কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সুস্থ থাকার জন্য করণীয়

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৫
সুস্থ থাকার জন্য করণীয়
  • নজরুল হোসেন

অসুস্থতার একটি বড় কারণ হলো আমাদের নেতিবাচকতা বা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। আসুন আমরা একটু দেখতে চেষ্টা করি যে, আমাদের সুস্থতা সম্পর্কিত অবিদ্যাগুলো কী কী?

১. অসচেতনতা : আমাদের সুস্থতা ধরে রাখতে না পারার একটি বড় কারণ হলো আমাদের অসচেতনতা। স্রষ্টা আমাদের দেহ নামক একটি আশ্চর্য এবং জটিল একটি যন্ত্র দিয়েছেন। আমাদের মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, লিভার ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা ভাবলেও অবাক হতে হয়। হৃৎপিণ্ডের কথাটিই একটু বিবেচনা করি। প্রতিদিন সংকোচন এবং প্রসারণের মাধ্যমে প্রায় ১৬শ’ গ্যালন রক্ত এটি সারাদেহে পরিবহন করে কোনরকম বিরতি না নিয়েই। হৃৎপিণ্ডের গঠন এবং কর্মক্ষমতা অত্যন্ত জটিল। মাত্র ২০০-৩০০ গ্রাম ওজনের এই হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে প্রায় ৭৫ বার স্পন্দিত হয়। একবার স্পন্দন সম্পন্ন হতে কার্ডিয়াক চক্রের মতো জটিল চক্র সম্পাদিত হয় মাত্র ০.৮ সেকেন্ডে। তাহলে, একটু ভেবে দেখুন এই হৃৎপিণ্ডের দাম কত হবে? আর আমরা কতজন একে সুস্থ রাখতে সচেতন হই। সচেতন হই তখন, যখন আমাদের হৃৎপিণ্ডটি আর সুস্থভাবে কাজ করতে পারে না। যখন বাইপাস, এনজিওগ্রাম, পেসমেকার ইত্যাদি ব্যবস্থার সাহায্য নিতে হয়।

এ তো গেল হৃৎপিণ্ডের কথা। বাকি অঙ্গগুলোর প্রয়োজনীয়তাও অনেক। কিন্তু আমরা কতজন বিনামূল্যে পাওয়া এ মূল্যবান শরীরটার একটু যতœ নেই। সামান্য একটা স্বর্ণের গয়না তাকে যতœ করে তুলোয় পেঁচিয়ে রাখি, যাতে চুরি না হয় তার জন্য নিরাপদে রাখি, উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে মাঝেমধ্যেই পলিশ করতে দেই। আমাদের দেহের সুস্থতার জন্য কতটা করি? অথচ একটা অলঙ্কার যে-কোন স্বর্ণকারের দোকানে গেলে কিছু টাকা খরচ করেই পেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের এ শরীরটা পেতে তো কোনো খরচাই আমাদের করতে হয় না। আমাদের দেহের কোন একটি অঙ্গ তো আর কোথাও কিনতে পাওয়া যাবে না। বিশ্বের সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে আমাদের দেহের একটি ছোট্ট হাড়ও কিন্তু অনন্য। কথায় বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা যায় না। তেমনি ততক্ষণ সুস্থতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি না যতক্ষণ না অসুস্থ হই।

২. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি : আমরা কখন আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়টি ভাবি? যখন দেখি যে শরীরটাকে দিয়ে আর কোনো কাজ করা যাচ্ছে না, তখন শরীরের যতেœর কথা ভাবি। কিন্তু যদি প্রথম থেকেই আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতি একটু যতœবান হতাম তাহলে এ বিপত্তি ঘটত না। দীর্ঘদিন আমরা সুস্থ থেকে কাজ করে যেতে পারতাম। আমাদের বেশিরভাগ তরুণ জীবনের প্রথম ২৫ বছর অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেকে তৈরি করেন, পরবর্তী ২৫ বছর অর্থ উপার্জন করেন এবং তার পরের ২৫ বছর স্বাস্থ্যরক্ষায় অর্জিত অর্থ ব্যয় করেন। অর্থাৎ মাঝের ২৫ বছর অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে সে স্বাস্থ্যহানি ঘটেছে, তা ঠিক করতেই পরের ২৫ বছর সে জমানো অর্থ খরচ করেন। এটাই আসলে আমাদের এখনকার দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের মধ্যে অনেকে এ কথা ভেবেই সম্পদ সঞ্চিত রাখেন যে, ভবিষ্যতে চিকিৎসায় খরচ করতে হবে। আজকাল এনজিওপ্লাস্টি, এনজিওগ্রাম, বাইপাস ইত্যাদি যেন ফ্যাশন হয়ে গেছে। আজকাল চারদিকে রোগের এত ছড়াছড়ি যে, রোগের ভয়েই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। একটু হাঁচি-কাশি দিলেই ডাক্তারখানায় লাইন লাগাতে হয়। তারপর একগাদা ওষুধ, এই টেস্ট, সেই টেস্ট। এভাবে চলতে থাকলে নীরোগ মানুষও রোগী হয়ে যান। রোগ দেখলেই ভয় পাওয়া উচিত নয়। স্রষ্টা যদি পৃথিবীতে রোগ দিয়ে থাকেন তবে তার প্রতিকারও দিয়েছেন। মহানবী (স) বলেছেন, ‘মৃত্যু ভিন্ন এমন কোন রোগ নেই যার প্রতিকার আল্লাহ পাঠাননি।’ আমরা আগেই বলেছি যে, ৭৫% রোগের কারণ মনোদৈহিক বা মনের নেতিবাচকতা। আর মনের জট খুলে গেলেই এ সকল রোগের নিরাময় সম্ভব।

৩. ভুল খাদ্যাভ্যাস : ‘বাঁচার জন্যই আসলে খাওয়া’। অর্থাৎ আমরা খাদ্য গ্রহণ করি বেঁচে থাকার জন্য। কাজকর্মে শক্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা করি উল্টো। আমরা খাওয়ার জন্য বাঁচি। খাবার যত সুস্বাদু হয়, তত আমরা পেট বোঝাই করে গলা পর্যন্ত তুলে খাই। যত তেল, চর্বি, ঝাল-মসলা খাবার তত তা সুস্বাদু হয়। আবার, খাবার সম্পর্কে আরেকটি অবিদ্যা হলো রাতে বেশি খাওয়া। আমরা বেশিরভাগই রাতে সকালের তুলনায় বেশি খাই। যত দাওয়াত, সব রাতের বেলাতে পড়ে। আবার, সেখানে গিয়েও গলা পর্যন্ত উঠিয়ে না খেলেই নয়। মনে হয়, কত দিন যেন খাই নি- আবার কবে খেতে পাই, পেট ভরে খাই। একবার এক বিয়েবাড়িতে এক ভদ্রমহিলা তার ছোট্ট ছেলেকে খাবার নিয়ম শেখাচ্ছিলেন, ‘তুমি তো এখনও খেতেই শেখ নাই, খালি মাংসগুলো খাবা, এত পোলাও খাচ্ছ কেন’ মানে, খাবার পেয়েছি যখন তাহলে খাই, কোন সংযমের তোয়াক্কা নেই। আবার, কেউ কেউ বলেন, ‘রাতে খেতে হয়, রাতের খাওয়াটা গায়ে লাগে।’ তাদের এ মূল্যবান সদুপদেশ আসলে অনেক বড় সত্য। কারণ রাতে যদি কেউ উচ্চমাত্রার ক্যালরি খান তবে তার ওজন বেড়েই চলবে। কারণ রাতের খাবার থেকে প্রাপ্ত শক্তি খরচ করার মতো পরিশ্রম আমরা করি না। ঘুমিয়ে থাকি, আর ঐ সময় দেহ খাবার থেকে প্রাপ্ত শক্তি জমিয়ে রাখে ফ্যাট হিসেবে ভবিষ্যতে খরচ করার জন্য। আবার, অনেক সময় ওজন কমানোর আশায় আমরা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকি। কিন্তু এটাও ঠিক নয়। কারণ বেশিক্ষণ খালি পেটে থাকলে এসিডিটির সম্ভাবনা থাকে, অতিরিক্ত ক্ষুধা পায়। তখন দেখা যায়, সকালে হয়ত খালি পেটে থাকে, দুপুরে ওভারলোড হয়ে যায়। আবার, অনেকক্ষণ না খেয়ে থেকে কেউ হয়ত একটা মিষ্টি বা রসগোল্লা খেয়ে ভাবলেন, যাক কম খেলাম। কিন্তু একটা ছোট্ট মিষ্টিতে যে পরিমাণ ক্যালরি থাকে তার বদলে একটু ভাত বা দুটি রুটি, এক টুকরো মাছ, একটু ডাল সব্জি খেলেও ভাল ছিল।

সুস্থতা রক্ষায় করণীয়

জীবনাচারে কিছু কিছু পরিবর্তন আনতে পারলেই আমাদের সুস্থতার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

১. আমরা নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলব। ঘুম, খাওয়া, গোসল ইত্যাদি প্রতিদিন একই সময়ে করতে সচেষ্ট হব। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কাজগুলো ঠিক সময়ে করি না। একেকদিন একেক সময় করি। কিন্তু এ কাজগুলো সঠিক সময়ে করা একদিকে স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি। অন্যদিকে সময়ের অপচয় রোধ করবে।

২. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাব এবং জেগে উঠব। ঘুমের ক্ষেত্রে বেশি রাত জাগব না এবং দেরিতেও উঠব না। ভোরে উঠতে চেষ্টা করব। বিদূষী খনা বলে গেছেন, ‘সকাল শোয়, সকাল ওঠে; তার কড়ি বদ্যি না লুটে।’ অর্থাৎ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারার অভ্যেস অনেক অনাকাক্সিক্ষত রোগ এবং ওষুধপথ্য হতে দূরে রাখবে। ডাক্তারের খরচও কমবে। রাত জেগে টিভি দেখব না এবং ঘুমের সময় অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে থেকে টিভি দেখা বন্ধ করে দেব। এতে স্নায়ু উত্তেজিত হবে না এবং ঘুম ভাল হবে। ঘুমের সময়ের কমপক্ষে চার/পাঁচ ঘণ্টা আগে থেকে চা/ কফি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।

৩. খাওয়ার সময় আমরা তাড়াহুড়ো করব না। ধীরে ধীরে মমতার সঙ্গে সময় নিয়ে খাব। খাওয়ার আগে প্রার্থনা করব। ভালমতো চিবিয়ে খাব। এতে হজম সহজে হবে এবং পরিমাণে কম খেয়ে তৃপ্ত হতে পারব। খাবার চিবিয়ে খেলে মাড়ির ব্যায়াম হয় এবং ব্রেনে একটি সিগন্যাল যায়। তখন ব্রেন কমান্ড করে, তুমি অনেক চিবিয়েছ, আর চিবুতে হবে না। এতে কম বা অল্প পরিমাণ খেয়ে তৃপ্ত হওয়া যায় এবং সুস্থ থাকা যায়। খাওয়ার সময় মৌন থাকতে চেষ্টা করব। খেতে খেতে টিভি দেখব না এবং পরচর্চা করব না। এতে খাবারের বরকত কমে এবং হজমে গণ্ডগোল হতে পারে।

৪. সকালে ভরপেট নাস্তা করব, দুপুরে পরিমিত আহার এবং রাতে সামান্য খাব। খাবার মাঝখানে, আধঘণ্টা আগে ও পরে বেশি পানি পান করব না।

৫. রং দেয়া মিষ্টি, সফট ড্রিংস, এনার্জি ড্রিংস, টেস্টিংসল্ট জাতীয় খাবার, আইসক্রিম, জুস পরিহার করব। এ খাবারগুলো ওজন বাড়ানো হতে শুরু করে কোন কোন ক্ষেত্রে ক্যান্সারের কারণ পর্যন্ত হতে পারে।

৬. নবীজী (স) এর হাদিস অনুযায়ী, খাবার সময় পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং এক-তৃতীয়াংশ ফাঁকা রাখব। এ নিয়মে খাদ্য গ্রহণ করলে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্তও হজমশক্তি সমুন্নত থাকবে।

৭. দুধ-চা বর্জন করব। চিনি ছাড়া লিকার চা পান করব। সম্ভব হলে সবুজ চা পান করব।

৮. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকব। রোজ গোসল করব। অনেকেই শীত এলে এক বা দুদিন বাদে বাদে গোসল করেন এবং বাচ্চাদেরও তাই করান। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসল একান্ত জরুরী। গরমের সময় স্বাভাবিক ঠা-া পানিতে এবং শীতে এমনভাবে গরম পানি মেশাতে পারেন যাতে পানির তাপমাত্রা দেহের তাপমাত্রার চেয়েও কম থাকে। এতে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

৯. নিয়মিত ব্যায়াম। সম্ভব হলে প্রতিদিন অন্তত একঘণ্টা হাঁটব। এতে অতিরিক্ত ওজন, মেদ, ডায়বেটিস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ব্রেনের কর্মক্ষমতা বাড়বে।

১০. নিয়মিত দুবেলা মেডিটেশন করা। মেডিটেশন মনকে প্রশান্ত রাখতে, দেহের বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং গ্রন্থিগুলোর সঠিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে অত্যন্ত জরুরী। বিভিন্ন বিপাক কার্যাবলীর কারণে আমাদের দেহে যে টক্সিন উৎপন্ন হয় মেডিটেশন তা নির্মূল করে দেয়। নিয়মিত মেডিটেশন করলে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণক্ষমতা, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে। হার্ট, কিডনি, পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয় সুন্দরভাবে কাজ করবে। মেডিটেশনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে সরকার মেডিটেশনকে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। চিকিৎসকদের প্রেসক্রাবইড করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

ছবি : আরিফ আহমেদ

মডেল : সারিকা, কল্যাণ ও মোনালিসা

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৫

১৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: