মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ঘুরে আসুন রবীন্দ্র স্মৃতিচিহ্নগুলো

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • নাজমুল করিম ফারুক

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাণের কবি। আমাদের স্বজন। এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে আছে কবিগুরুর স্মৃতি। বাঙালীর সংস্কৃতিজুড়ে আছে রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, উভয় দেশের সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক রবীন্দ্রনাথের পদচারণায় মুখরিত হয়েছিল বাংলার প্রান্তর। অন্যান্য দেশের মতো এদেশে বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির স্মৃতি। ঘুরে আসতে পারেন আপনজনদের নিয়ে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কিছু জায়গায়।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ী

কুষ্টিয়া থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত সবুজ-শ্যামল ছায়া-সুশীতল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ী। ৯.৯৩ একর জমির উপর এর অবস্থান। ১৮০৭ সালে রামলোচন ঠাকুরের উইল সূত্রে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এ জমিদারির মালিকানা পান। জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম শিলাইদহে আসেন ১৮৮৯ সালের নবেম্বরে। ১৮৯১-১৯০১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর তিনি জমিদারি পরিচালনা করেন। একসময় পদ্মার গ্রাসে কুঠিবাড়ী ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হলে নতুন কুঠিবাড়ী নির্মাণ করা হয়। দ্বিতল কুঠিবাড়ীর বিভিন্ন কক্ষে সাজানো আছে কবির ব্যবহৃত খাট, পালকি, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, সোফাসহ নানা আসবাবপত্র। আছে মহাত্মা গান্ধীকে স্বহস্তে লেখা একটি চিঠি। কবির আঁকা বেশকিছু দুর্লভ চিত্রকর্ম। আছে পরিবারসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে তোলা দু®প্রাপ্য আলোকচিত্র। আছে সানবাঁধানো কুয়া আর বাথটাব এবং কবির প্রিয় বকুল গাছ।

১৯১৩ সালে কবি যে সাহিত্যকর্মের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, সেই গীতাঞ্জলী’র অধিকাংশ কবিতাই শিলাইদহে রচিত। এ ছাড়াও প্রবন্ধ, উপন্যাস, গান ইত্যাদি রচনা করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিত্রা, চৈতালী, কল্পনা, ক্ষণিকা, সোনারতরী, কথা ও কাহিনী, বলাকা, গীতাঞ্জলী, চিরকুমারসভা, জীবন স্মৃতি, পঞ্চভূতের ডায়েরি, ঘরে বাইরে, চোখের বালি ইত্যাদি। প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ ও ২২ শ্রাবণ উপলক্ষে এখানে মেলা বসে। দেশ-বিদেশ থেকে রবীন্দ্রভক্তরা যোগ দেন এ অনুষ্ঠানে। বর্তমানে শিলাইদহ কুঠিবাড়ীটি সরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাদুঘর। এ জাদুঘর সপ্তাহের রবি ও সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে সোমবার বেলা ৩টার পরও খোলা পেতে পারেন কুঠিবাড়ী।

শাহজাদপুর কাচারিবাড়ী

সিরাজগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ও রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার পূর্বে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা সদরের দিলরুবা মোড় থেকে আধাকিলোমিটার শাহজাদপুর বাজারসংলগ্ন কাচারিবাড়ী অবস্থিত। শাহজাদপুরের জমিদারি এক সময় নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির একটি অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নিলামে তৎকালীন ১৩ টাকা ১০ আনায় কিনে নেন। উনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০-১৮৯৭ সাল পর্যন্ত মাত্র ৮ বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুরে জমিদারি দেখাশোনার কাজে মাঝেমধ্যে আসতেন এবং সাময়িকভাবে বসবাস করতেন। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ৩১ দরজা বিশিষ্ট একটি দোতলা ভবন প্রায় ১০ বিঘা জমির উপর অবস্থিত। ভবনটির উত্তর-দক্ষিণে একই আকৃতির বারান্দা। বারান্দায় গোলাকৃতি থামের উপরাংশের অলঙ্করণ, বড়মাপের দরজা, জানালা ও ছাদের উপর প্যারাপেট দেয়ালে পোড়ামাটির কাজ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

ভবনটিতে রক্ষিত আছে কবির ব্যবহৃত খাট, পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, আয়না, আলনা, পিয়ানো, পালকি, খড়ম, চীনামাটির জগ, শ্বেত পাথরের গোল টেবিল, কাঠের পূজাম প, তৈজসপত্র, কবির ২২টি প্রতিকৃতি এবং নিজ হাতে আকা ২০টি ছবি। বর্তমানে এটি বরীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ভবনটির পশ্চিমে বকুলগাছের গোড়ায় বৃত্তাকার শান বাঁধানো একটি মঞ্চ আছে। এটি রবীন্দ্রমঞ্চ নামে পরিচিত। ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের অনুরূপ রবীন্দ্র স্মৃতি অডিটরিয়ামও রয়েছে। এখানে বসে কবি লিখেছেন অসংখ্য গান ও কবিতা। যার মধ্যে সোনারতরী, বৈষ্ণব কবিতা, দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয়, যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, ভরা ভাদর, প্রত্যাখ্যান, লজ্জা প্রভৃতি। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে এখানে কৃষকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ব্যাংক। রোপণ করেছিলেন অসংখ্য বৃক্ষ। ১৯৬৯ সালে কাচারিবাড়ীসহ সব সম্পদ প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর পুরার্কীতি হিসেবে অধিগ্রহণ করে। প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ কবির জন্ম দিবসে এখানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিনদিনের নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়।

পতিসর কুঠিবাড়ী

নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নাগর নদীর তীরে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথের পতিসর কুঠিবাড়ী। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩০ সালে এ জমিদারি ক্রয় করেন। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং জমিদারি দেখাশোনার জন্য ১৮৯১ সালে সর্বপ্রথম পতিসরে আসেন। ১৯০৫ সালে তিনি পতিসর কৃষি ব্যাংক ও ১৯১৩ সালে কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২১ সালে জমিদারি ভাগ হলে পতিসর রবীন্দ্রনাথের ভাগে পড়লেও নানা কারণেই তিনি এখানে কম আসেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই তিনি পতিসর কুঠিবাড়ী থেকে বিদায় নেন। ১৯৮৬ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় রবীন্দ্র সাহিত্য পরিষদ। এখানেই ১৯৩১ সালে বিখ্যাত সাহিত্যিক তৎকালীন নওগাঁ মহকুমার প্রশাসক অন্নদা শংকর রায়ের সঙ্গে সাক্ষাত হয় রবীন্দ্রনাথের।

পতিসর রবীন্দ্র কাচারিবাড়ীর অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এর সিংহ দরজা। বিশালাকৃতির দরজার উপরে রয়েছে একজোড়া সিংহের মূর্তি। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই মাঝের ফাঁকা জায়গায় রবীন্দ্রনাথের দ ায়মান কংক্রিটের ভাস্কর্য। বাড়ীর চারপাশের ঘরগুলোয় রয়েছে কবির ব্যবহৃত সামগ্রী ও ছবি। কাচারিবাড়ীর সামনে রয়েছে রবীন্দ্র সরোবর, ফাঁকা মাঠ এবং মাঠ সংলগ্ন নাগর নদী। উত্তর দিকে রয়েছে বিরাট দীঘি, দক্ষিণে কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন। রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিবস ২৫ বৈশাখকে ঘিরে এখানে জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র উৎসব ও মেলা বসে।

দক্ষিণডিহি শ্বশুরবাড়ী

খুলনা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ফুলতলা উপজেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে দক্ষিণডিহি গ্রাম। গ্রামের ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র-মৃণালিনীর স্মৃতিবিজড়িত একটি দোতলা ভবন। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ী। এ গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের মা সারদা সুন্দরী, কাকী ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী ও স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ওরফে ভবতারিণী। জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবনের সামনে স্থাপন করা হয় বিশ্বকবি ও মৃণালিনী দেবীর আবক্ষ মূর্তি এবং মৃণালিনী মঞ্চ। মঞ্চের অদূরে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র। কবিগুরুর জন্মদিবস পালন উপলক্ষে দক্ষিণডিহিতে প্রতিবছর ৩ দিনব্যাপী আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ লোকমেলার আয়োজন করা হয়।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: