মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্লেট পেনসিল দোয়াতের কালি ঝর্ণা কলম আজ শুধুই স্মৃতি

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫
স্লেট পেনসিল দোয়াতের কালি ঝর্ণা কলম আজ শুধুই স্মৃতি
  • লেখাপড়ায় হাতেখড়ির বিবর্তন

সমুদ্র হক

বিংশ শতক। শিশুপাঠের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অর্থাৎ হাতেখড়ি পাথরের সেøট ও পেনসিল (এক সঙ্গে বলা হতো সেøটপেনসিল)। গুরুমশাই শিশুর হাতে হাত রেখে সেøটের ওপর অ আ ক খ লিখে জীবনের লেখাপড়া শুরু করে দিতেন। এবার একবিংশ শতক। সেøটের স্থানে ট্যাব (এক ধরনের কম্পিউটার)। পেনসিলের স্থানে টাচ স্ক্রিনে সামান্য ছোঁয়াতেই এ বি সি ডি অ আ ক খ। ম্যম দেখিয়ে দিচ্ছেন। হাতেখড়ির বিবর্তন। বিংশ শতকের মধ্যভাগের শেষ পর্যন্ত কলমের নাম ফাউন্টেন পেন। বাংলায় ঝর্ণা কলম। এ কলমের বৈশিষ্ট্য পিতলের নিব প্লাস্টিকের ছোট্ট ছাঁচে আটকানো। কলমের সম্মুখ ভাগের প্যাঁচ দেয়া অংশের সঙ্গে সংযুক্ত। কলমের পরের অংশে কালি রাখার রিজার্ভার। ওই অংশে কালি ভরে প্যাঁচ দিয়ে নিব লাগিয়ে তারপর কাগজে লিখা। এই নিবের প্রথম অংশে একটু কাটা ও মধ্যে ছিদ্র। লিখার সময় কালি নিচের দিকে এসে নিবের ছিদ্র নিয়ন্ত্রণ করে কাটা অংশে কালির সঞ্চালন শুরু হয়। লেখক স্বচ্ছন্দে লিখেন কাগজে। কালি শেষ হয়ে গেলে পুনর্ভরণ। মাঝে মধ্যে নিবে কালি না এলে ঝেড়ে নিতে হয়। তবে সাবধানে। ঝাড়বার সময় কারও কাপড়ে কালির দাগ নকশা হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে পারে। অনেক সময় নিবে কালির গাঁদ আটকে গেলে নিব ও প্রোটেক্টর খুলে গরম পানিতে পরিষ্কার করতে হয়। নিব ভোঁতা বা ভেঙ্গে গেলে পাল্টাতে হয়। বাজারে নানা ধরনের নিব পাওয়া যেত। ব্র্যান্ড নামে অনেক কালি পাওয়া যেত। যেমন পেঙ্গুইন, হিরো, পারকার, পেলিক্যান, জ্যাসকোট ইত্যাদি। এসব কালির দোয়াতের ডিজাইন ছিল সুন্দর। দুই ধরনের কালি মিলতো ব্লু ব্লাক ও রয়েল ব্লু। তবে পরীক্ষার সময় বিশেষ করে মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ্যাডমিট কার্ডে বাধ্যতামূলকভাবে ব্লু ব্লাক কালি ব্যবহারের কথা উল্লেখ থাকতো। আবার পানিতে গুলিয়ে কালি বানানোর জন্য এক ধরনের বড়ি পাওয়া যেত। ট্যাবলেট ওষুধের চেয়ে সামান্য বড় গোলাকৃতির এই বড়ি গুঁড়ো করে গরম পানির মধ্যে দিয়ে অনেকক্ষণ ঝাঁকানোর পর তরল কালি তৈরি হয়ে যেত। তবে এই কালির গাঁদ বেশি পড়ায় নিবের ক্ষতি হতো। ফাউন্টেন পেনের মধ্যে সবচেয়ে দামি ছিল পারকার শেফার্স ও পাইলট। অন্য ব্র্যান্ডের কলম ছিল। ষাটের দশকের শেষের দিকে কিনসিন উইংসন হিরো ও পাইলটসহ অনান্য কলমে কালি ভরানোর রিজার্ভার উঠে গিয়ে অটো ড্রপার সিস্টেম চালু হলো। কলমের শেষের অংশটুকু খুললেই বের হয়ে আসতো রাবারের রিজার্ভারের দুই ধারে স্টিলের পাতলা পাত আটকানো। কালির দোয়াতে চুবিয়ে ড্রপারের মতো চাপ দিয়ে কালি ভরানো হতো। লিখার সময় কালি বেশি পড়লে ব্লটিং পেপার (কালি চুষে নেয়ার এক ধরনের পেপার) ব্যবহার করা হতো। দিনে দিনে এই কালি ও কলম একেবারেই উঠে গেল। জায়গা দখল করল বল পয়েন্ট পেন বা বল পেন। একবিংশ শতকে কত ধরনের বাহারি বল পেন। একটা সময় ব্যাংকের চেকে বল পেনের সিগেনেচার গ্রহণ করা হতো না। আজ সেই সব দিন নিকট অতীত। যারা মধ্যবয়সী ও প্রবীণ তাঁদের কাছে শুধুই স্মৃতি। কালি ও কলমের কথা মনে পড়লে নস্টালজিক হয়ে পড়েন। সেদিনের সেই পাথরের সেøট পেনসিলও আজ আর নেই। বড় জোর কাঠের সেøট ও চক পাওয়া যেতে পারে। হালে এক ধরনের ডিজিটাল সেøট পাওয়া যাচ্ছে। কার্বন স্ক্রিনের এই ডিজিটাল সেøটকে বলা হয় ম্যাজিক সেøট। এই সেøটে শিশুরা লিখার চেয়ে নকশা করে কার্টুন এঁকে মজা পায়। পাথরের সেøটের ওপর পাথরের চিকন পেনসিলে বর্ণমালা লিখার সময় শিশুদের ব্যালেন্স তৈরি হতো। তাতে বেশির ভাগ শিশুর হাতের লিখা ভালো হতো। পরে সাদা চকে কাঠের সেøটের ওপর লেখা শুরু হয়। এতে হাতের লেখা সুন্দর করার ব্যালেন্স ঝরে পড়ে। একটা সময় শিশুদের হাতের লেখা ভালো করার জন্য বাঁশের চিকন কঞ্চি কেটে নিবের মতো করে ছেটে কালিতে চুবিয়ে লেখা প্র্যাকটিস করানো হতো। অনেক পরিবারের বড় পাখির পালক কেটে সামনের অংশ ছেটে চিকন নিব বানিয়ে কলম তৈরি করে শিশুদের দেয়া হতো। তারপর কালিতে চুবিয়ে কাগজে লিখে হাতের লেখা সুন্দর করতো। এইসব দিনও এখন নিকট অতীত। এখন হাতের লিখা কেমন তা বিবেচ্য হয় না। সবই চলে গিয়েছে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল স্কুলে কম্পিউটার বাধ্যতামূলক হওয়ার সঙ্গে বল পেনেরও দরকার হবে না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান পেন পেপারলেস অফিসে পরিণত হয়েছে। ১৮৮৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ই ওয়াটারম্যান যে ঝর্ণা কলম উৎপাদন শুরু করে একবিংশ শতকে তা বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছে। এখন কালে-ভদ্রে কোথাও ঝর্ণা কলম মেলে তাও এ্যানটিকস হিসেবে। কালির দোয়াত আর বাস্তবে নেই। তবে দেশে নির্বাচনী প্রতীকে এখনও দোয়াত কলম রাখা হয়েছে। বল পয়েন্ট কলমের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৪০ সালে। নিত্য আধুনিকায়ন হয়ে এখনও টিকে আছে। পাথরের সেøট পেনসিল আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা সময় পরীক্ষায় ভালো ফলাফলে কোন ভাল কাজ করলে ফেয়ারওয়েলে অভ্যর্থনায় বিয়ে অনুষ্ঠানে দামি ঝর্ণা কলম উপহার দেয়া হতো। পুরস্কারের তালিকাতেও থাকতো ঝর্ণা কলম। এখন সবই শুধুই স্মৃতি।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫

১৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: