মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তীব্র হলেও ॥ প্রতিরোধে নেই সমন্বয়

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তীব্র হলেও ॥ প্রতিরোধে নেই সমন্বয়
  • মাসব্যাপী দেশজুড়ে সন্ত্রাস, পেট্রোলবোমায় ৬ জন নিহত হওয়ার পরও সাংগঠনিকভাবে কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ
  • এমপি মন্ত্রী ও নেতারা এলাকার সংগঠন নিয়ে কাজ করেন না, সবই বড় বড় কথার ভেতর সীমাবদ্ধ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতা-সন্ত্রাস দমনে দলকেই সম্পৃক্ত করতে পারছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। মাসজুড়ে সৃষ্ট ভয়াল নাশকতার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। শুধু সমন্বয়হীনতার কারণেই সারাদেশে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির নামে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা দেশের জনগণকে একত্রিত করে তৃণমূলে নাশকতা-সহিংসতা দমনে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন দলের নেতারা। কেন্দ্র থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন না করে তৃণমূলের অধিকাংশ নেতা-এমপি-মন্ত্রীর গা-বাঁচিয়ে চলার প্রবণতার কারণেই সন্ত্রাসীরা নাশকতা চালানোর দুঃসাহস দেখাতে পারছে। সাংগঠনিক দুর্বলতা আর অতিমাত্রায় প্রশাসননির্ভরতার কারণেই সরকার থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও সহিংসতা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না বলেই মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

গত ১২ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবরোধ-হরতালের নামে নাশকতা-সহিংসতা দমনে সারাদেশের পাড়া-মহল্লায় এলাকার গণমান্য ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পর ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও খোদ ঢাকা মহানগরীতেই থানা-ওয়ার্ড বা মহল্লায় এ ধরনের কোন কমিটি গঠিত হয়নি। ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জেলা বা উপজেলাতে নির্দেশ থাকলেও তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন দলের নেতারা। সংসদীয় দলের সভায় সকল এমপিকে স্ব-স্ব এলাকায় গিয়ে জনগণকে সংগঠিত করে এ ধরনের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হলেও তা পালন করা হয়নি। সাত দিনের জন্য সংসদ অধিবেশন মুলতবি করা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অধিকাংশ এমপি-মন্ত্রীই অবস্থান করছেন ঢাকায়। এলাকায় যাননি।

এ নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভের কমতি নেই। তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরপরই এমপি-মন্ত্রী ও জেলার নেতারা যদি মাঠে নামতেন, এলাকার গণমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন করে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে নাশকতা-সহিংসতা দমন করা যেত, তবে সন্ত্রাসীরা দেশের কোথাও এভাবে চোরাগোপ্তা হামলা করে মানুষের প্রাণহানী ঘটাতে পারত না। যদিও কোথাও ঘটত, তবে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থানে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হতো। যদি এ ধরনের নাশকতার ঘটনায় সন্ত্রাসীরা গণরোধের শিকার হতো, তবে তারা পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস দেখাতে পারত না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও চৌদ্দ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম জনকণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন সকল এমপির নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সহিংস পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণকে সঙ্গে কাজ করতে। আমার জানা মতে, অধিকাংশ সংসদ সদস্যই এলাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তবে যাঁরা যাননি পক্ষান্তরে তাঁরা দলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংসদ সদস্যরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় কঠোর অবস্থানে থাকলে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা মাথা উঁচু করার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।

গত এক মাসের বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বড় ধরনের নাশকতা ঘটলেও ওই এলাকার এমপি-মন্ত্রীদের কার্যকর কোন ভূমিকা দেখতে পাননি এলাকার জনগণ। বগুড়া, গাইবান্ধা, রাজশাহী, রংপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, নোয়াখালী এলাকায় একের পর এক সন্ত্রাসীরা পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করলেও একটি জায়গাতেও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন ওই এলাকার এমপি-নেতারা।

জানা গেছে, পেট্রোলবোমা হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনার পরও অনেক এমপি যাননি তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। জনগণকে একত্রিত করে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটিও গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতা ও এমপিরা। সংসদ অধিবেশনের অজুহাতে এসব এলাকার মন্ত্রী-এমপিদের ঢাকাতেই অবস্থান করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে এসব এলাকার নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাদের ক্ষোভ-অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। বরং বেশ কয়েকটি এলাকায় ক্ষুব্ধ জনগণই স্বপ্রণোদিতভাবে মাঠে নেমে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, হাতেনাতে পেট্রোলবোমা হামলাকারীদের ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। কারণ এখন যা হচ্ছে তা কোনভাবেই রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে পড়ে না, যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণই সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী কর্মকা-। আর এই সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে না পারলে, জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করতে না পারলে এসব ঘৃণ্য সন্ত্রাসী-ঘাতকদের কোনভাবেই নির্মূল করা সম্ভব হবে না।

তাঁদের মতে, সারাদেশেই মাসজুড়ে বিএনপি-জামায়াতের ভয়াল তা-বের বিরুদ্ধে তীব্র জনঅসন্তোষ গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছে। এমনকি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও রাজপথে মানববন্ধন রচনা করে সৃষ্ট সন্ত্রাসী কর্মকা-ের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর আগে কখনোই এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায়-স্বউদ্যোগে মাঠে নামতে দেখা যায়নি। দেশের এমন বিপুলসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত বিক্ষুব্ধ মানুষকে এককাতারে নিয়ে এসে দেশব্যাপী কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সত্যিই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলটির নেতারা বড় বড় কথা বললেও তার সামান্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতেও দেখা যায়নি। ফলে সরকার সন্ত্রাস-নাশকতা দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও শুধু নিজ দলের সক্রিয়তার অভাবে কাক্সিক্ষত সুফল আনতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৃণমূলে অধিকাংশ নেতার গা-বাঁচিয়ে চলা, এলাকা ছেড়ে সংসদ সদস্যদের ঢাকায় অবস্থান, অধিকাংশ স্থানেই সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গড়তে না পারা সর্বোপরি সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সহিংস আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলেও সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা একের পর এক নাশকতা চালিয়ে গেলেও শুধু সমন্বয়হীনতায় রাজনৈতিক সহিংসতা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার পরিবর্তে দলের নেতাদের অতিমাত্রায় প্রশাসনিক নির্ভরতার কারণেই সন্ত্রাসীরা এখনও নাশকতা চালাতে দুঃসাহস দেখাচ্ছে। আবার অনেক স্থানে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলারও অভিযোগ উঠেছে অনেক এমপিদের বিরুদ্ধে। এমনকি অনেক স্থানেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-এমপির বিরুদ্ধে গ্রেফতার হওয়া বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়া এবং হাতেনাতে পেট্রোলবোমাসহ আটক হওয়া শিবিরের সন্ত্রাসীকে সার্টিফিকেট দিয়ে জামিন পেতে সাহায্য করার অভিযোগও এসেছে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে। কিন্তু এত কিছুর পরও টনক নড়ছে না দলটির নীতিনির্ধারক মহলের। আর দেশের কি অবস্থা বা পরিস্থিতি হলে দলটির নেতা-এমপি-মন্ত্রীদের টনক নড়বে, সেটিও শতভাগ আস্থার সঙ্গে বলতে পারছেন না দলের নীতিনির্ধারক নেতারাও।

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: