মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চিরসবুজ সৌমিত্র

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫
চিরসবুজ সৌমিত্র

ইমরান হোসেন ॥ ছেলেবেলা থেকেই বই পড়া আর অভিনয়ের প্রতি টান ছিল তাঁর। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতৃপুরুষের বাড়ি কিন্তু এই বাংলাদেশেই। ছোটবেলায় সত্যজিৎ রায়ের অপু চরিত্রটি তাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু হয়ত কখনই ভাবেননি একদিন এই অপুরই বড়বেলার চরিত্র করবেন তিনি নিজে। বয়স আশিতে পড়েছে। তবে মনের বয়সটা যেন পঁিচশ বছরের তরুণের। এবারের জন্মদিনে তাঁর বাড়তি আকর্ষণ ছিল বলিউডের ‘ডার্টি গার্ল’ খ্যাত অভিনেত্রী বিদ্যা বালানের টেলিফোনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো এবং তাঁর সাক্ষাতকার গ্রহণ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার কৃঞ্চনগরে। অবশ্য তাঁর শৈশবেই পুরো পরিবার কলকাতার হাওড়ায় এসে বসবাস করতে শুরু করে। তিনি তখন সদ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ পাশ করে এমএ তে শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে কিছুকাল আকাশবাণী কলকাতার ঘোষকের কাজ করছেন। কিছু নাটকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করছেন। এর মধ্যেই একদিন অকস্মাৎ স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে অপুর সংসারের কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনয়ের প্রস্তাব। সেটা ছিল ১৯৫৯ সাল। সেই ছিল সূচনা। সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই সৌভাগ্য বাংলার আর কোন অভিনেতা ও অভিনেত্রীর ভাগ্যে জোটেনি। তবে সৌমিত্র সবচেয়ে বিখ্যাত সত্যজিতের ফেলুদা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রে তিনি এতটাই দুর্দান্ত অভিনয় করেন যে সিনেমা রিলিজের পর স্বয়ং পরিচালক সত্যজিত রায় পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ‘তাঁর চেয়ে ভাল ( সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর কেউ অভিনয় করতে পারতেন না।’ সেই সত্যজিৎ থেকে শুরু করে তপন সিংহ, মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাসগুপ্তসহ অসংখ্য বিখ্যাত পরিচালকের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

‘অপুর সংসার’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘অশনি সংকেত’ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘হীরক রাজার দেশে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলাদেশের দর্শক অনেকদিন মনে রাখবে। বাংলা ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রে তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি সিরিয়ালে অভিনয় করেছেন। যাত্রায় এক সময় বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনেতা সত্ত্বার কাছে কবি সত্ত্বা কিছুটা আড়ালে পড়লে ও যারা কবিতার খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে কবি সৌমিত্র নামটা অবশ্য নতুন নয়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা’ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে’ ‘শব্দরা আমার বাগানে’ ‘যা বাকি রইল’ ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’ ‘ধারাবাহিক তোমার জলে’ উল্লেখযোগ্য । কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যেয়ের সংকলিত ‘ সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ তার কবি মানসকে পাঠকের কাছে আদৃত করে তোলে। তবে শুধু অভিনয় নয়, এমনকি আবৃত্তি নয় বরং আঁকাআঁকি নাকি অনেক পছন্দের একটি কাজ এই জনপ্রিয় অভিনেতার কাছে। গত পাঁচ দশক ধরে তিনি এঁকে চলেছেন ছবি। তাঁর আঁকা স্কেচ এবং পেইন্টিং নিয়ে রীতিমতো প্রদর্শনী হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্সে’। এ যেন একই অঙ্গে বহুরূপ। দর্শকের ভালবাসার সঙ্গে সঙ্গে মিলেছে খ্যাতি আর সম্মাননা। ভারতের বাইরে ফ্রান্স থেকে পেয়েছেন সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘অফিসার দেস আর্ট মেটিয়ার্স’। সত্তরের দশকে ‘পদ্মশ্রী’ পেলেও গ্রহণ করেননি। এরপর ‘পদ্মভূষণ’ পদকপ্রাপ্ত হন। ভারতের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান ২০১২ সালে। স্ত্রী দীপা চট্টোপাধ্যায়, পুত্র সৌগত আর মেয়ে পৌলমীকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বর্তমান দিনকাল। অভিনয়টা এখন কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন। ভাল চিত্রনাট্য পেলে অভিনয়ের সুতীব্র বাসনা জেগে ওঠে। তবে কালে কালে বেলা যে কম হয়নি। বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালবাসার কথা তো সুবিদিত। বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ ঘুরে গিয়েছেন তিনি। গুণী এই অভিনেতার প্রতি শুভেচ্ছা রইল।

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫

২২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: