কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পরিবারে সাংস্কৃতিক নৈকট্যেই স্বস্তি

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৫
পরিবারে সাংস্কৃতিক নৈকট্যেই স্বস্তি
  • সিরাজুল এহসান

শহীদ সাহেবের মেয়ে রুমকির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ভাল পাত্র পেয়ে তিনি আর হাতছাড়া করলেন না। গত বছর মাস্টার্স শেষ করেছে মেয়ে। ছেলে রুমনের আনন্দের যেন শেষ নাই। বড় বোনের বিয়ে বলে কথা। সেও অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আনন্দের পাশাপাশি একটু বেদনাও কাজ করছে। একমাত্র বড় বোনকে ‘হারাতে’ হবে বলে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান সমাগত। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে রুমন বন্ধুদের নিয়ে। বাবা শহীদ সাহেবকে শেষ পর্যন্ত জানাল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে ওরা ভিজে পার্টি বা ব্যান্ডের লাইভ কনসার্ট করবে। শহীদ সাহেব শুনে প্রমাদ গুনলেন। ভাবছেন এ কেমন সংস্কৃতি! একে তো ভাড়া বাসা। তার ওপর শব্দ দূষণের ব্যাপার আছে। আশপাশের বাড়ি থেকে যদি অভিযোগ আসে? তিনি মফস্বলে বেড়ে উঠেছেন। ঢাকায় দীর্ঘদিন বাসা ভাড়া করে আছেন। মোটামুটি ভাল চাকরি করেন। মেয়ের বিয়েতে দু’হাত খুলে খরচ করবেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী। কিন্তু ছেলের এ বায়না তার কাছে ‘আপদ’ বলেই মনে হলো। তিনি ছোটবেলায় এমনকি যৌবনকালেও দেখেছেন বিয়ে-গায়ে হলুদ, খৎনার উৎসবে গ্রামের মহিলাদের গীত গাইতে। তার খৎনা ও বিয়েতে গীত গাওয়া হয়েছিল কয়েকদিন ধরে। ছেলেকে না বলতেও পারছেন না আবার না পারছেন মেনে নিতে। আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন বিষয়টি তাঁর পছন্দ নয়। ছেলেও যেন কিছুটা মনোক্ষুণœ হয়েছে। পিতা-পুত্র দু’জনই ভাবছে ব্যাপারটা নিয়ে কি দু’জনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হলো?

পর্যবেক্ষণ-২

রিতা ক্লাস সেভেনে উঠতে না উঠতেই কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক মোটা হয়ে গেল। মা রাশিদা বেগম ও বাবা সোলেমান আলী একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। দু’জনই চাকরিজীবী। মেয়ের সব সাধ-আহলাদ পূরণে কার্পণ্য করেন না। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আরও স্বাধীন। কিছুদিন হলো রিতা খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কেমন উদাসীন। বলে মুখে রুচি নেই। রাশিদা-সোলেমান সেই সাতসকালে অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে যান। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। একদিন রিতাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হলো। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মোটামুটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ও গঠনের অধিকারী। তাদের তিন পুরুষের মধ্যে এমন অস্বাভাবিক মোটা কেউ নেই। খাদ্য তালিকায় ফাস্টফুড ও এর প্রতি বেশি মাত্রায় রিতার আসক্তির কথা শুনে ডাক্তারের বুঝতে বাকি রইল না কেন এমন ঘটছে। গত প্রায় পাঁচ বছর ফাস্টফুড ছাড়া বলতে গেলে বাসার কোন খাবারই রিতার রুচে না। এরপর চলল রিতার ওপর চাপাচাপি, বাসায় রান্না করা খাবার খাওয়ানোর যুদ্ধ। কিন্তু অভ্যাস বলে কথা! কাজ হলো হিতে বিপরীত। মেয়ে শেষে খাবারই বন্ধ করে দেয় আর কি। ওর কাছে এক আতঙ্কের নাম হলো খাদ্য গ্রহণ। দূরত্ব সৃষ্টি হলো বাবা-মার সঙ্গে। বাবা-মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে না। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন রাশিদা-সোলেমান দম্পতি।

সমাজ নিরীক্ষণ যাঁরা করেন তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করবেন সমাজের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির কিছু পরিবর্তন ঘটে। যদিও সংস্কৃতির মৌলিক কোন হেরফের ঘটে না। ঘটে শুধু অনুপ্রবেশ। সে অনুপ্রবেশ কখনও হয় ইতিবাচক, কখনও বা নেতিবাচক। এই ইতি আর নেতির মানদ-ও হয় স্থানকাল পাত্রভেদে আপেক্ষিক। তবে যে পরিবর্তনটা ঘটে সেটার প্রভাব সরাসরি পড়ে সমাজে একক বলে পরিচিত পরিবারে। স্বাভাবিক নিয়মেই পরিবারে সমমনা ও একই প্রজন্মের মানুষ বাস করেন না। তাদের মানস গঠনের প্রেক্ষাপটও এক হয় না। পরিবারে আজ যারা পিতা-মাতারা অভিভাবক পর্যায়ে তাঁরা গত শতকের ছয় থেকে নয়ের দশকের যুবসমাজ। তাদের এই সময়ের আর্থ সামাজিক- রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা মূল্যবোধ গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আর বর্তমানের প্রজন্ম ২০০০ পরবর্তী পরিবর্তিত দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রভাবে প্রভাবিত। আজ যারা পিতা-মাতা বা অভিভাবক তাদের কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভে মোবাইল ইন্টারনেটের সুবিধা পাননি। তাঁদের বিশ্বও ছিল সীমিত। অথচ তাঁদের সন্তান বা পোষ্য মোবাইল ইন্টারনেটের সুবিধায় বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের প্রভাব সমাজ পরিবারে পরিলক্ষিত হবে এটাই স্বাভাবিক। এ পরিবর্তনে পরিবারে মনোমালিন্য, মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে শুধু জেনারেশন গ্যাপের কারণে।

বর্ণিত দুটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছেÑ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে ডিজে বা লাইভ কনসার্টেল ব্যাপারে পিতা নিষ্পৃহ। মনে মনে মেনে নিতে পারছেন না। সন্তান তার সময় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সংস্কৃতির ওই অনুষঙ্গকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে। যা কিনা আমাদের আবহমান সংস্কৃতির অঙ্গভুক্ত নয়। প্রকারন্তরে সাংঘর্ষিক। অন্য ঘটনায় পিতামাতার অসতর্কতাই হোক বা অতি সন্তান বাৎসল্য হোক মেয়ে ফাস্টফুডে আসক্ত হয়ে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। যে ফাস্টফুড আমাদের খাদ্য সংস্কৃতিভুক্ত নয়। পিতা-মাতা ভাত-মাছ, রুটি-সবজিতে হয়ত অভ্যস্ত। পরিবারে এই যে সাংস্কৃতিক সংঘর্ষজনিত কারণে একটু শান্তি ব্যাহত হচ্ছে তা থেকে মুক্তির উপায় কী? এমন প্রশ্ন অনবিপ্রেত নয়।

সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আমাদের জীবনযাপন করতে হয়। এ পরিবর্তনকে মেনে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখানে কনসার্টের ব্যাপরটি মেনে নিয়ে বোঝানোর চেষ্ট করা দরকার এর জন্য যেন অন্যের নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ না হয়। পাবলিক নুইসেন্স নামে যে একটা আইন আছে তা মনে রাখা জরুরী। সবেচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে থেকে যে কোন অনুষ্ঠানই কাম্য। ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিলে নিজেদের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দ্বিতীয় ঘটনায় ফাস্টফুড একেবারে নিষিদ্ধ করা সন্তানের মনে বিরূপতা সৃষ্টি করেছে। মাঝেমধ্যে ফাস্টফুড মেনে নেয়া যায়; এতে বড় ধরনের ক্ষতি বা সমস্যা সৃষ্টি হয় না। ফাস্টফুডের কতটা স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। শিশুকে সেটা বোঝানো দরকার। সেই সঙ্গে এটাও বোঝানো প্রয়োজন এ জাতীয় খাবার আমাদের খাদ্য সংস্কৃতিভুক্ত নয়। কোন চরমপন্থায় না গিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বৃদ্ধিবৃত্তিক কৌশলে পরিবারে আনতে হবে স্থিতিশীলতা এবং শান্তি-স্বাস্তির উৎস।

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৫

১৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: