আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ধূলিকণাও ছিল মহাবিশ্বের আদি যুগে

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • এনামুল হক

মহাবিশ্বের ধূলিকণা অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেটা গ্রহ-উপগ্রহ গঠন এবং নক্ষত্র সৃষ্টিÑ উভয় ক্ষেত্রেই সত্য। তবে মহাবিশ্বের শুরুতে কোন ধূলিকণা ছিল না। আদিমতম নীহারিকাগুলোরও কোন ধূলিকণা ছিল না। ছিল শুধু গ্যাস। বিজ্ঞানীমহলে এমন একটা ধারণাই এতদিন প্রচলিত ছিল। কিন্তু এখন একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের একেবারে আদিম অবস্থার সময়কার ধূলিকণাপূর্ণ একটি নীহারিকা আবিষ্কার করেছেন। এই আবিষ্কার থেকে দেখা গেছে যে, নীহারিকাগুলো কার্বন ও অক্সিজেনের মতো মৌলিক পদার্থসংবলিত ধূলিকণায় অতিদ্রুত সমৃদ্ধ হয়েছিল।

মহাজাগতিক ধূলিকণা হলো ধূম্রের মতো বস্তুকণা। এগুলো হয় কার্বন (সূক্ষ্ম ঝুল) নয়ত সিলিকেট (সুক্ষ্ম বালি) দিয়ে গঠিত। ধূলিকণায় মূলত রয়েছে কার্বন, সিলিকন, লৌহ, অক্সিজেন ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো মৌলিক পদার্থ। এই পদার্থগুলো নক্ষত্রের মধ্যে পারমাণবিক দহন প্রক্রিয়ায় সংশ্লেষ হয় এবং নক্ষত্রগুলো বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় সেগুলো মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। মহাশূন্যে সেগুলো ধূলিকণা ও গ্যাসের মেঘমালায় জমা হয়। এই মেঘমালা থেকে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন নক্ষত্র এবং প্রতিটি প্রজন্মের নতুন নক্ষত্রসমূহের জন্য গঠিত হয় আরও কিছু পদার্থ। এটা এক ধীর ও মন্থর প্রক্রিয়া এবং মহাবিশ্বের ইতিহাসে অতি আদিমতম নীহারিকাগুলোতে ধূলিকণা তখনও গঠিত হয়নি।

কিন্তু এখন গবেষকদের একটি নতুন দল অনেক দূরের একটি নীহারিকা আবিষ্কার করেছেন, যাতে বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা আছে। এই আবিষ্কারের ফলে ধূলিকণা কত দ্রুত গঠিত হয়েছিল, সে বিষয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আগের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিলস বোর ইনস্টিটিউটের ডার্ক কসমোলজি সেন্টারের গবেষকরা এটি আবিষ্কার করেন। গবেষকদলের অন্যতম জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞানী ডারাচ ওয়াটসন এই আবিষ্কারটির ব্যাখ্যা করে বলেন, এ যাবতকালে দেখতে পাওয়া সবচেয়ে দূরের একটি নীহারিকায় এই প্রথম ধূলিকণার সন্ধান পাওয়া গেল। নীহারিকাটি মহাবিস্ফোরণের মাত্র ৭০ কোটি বছর পর সৃষ্টি হয়। ওটা একটা মাঝারি আকারের নীহারিকা, তথাপি তা ইতোমধ্যে ধূলিকণায় পূর্ণ হয়ে আছে। ব্যাপারটা অত্যন্ত বিস্ময়কর। এ থেকে বোঝা যায় যে, সাধারণ নীহারিকাগুলো ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত ভারী পদার্থে সমৃদ্ধ হয়েছিল।

এই গবেষণা কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন ডারাচ ওয়াটসন এবং দলটিতে সুইডেন, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ছিলেন।

আবিষ্কৃত নীহারিকাটি অনেক দূরে অবস্থিত এবং সে কারণে এর জ্যোতি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্প্রভ। সাধারণ অবস্থায় পৃথিবী থেকে এর সন্ধান বের করার কথা নয়। তবে এক সৌভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে এর আলোটা বেড়ে গেছে। কারণ এবেল ১৬৮৯ নামে এক বিশাল নীহারিকাগুচ্ছ এই নীকারিকা ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থিত। নীহারিকাগুচ্ছের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দূরের ওই নীহারিকার আলো প্রতিসরিত করে দেয়। তার ফলেই এ আলো প্রসারিত বা বর্ধিত হয়ে পড়ে। এই ব্যাপারটার একটা নাম আছে। একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। এটি ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাসের কাজ করে, যার ফলে ছোটকে বেশ বড় করে দেখা যায়।

একই গবেষক দলের অন্যতম নেতা ডার্ক কসমোলজি সেন্টারের জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞানী নাইস ক্রিস্টেনসেন এই আবিষ্কারের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী নীহারিকাগুলোর সন্ধান করেছি। হাবল মহাকাশ টেলিস্কোপের সাহায্যে দেখা আলোর রঙের ওপর ভিত্তি করে আমরা দেখতে পেয়েছি কোন্ নীহারিকাগুলো সবচেয়ে দূরবর্তী হতে পারে। চিলির টেলিস্কোপ ভিএলটির অতি স্পর্শকাতর যন্ত্র এক্স-শুটার স্পেকটোগ্রাফের পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে আমরা নীহারিকাগুলোর বর্ণালী পরিমাপ করেছি এবং তা থেকে এর রেড শিফট হিসাব করে বের করেছি। রেড শিফট হলো লাল আলো সরে যাওয়া অর্থাৎ নীহারিকাটি আমাদের থেকে যত দূরে সরে গেছে, এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যও ততই বদলে গেছে। সেই রেড শিফট বা তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে পরিবর্তন থেকে আমরা হিসাব করে বলতে পারি, নীহারিকাটি আমাদের থেকে কত দূরে অবস্থিত। আর সেই হিসাবের ভিত্তিতেই বলা যায়, আমরা যা ধারণা করেছিলাম, সেটাই ঠিক। নীহারিকাটি এযাবৎকাল আমাদের জানা সবচেয়ে দূরের নীহারিকাগুলোর অন্যতম।’

সবচেয়ে দূরের এই নীহারিকার অস্তিত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর গবেষক দল কী করেছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডারাচ ওয়াটসন। তিনি বলেন, এরপর তারা আলমা টেলিস্কোপ দিয়ে নীহারিকাটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং তখনই ব্যাপারটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তখনই তারা দেখতে পান যে, নীহারিকাটি ভূলিকণায় পূর্ণ। কিভাবে এই ধূলিকণার অস্তিত্ব জানতে পারা গেল, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ওয়াটসন। তিনি বলেছেন, আদিম নীহারিকাগুলোর নবীন নক্ষত্রসমূহ থেকে তপ্ত অতিবেগুনী রশ্মি বিকীরিত হয়। এই তপ্ত অতিবেগুনী রশ্মি চারপাশের বরফশীতল ধূলিকণাকে উত্তপ্ত করে তোলে। এই দূরের ইনফ্রাবের আলোই বলে দেয় যে, নীহারিকায় ধূলিকণা আছে ব্যাপারটা বেশ বিস্ময়কর এবং এই প্রথম এ ধরনের কোন আদি নীহারিকায় ধূলিকণা দেখতে পাওয়া গেল। কাজেই নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়াটি তাহলে নিশ্চয়ই মহাবিশ্বের ইতিহাসের অতি আদি অবস্থায় শুরু হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়াটি ধূলিকণা গঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

বিপুল পরিমাণ কঠিন পদার্থের উপস্থিতি নির্ণয় থেকে দেখা যায় যে, নীহারিকাটি অতি আদিম অবস্থায় কঠিন পদার্থে সমৃদ্ধ ছিল, যা কিনা জটিল মলিকুল এবং গ্রহ-উপগ্রহ গঠনের পূর্বশর্ত।

গবেষকরা এখন আশা করছেন যে, ভবিষ্যতে আলমা টেলিস্কোপকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশ কিছুসংখ্যক দূরের নীহারিকা পর্যবেক্ষণ করা গেলে মহাবিশ্বের ইতিহাসের একদম আদিপর্বে এ ধরনের নীহারিকার উদ্ভব কিভাবে ঘটেছিল, সে রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হতে পারে।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: