কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

‘অল দ্য লাইট উই ক্যান নট সি’

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কোনটি, এমন প্রশ্নের জবাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাম প্রথমদিকেই থাকবে। বিকটতা,বীভৎসতা আর লাশের মিছিলের সেই যুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পরিবর্তন করে দিয়েছিল পুরো বিশ্বপট। অভিশপ্ত যুদ্ধকালীন সে সময়টা নিয়ে তৎকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি লেখালেখি চলছেই। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদরা সেই সময়কার রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, মনোদৈহিক পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে চলছেন তাঁদের লেখনীতে। খ্যাতনামা সাহিত্যিক এ্যান্থনি ডোয়েরও তাঁর বিখ্যাত বই ‘অল দ্য লাইট উই ক্যান নট সি’ তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়টাকে নিয়ে এসেছেন। তিনি তাঁর বইতে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে আনেননি, তবে সেই সময়কার মানুষের মনোজাগতিক চিন্তা-ভাবনা, শিশুর সামাজিকীকরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে তুলে এনেছেন। গল্পোচ্ছলে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন সে সময়কার শিশুদের মনস্তত্ত্ব। ফ্রান্সের এক অন্ধ কিশোরী মেয়ে এবং জার্মানির এক অনাথ ছেলে কিভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নিমজ্জিত হয়, সে আখ্যানকে কেন্দ্র করেই এ্যান্থনির এই বই। এতে নৈতিকতা এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের মাঝের নিত্য দ্বন্দ্বকে এ্যান্থনি দেখিয়েছেন।

মেরি লরি প্যারিসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কাছাকাছি জায়গায় তার বাবার সঙ্গে বাস করে। বাবা মিউজিয়ামের তালাচাবি রক্ষক। ছোট্ট বয়সেই তাই মেরি মিউজিয়ামের সান্নিধ্যে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। মাত্র ছয় বছর বয়সে মেরি অন্ধ হয়ে যায়। মেরি যেন রাস্তায় চলতে কোন অসুবিধা না হয়, সে জন্য মেরির বাবা আশপাশের প্রতিবেশীদের বাড়ি, রাস্তার মিনিয়েচার তৈরি করে মেরিকে শিক্ষা দেয়। মেনিয়েচার ধরে ধরে মেরি প্রতিদিন সহজেই বাড়ি ফিরে আসে। এভাবেই বাপ-মেয়ের জীবন চলে যেতে থাকে। মেরির বয়স যখন বারো তখন সারা বিশ্বব্যাপী বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। জামার্নির নাৎসি বাহিনী প্যারিস দখল করে ফেললে বাবা-মেয়ে পালিয়ে যায় সেইন্ট মালোতে পালিয়ে যায়। সেখানের সমুদ্রের ধারে তার বড় চাচা বাস করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় তার বাবা মিউজিয়ামের সবচেয়ে মূল্যবান একই সঙ্গে বিপজ্জনক অলঙ্কার নিয়ে চলে আসে। প্যারিস থেকে সেইন্ট মালোতে পালিয়ে আসার বিষয়টি অন্ধ মেরিকে ভাবিয়ে তোলে। তার চাচা গোপনে অবৈধ রেডিও পরিচালনা করে। আর সে কাজে স্বতস্ফূর্তভাবে সাহায্য করতে থাকে মেরি। যুদ্ধের রূঢ়রূপ সে চোখে না দেখতে পেলেও উপলব্ধি করতে পারে, যা তার মনোচেতনায় প্রভাব বিস্তার করে। মেরি বুঝতে পারে নৈতিকতা এবং টিকে থাকার গভীর সর্ম্পকের মর্মার্থ। নৈতিকতা ধরে রাখতে চাইলেও বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে এমন এক জীবনযুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিল যেখানে নৈতিকতা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে। বেঁচে থাকাটাই হয়ে পড়ে জীবনের চরম সার্থকতা। এ বিষয়টি এ্যান্থনি মেরির অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপস্থাপন করেন তাঁর বইতে।

এ বিষয়টিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য এ্যান্থনি তাঁর বইতে আরও দুটি শক্তিশালী চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। জামার্নির খনি শহরের এতিম ওয়েরনার ও তার ছোট্টবোন জুট্টার কাহিনী এ্যান্থনি তুলে ধরেন বইতে। ওয়েরনার ও তার ছোট বোনটির কাছে অচল রেডিও ছিল। সেটা থেকে কোন শব্দ বের না হলেও তারা মিথ্যামিথ্যি এমন ভান করত যেন গান শুনছে দিনে-রাতে সর্বক্ষণ। জুট্টা একটি তামার তার খুঁজে পেয়েছিল। যেটা দিয়ে ওয়েরনার অচল ভাঙ্গা রেডিও ঠিক করে ফেলে। এতে তারা বিদেশী চ্যানেলের ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যেমে বিদেশী সংবাদ শুনতে পায়। ভয়ে ওয়েরনার সেটা চুরমার করে ফেলেছিল। কেননা ন্যাশনাল স্যোশালিজমের অধীনে বিদেশী চ্যানেল শোনা অপরাধ। তবে ওই বিষয়টি ওয়েরনারের মাঝে বিভিন্ন ভাঙ্গা বা নষ্ট জিনিসপত্র ঠিক করার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। একটা সময় বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ ঠিক করায় একজন কিশোর এক্সপার্ট বনে যায় সে। নাৎসি বাহিনীর দৃষ্টি পড়ে যায় এই প্রতিভাবান ছেলেটির প্রতি। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হিটলারের ইয়ুথ একাডেমিতে। বিরোধী শক্তিকে ট্রেকিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ট্রেকিং করতে করতেই কিশোর ওয়েরনার এসে পড়ে সেইন্ট মালোতে। সে অক্ষশক্তির এক ট্রেকিং যোদ্ধা হলেও বুঝতে পারে যুদ্ধের ভয়াবহতা। বুঝতে পারে, টিকে থাকার লড়াইয়ে নৈতিকতা অনেক সময়ই গৌণ হয়ে পড়ে।

মেরি মিত্রশক্তির পক্ষে আর ওয়েরনার অক্ষশক্তির পক্ষে। দু’জনের দু’দিকে অবস্থান তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এ্যান্থনি ডোয়ের দু’পক্ষের সাধারণ মানুষকে কিভাবে যুদ্ধের ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, কিভাবে নিজের নৈতিকতা, বিবেকের সঙ্গে টিকে থাকার মানসিকতার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে সেই বিষয়টিকে তুলে ধরেন। সমালোচকরা বইটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ইতোমধ্যে বইটির জন্য এ্যান্থনি বিভিন্ন পুরস্কারও লাভ করেছেন। প্রচুর কাটতি বইটির। ভিন্ন সাধের বইটি মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তাই তো এ্যান্থনি ডোয়েরের এ বইটি এখন নিউইর্য়ক টাইমসের বেস্ট সেলারের শীর্ষে অবস্থান করছে।

মো. আরিফুর রহমান

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: