর করি কাজ করি না অনুষ্ঠান করি, বিশ্বাস করি না, যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না, আমরা সকল কাজই পরের প্রত্যাশা করি অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি।’ নীহাররঞ্জন রায়, সুনীতি কুমার, রমেশ চন্দ্র মজুমদার এ সকল অনুসন্ধানী ইতিহাসকারগণ বাঙালীর গৌরবগাথা, জ্ঞানগরিমা শিক্ষা বিজ্ঞানে সাহিত্য সংস্কৃতিতে অবদানের ইতিহাস উন্মোচিত করে। বাঙালী সম্পর্কে আরোপিত বৈশিষ্ট্যের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। বর্তমান বাঙালীর মহান গৌরব ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও জাতিগত মানস-উপপ্লব ঘটে নাই। ঔপনিবেশিক, পরাধীন চারিত্র্য আজো আমাদের চেতনালোকে লুকায়িত। আজো আমরা তোষামুদে সুবিধাবাদী পরশ্রীকাতর অসহিষ্ণু আত্মম্ভর; আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় নৈতিকতা নিম্নগামী। আইনশৃঙলা ভঙ্গে ও অমান্যে অত্যুৎসাহী। গ্রামগুলো একসময় শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র ছিল। শহরের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগ ছিল ক্ষীণ কালেভদ্রে উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য মানুষ শহরে যেত বর্তমান উন্নত যোগাযোগ ও বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে গ্রামগুলো শহরের জীবন উপকরণ চিন্তা ও স্বভাবের নিকট সংস্পর্শে চলে এসেছে। গ্রামের মানুষ অর্থ উপার্জনে অনায়াসে শহরে যাতায়াত করছে। চলে যাচ্ছে দেশান্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে নারী চরিত্রে। তারা শিক্ষায় ও স্বাবলম্বনেও অর্থোপার্জনে অংশগ্রহণ করছে। তারা সাহসী ও প্রতিবাদী অন্যায় অবিচারে আইনের দ্বারস্থ হচ্ছে। তারাও শহরমুখী ও বিদেশমুখী। ফলে গ্রামের পারিবারিক সামাজিক বন্ধন যৌথতা ভেঙ্গে তারাও হয়ে উঠছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন সংগ্রামে, টিকে থাকার, জীবন মান উন্নত করার প্রতিযোগিতায় তারা ক্রমশ কৌশলী ও জটিল হয়ে উঠছে। গ্রার্হস্থ্য শান্তি ও সামাজিক সংহতি বিনষ্ট হচ্ছে দিনে দিনে। শেষ কথাÑ ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি’। আজ আর নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ছবি : তুহিন ইসলাম ও আকিব

মডেল : মৌ, সেলিম, জিতু, টিপু, সেন ও আদ্রিতা

পোশাক : অতঃপর, বিসর্গ, যাত্রা ও বিবিয়ানা

কোরিওগ্রাফার : এডলফ খান

প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২০১৫

১৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: