মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রবীন্দ্রভাবনা বাঙালীকে নতুনভাবে জাগ্রত করবে

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

যতই দিন যাচ্ছে আমাদের সামনে রবীন্দ্রনাথ ততই তাঁর অফুরান সজীবতায়, সৃজনশীলতায় বহুবৈচিত্র্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছেন। এ যেন জাদুমন্ত্র! ক্রমে ক্রমে রবীন্দ্রভাবনা বাঙালীর চিরন্তন পাথেয় হয়ে উঠছে। বিপুলা পৃথিবীতে মানুষের সহায়, অবলম্বন হয়ে তিনি দীপ্তি ছড়াচ্ছেন। বাঙালীর চিন্তায়, সত্তায় মিশে আছেন তিনি- একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। ‘তব ভুবনে তব ভবনে’ সাম্প্রতিককালে রবীন্দ্রনাথ চর্চায় আরও এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। আতিউর রহমান মূলত অর্থনীতির মানুষ-দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ হিসেবে যাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃতি পেয়েছে। রবীন্দ্র গবেষক হিসেবেও রয়েছে সুনাম তার। রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি, সমাজ চিন্তা, দেশচিন্তা, শিক্ষাভাবনা, শিল্পভাবনা, দেশপ্রেম সর্বোপরি রবীন্দ্রমানসের নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তাঁর লেখায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে নিজস্ব সত্তায় তুলে ধরতে চেয়েছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে, যুক্তিতে।

তব ভুবনে তব ভবনে বইটিকে এর লেখক চিহ্নিত করেছেন রবীন্দ্রনাথের আর্থ-সামাজিক ভাবনা-বিষয়ক রচনা সঙ্কলন হিসেবে। বইটির মুখবন্ধে সনৎকুমার সাহা উল্লেখ করছেন ‘সাধারণত ভাববাদী বলে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়। পরমাত্মা ও জীবাত্মার কথা তিনিও শুনিয়েছেন। কিন্তু পরমাত্মার কোন অপার্থিব ধারণা তিনি খাড়া করতে পারেন না। বরং সর্বাস্তিবোধেই বেশি স্বচ্ছন্দ থাকেন। ভুবন ও ভবন তাতে মানব-চৈতন্যেই যুক্ত হয়। প্রকাশ তার প্রত্যক্ষে আপন সীমাতেও। আপন দেশে ও দেশের মানুষে।’ আতিউরও এই জায়গা থেকে তাঁকে দেখেন। তাঁর এবং নিজের সার্থকতা খোঁজেন। তবে পুঁজি-প্রযুক্তির বিকাশ বিন্যাস এক শ’ বছর একই জায়গায় স্থির থাকে না। জীবনের বস্তুগত অবস্থা বদলে যায়। বদলে যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চেহারা। ‘দেশে-দেশে দিশে দিশে যে কর্মস্রোত ধায়’ তাতেও ঘটে মৌলিক পরিবর্তন এবং তা সদাই পরিবর্তমান। রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করেও আতিউর তাই ঠিক তাঁর মতো জীবনের ব্যবস্থাপত্র রচনা করতে পারেন না। তেমন করতে চাওয়াটাই হতো অরাবীন্দ্রিক। তাঁর স্বপ্ন-কল্পনার ভাব অক্ষুণœ রেখে গণমানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণের চাকা সচল রাখার উপায় খুঁজতে হয়। তাদের গতি বাড়াবার কথাও ভাবতে হয়। আতিউর তা-ই করেন। রবীন্দ্রনাথ তাতে খ-িত হন না বরং অধিকতর ও জটিলতর সম্ভাবনার রাশির সামনে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠেন।

মুখবন্ধ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এ বইটি আর দশটি রবীন্দ্রবিষয়ক বই নয়। বরং তার চেয়েও বেশিকিছু। বইটিকে পাঁচটি পর্বে সাজানো হয়েছে। এর প্রথম পর্বে রয়েছে ‘রবীন্দ্রভাবনায় সমাজ ও অর্থনীতি’। এ পর্বে উন্নয়নের প্রারম্ভিক ক্ষেত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন গ্রামকে এবং তিনি সুস্পষ্টভাবে তার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন উৎপাদনের ক্ষেত্র হলো গ্রাম। শহর কেবল ভোগবিলাসেই ব্যস্ত থাকে। সুতরাং এর সংস্কার সাধন জরুরী বলে রবীন্দ্রনাথ নানাধরনের পদক্ষেপও নিয়েছিলেন, যা বর্তমানের প্রেক্ষাপটেও প্রযোজ্য। দ্বিতীয় পর্বে ‘রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও সংস্কৃতি’তে আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখি এক উদ্যোগী চিন্তাবিদ হিসেবে। এই চিন্তাবিদ সর্বজনীন, প্রকৃতিবান্ধব, বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। তৃতীয় পর্বে ‘রবীন্দ্রনাথের কৃষিভাবনা’। এ পর্বে আমরা দেখি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কৃষক সমাজের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ। কৃষি উন্নয়নে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর নানামুখী কর্মতৎপরতার উল্লেখ পাই। নিজের ছেলে ও জামাতাকে কৃষিবিদ বানিয়ে তাদের মধ্য দিয়ে নিজের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার পূরণও করতে চেয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে আসা কৃষি-অর্থনীতিবিদ লিওনিদ এলমহার্স্টকেও এই কর্মযজ্ঞে যুক্ত করেন। আতিউর রহমান এ পর্বে রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগকেও একীভূত করেছিলেন। স্বাধীন দেশে রবীন্দ্রনাথের মতো বঙ্গবন্ধুও অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, কৃষকের উন্নতি ব্যতীত মজবুত কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যে কারণে উনিশ শ’ পঁচাত্তরে আমাদের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনার জন্য বঙ্গবন্ধু কৃষিতে বাধ্যতামূলক সমবায় ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরাসরি রবীন্দ্র চিন্তাভাবনা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। কিন্তু অশুভ শক্তির কাছে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে তার সে উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

চতুর্থ পর্বে ‘রবীন্দ্রচিন্তায় দারিদ্র্য ও প্রগতি’ এবং পঞ্চম পর্বে ‘বাঙালীর চেতনায় রবীন্দ্রনাথ’। এই দুই পর্বে রবীন্দ্র মানসের রবীন্দ্রচিন্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। আতিউর রহমান এই দুই পর্বেও কবির ভাবনাকে নানা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। এত বছর পরে এসেও রবীন্দ্রচিন্তা যে এখনও বাংলাদেশের নানা প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রযোজ্য সে কথাও লেখক যুক্তি-বিশ্লেষণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন।

তব ভুবনে তব ভবনে বইটি পাঠ করলে একথা আমাদের সামনে আবারও নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে রবীন্দ্রনাথ আসলে কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন না। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনে কাটিয়ে দিয়ে আসা জীবনে সবকিছুকেই আদেশ-নির্দেশ বলে মনে করেছেন। মুক্তির উপায় খুঁজে চলেছেন নিরন্তর রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এই মুক্ত ভাবনা পরবর্তীতে বাঙালীকে নানাভাবে জাগ্রত করেছে। অনুপ্রাণিত করেছে- করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণও। রবীন্দ্র ভাবনার সঙ্গে মিলে মিশে, রবীন্দ্র চেতনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আতিউর রহমানও এই বইয়ের মাধ্যমে বাঙালীর মধ্যে রবীন্দ্র ভাবনা প্রোথিত করার নিরন্তর সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেছেন।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: