আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একাত্তরের বীর প্রজন্ম

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

একাত্তরের বাঙালী তারুণ্য ছিল অন্যরকম। নিজেকে নিয়ে ভাবনার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার কাছে তার দেশ, জাতিএবং স্বাধীনতা। সব একাকার হয়ে তাকে আন্দোলিত করেছে সম্মুখসমরে আত্ম বলিদানে। সেদিনের তারুণ্য দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলো। তাদের কাছে ছিল ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্যসম।’ স্বাধীনতার শপথে ছিল তারা বলীয়ান। দুরন্ত সাহস ছিল তাদের বুকে। চোখে ছিল দুঃসাহসী স্বপ্ন। একটি লালসবুজ পতাকা পত পত করে উড়ছে। তার নিচে দাঁড়িয়ে গাইছে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’ নিজ স্বাধীন ভূখ-ের মাঝে। সেদিনের তরুণরা যেমন স্বপ্ন দেখেছে, তেমনি কঠিন কঠোর সংগ্রাম করেছে। শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে তারা চলে গিয়েছিল রণঙ্গনে। তরুণদের আরেকটি অংশ পাকিস্তানী হানাদারদের সহযোগী হিসেবে স্বাধীনতার যুদ্ধরত তরুণ যোদ্ধাদের হত্যাসহ বাঙালীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, ধর্ষণ, হত্যা, লুটপাটসহ সব ধরনের অপকর্ম করত। তারা নিজেদের শিক্ষককে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করেছে পরাজয়ের পূর্ব মুহূর্তে। তারা স্বাধীনতা চায়নি।

অথচ এই স্বাধীনতার জন্য বাঙালী তরুণরা ২৪ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে পরম্পরায় সংগঠিত হয়েছে। তারা ছিল সংখ্যায় বেশি। পরাজিত তরুণরা যুদ্ধ শেষে পালিয়ে যায়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাধ্য হয় আত্মসমর্পণে । একাত্তরের তরুণরা ছিল যোদ্ধা। যারা জীবনপণ রেখে যুদ্ধ করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটাকে ছিনিয়ে এনেছে। কত লাখ লাখ যুবক শহীদ হয়েছে। কত মা পুত্রহারা হয়েছেন। কত বোন ভাই হারা হয়েছে। কত পিতা সন্তান হারা হয়েছেন। একাত্তরের ৯ মাস যে গণহত্যা চালিয়েছে পাকিসেনারা, তাতে সংখ্যায় তরুণরা মারা গেছেন বেশি তথা শহীদ হয়েছেন। মুক্তিকামী বাঙালী যে বীরের জাতি, তা প্রমাণে সেদিনের তরুণরা লড়াই করেছিল জীবন বাজি রেখেই। মৃত্যুকে ভয় করেনি। যখন তারা জানোয়ার হত্যা করার শপথ নিয়েছিল, তখন ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র। আর যে রাষ্ট্রর লক্ষ্যই ছিল বাঙালীদের শোষণ করা, বঞ্চিত রাখা। পূর্ব বাংলা হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানী শাসকদের উপনিবেশ। কথা বলার পথ ছিল বন্ধ। গান গাওয়ার কণ্ঠরোধে তারা ছিল সক্রিয়। হাসতে, চলতে, ফিরতে, গাইতেÑ সবখানেই তাদের বাধা ছিল। রক্তচুক্ষু শাসকরা নিপীড়নের যত পথ ও পন্থা ছিল, সবই আরোপ করেছিল। বাঙালী জাতিসত্তাকে, বাংলা ভাষাকে পদদলিত করাই ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। বাঙালী জাতি যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, অশিক্ষিত থাকে এবং দারিদ্র্যের নিগড়ে বাঁধা থাকে। ক্রীতদাসের মতো আচরণ করে তারা বাঙালীদের সঙ্গে। গোলামীর শৃঙ্খল ভাঙ্গাই ছিল তখন বাঙালীর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নপূরণে এগিয়ে এসেছিলেন রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমান।

সেই ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হয়। পাকিস্তান ও ভারত এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যায়। আর পাকিস্তান দেশ ভাগের কয়েক বছরের মাথায় চলে যায় সামরিক শাসনের অধীনে । দেশটি একটি সংবিধানও প্রণয়ন করতে পারেনি। সামরিক জান্তা শাসকরা পূর্ব বাংলার মানুষকে কঠোর নিপীড়নের মধ্যে রাখে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সবক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গকে বঞ্চিত করে। বাঙালী সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশকে রুদ্ধ করতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করে। নজরুলের সাহিত্য সঙ্গীতকে ইসলামীকরণ করা হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মৌলিকত্ব বিনষ্ট করতে আরবি, উর্দু, ফার্সি ভাষার ব্যবহার বাড়ানো হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল এদেশের তরুণ। সেই ভাষার পতাকা নিয়ে বাঙালী তরুণরা দশকে দশকে এগিয়ে গেছে শত বাধা ভেঙ্গে। কত তরুণ জেলের গরাদের ভেতর গুমড়ে মরেছে। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের তরুণরা পাকিস্তানী উপনিবেশ থেকে পূর্ব বাংলাকে রক্ষার জন্য স্বাধিকারের দাবিতে সংগঠিত হয়েছিল। পদে পদে সামরিক জান্তা শাসকের নিপীড়ন লাঞ্ছনা, শোষণের মাত্রা বাড়ছিল। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে বিকৃত ইতিহাসকে ঠাঁই দেয়ায় তারা ক্ষোভে-বিক্ষোভ ফেটে পড়েছিল। পূর্ব বাংলায় উৎপাদিত হতো কাগজ। সেই কাগজ পাকিস্তানীরা কিনত আট আনা দিস্তা। আর পূর্ববঙ্গে বিক্রি হতো দু’টাকা দিস্তা। বাংলার পাট রফতানির পুরো অর্থ তারা ব্যয় করত পাকিস্তানের উন্নয়নে । করাচী, লাহোরসহ সব শহর আধুনিকায়ন করে বাঙালীর শ্রমের অর্থে। পূর্ববঙ্গের কৃষক, শ্রমিকরা দিন দিন অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করতে থাকে। সর্বত্রই বঞ্চনা আর হাহাকার। কোথাও কোন আশার আলো নেই। এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার সর্বত্র। বাংলার হাড় জিরজিরে মানুষেরা ভাগ্যের হাতে নিজেদের সমর্পিত করে ফেলেছেন প্রায়। হতশ্রী, দরিদ্র বাংলার মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হ্যামিলনের বাঁশি হাতে এসেছিলে শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরপরই তরুণ শেখ মুজিব বুঝেছিলেনÑ পূর্ববাংলা নতুন এক শোষকের হাতে বন্দী হয়ে পড়ছে। এই বাঙালীকে বাঁচাতে হবে। ধাপে ধাপে তিনি বাঙালী জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও প্রস্তুত করতে থাকেন মহাজাগরণের পথে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সব প্রলোভনকে উপেক্ষা করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাঙালীর মুক্তির পথরেখা নির্মাণে। কারাগারে আটকে রেখেও নিবৃত্ত করা যায়নি শেখ মুজিবকে। পূর্ব বাংলার নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ করায় তিনি ক্ষোভ জানিয়েছিলেন পাকিস্তান সংসদেও। পাকিস্তানীরা পূর্ব বাংলায় নিজস্ব সরকার গঠনেও বাধা দিয়ে আসছিয়। উর্দুভাষী পাকিস্তানীরা শাসক হিসেবে শাসন করত পূর্ব বাংলা । বাঙালীর অধিকারের দাবি করা হলে, দাবি উত্থাপককে ‘ভারতের চর’ ও ‘ইসলামের শত্রু’ বলা হতো। কথায় কথায় বাঙালী ছাত্র নেতাদের জেলে পাঠানো হতো। বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেলে আটক রাখা হতো প্রগতিশীল তরুণ রাজনীতিদেরই বেশি। ছাত্রদের অনেককেই জেল থেকে পরীক্ষা দিতে হতো। পাকিস্তানী শাসকরা তাদের ‘খয়ের খাঁ’ হিসেবে ছাত্র তরুণদের একটা অংশকে ব্যবহার করত। কিন্তু বিশাল তরুণ সমাজের প্রতিবাদ প্রতিরোধের তোড়ে তারা হারিয়ে যেত।

বিশ শতকের ষাটের দশক জুড়ে পুরো তরুণ সমাজ তথা ছাত্রদের একদিকে বিদ্যার্জন, অপরদিকে দেশ মাতৃকার অধিকার আদায় আন্দোলন করতে হয়েছে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা শাসকের বাঙালীর শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে কঠোর নিপীড়ন, শোষণ, কণ্ঠরোধ, সাম্প্রদায়িকীকরণসহ এক ঔপনিবেশিক জাতিতে পরিণত করার তৎপরতার বিরুদ্ধে আন্দোলন। তরুণদের আন্দলনের মুখে জান্তা শাসকরা পিছু হটেছে কখনও কখনও, কিন্তু নিপীড়ন বন্ধ রাখেনি। কোন তরুণ ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হলে তার পিতাকে জবাবদিহি করতে হতো, বিশেষত চাকরিজীবীদের। শাসকদের তল্পিবাহক যারা ছিল, তারা তরুণদের একটি অংশকে প্রলোভিত করে, ‘গু-া-পা-া’তে পরিণত করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ গলায় সাপ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করত। এদের ছিল দোর্দ- দাপট। তবে তা সাময়িক।

তরুণদের প্রতিরোধে তারা ভেসে যায় একসময়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেও সরকারের অনুমোদন নিতে হতো। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়াও ছিল কঠিন। এসব ক্ষোভ তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হয়েছে। বহু তরুণ জেল খেটেছে। সে সময় আলোকবর্তিকা নিয়ে রাজনীতিতে নতুন দাবি সংযোজিত হলো ৬ দফা। ছাত্ররা পাশাপাশি তাদের দাবিসহ জাতীয় দাবি নিয়ে ১১ দফা ঘোষণা করে। তরুণদের নেতৃত্বেই শুরু হয় আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। মাঝখানে নেতৃত্বেই ছিল তরুণরা। সামরিক জান্তার পতন ঘটে গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্রদের পাশে দেশবাসী একত্রিত হয় সে সময়। আর তার ধারাবাহিকতায় তরুণ ছাত্র সমাজ স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দাবিতে ক্রমশ তৈরি হতে থাকে।

১৯৭০-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ছাত্র সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। একাত্তরের তরুণদের জীবনে তখন দেশমাতৃকা বড় হয়ে দাঁড়ায়। ‘এই দেশেতে জন্ম আমার, এই দেশেতে মরি’ চেতনা তাদের। তারা দেশের জন্য নতুন পতাকা তৈরি করল। সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করল। স্বাধীনতার স্বপ্ন তাদের তাড়িত করে ফিরছিল। তরুণদের একটা ক্ষুদ্র অংশ অবশ্য পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পক্ষাবলম্বন করছিল। তারা নির্বাচনে বিপুল ভোটে হেরে গিয়েছিল। এই পরাজিত শক্তি সামরিক জান্তার ক্রোড়ে আশ্রয় নেয়।

উত্তাল সময় তখন দেশেজুড়ে। সাগরজুড়ে জেগেছে উর্মিমালা। নদীর শান্ত জল তরঙ্গায়িত হয়ে উঠেছে। বৃক্ষ লতাপাতাজুড়ে ঝোড়ো হাওয়া। রক্তে, আগুনে বারুদে ঝলসে উঠছে দেশ। আকাশে-বাতাসে-মাটিতে ধ্বনিত হয়ে উঠছে মুক্তিকামী বাঙালী তরুণদের সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’। সারা পৃথিবী যেন অবাক তাকিয়ে রয়। সহস্র বছরের নিপীড়িত লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, শোষিত মানুষের একতার জয়ধ্বনি শুনে বিস্ময়ে প্রেরণার হাত বাড়ায়। বিশ্বজুড়ে তখন বাংলার মানুষ আর তার মুক্তি সংগ্রামকে উজ্জীবিত করার জন্য মহানায়কের বজ্রনির্ঘোষ নির্দেশকে পাথেয় করে দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। নতুন যৌবনেরই দূত হয়ে সে সময়ের তরুণ যুবারা সাহসে বুক বেঁধে এগিয়ে গিয়েছিল মুক্তির দীপ্রতারুণ্যে। রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে আত্ম বলিদানে মত্ত হয়েছিল দেশমাতৃকাকে হানাদারের সশস্ত্র আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্য। চোখে-মুখে তাদের সূর্যের আলোকছটা। রেঙে উঠছে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন স্বদেশকে ঠাঁই দেয়ার দীর্ঘতর সাধনার বাসনায়। কণ্ঠে যাদের জয়গান ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল মুক্তির অদম্য উৎসাহে। একাত্তরের তরুণরা ছিল বীর। সাহসের দৃঢ়তায় তারা যা করেছে, তা চিরস্মরণীয়। শহীদ তরুণরা তরুণ হয়েই থেকে যাবেন স্মৃতিতে। একটি দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সেদিন তরুণ সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদেরই ফসল আজকের ডি-প্রজন্ম। ৪৪ বছর আগের সেই সব তরুণরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বীরের মতোই দৃঢ় থাকবেন।

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

১০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: