মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

তলস্তয়ের ‘পুনরুত্থান’

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • মিলু শামস

কার মধ্যে আছেন তিনি প্রকট রূপে? পিয়ের, আঁদ্রে, নিকোলাই, লেভিন, নেখলিউদভ- কার মধ্যে? পাল্টা প্রশ্ন করা যায় কার মধ্যে নেই তিনি? হ্যাঁ আছেন সবার মধ্যে। তাঁর লেখায় আত্মজৈবনিকতা সর্বজনবিদিত। তবে ‘পুনরুত্থান’ এর নেখলিউদভেই তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। নেখলিউদভের ছদ্মবেশে তিনিই আছেন এ উপন্যাসের কেন্দ্রে।

পুনরুত্থানে রাষ্ট্র ও রাজনীতি একেবারে প্রত্যক্ষ। রাষ্ট্রের আইন আদালত বিচার- সবলের পক্ষে, দুর্বলকে রক্ষা করে না সে, ধর্ম রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দুর্বলের ওপর চেপে বসে, বিচারালয়ের প্রহসনের যে চিত্র তিনি এ উপন্যাসে এঁকেছেন তা তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তুলনা পাওয়া যায় শুধু চার্লস ডিকেন্স ও জনাথন সুইফট এ। পুনরুত্থান প্রকাশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে রাজনীতি। এ উপন্যাস তলস্তয় লিখতে শুরু করেছিলেন অঠারোশ’ ঊননব্বইতে। তারপর দশ বছর পড়ে ছিল ঘরে। হয়ত ভুলেই গিয়েছিলেন। খুঁজে বের করতে হলো অন্য কারণে, উনিশ শতকের শেষ দিকে দুখোবর নামে এক ধর্মীয় সমাজতন্ত্রী সম্প্রদায় জারের রাশিয়ায় নিগৃহীত হচ্ছিল। যুদ্ধবিরোধী এ সম্প্রদায়ের বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল দেশের বাইরে চলে যাওয়া। কানাডা সরকার এদের নিতে চাইলেও জাহাজের খরচ চালিয়ে কানাডা যাওয়া এদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তলস্তয় উপন্যাসটি শেষ করেছিলেন এদের জাহাজ খরচ যোগানোর জন্য। প্রায় বারো হাজার দুখোবর এ টাকায় বিদেশে পারি জমান। একই সঙ্গে এ উপন্যাস বেরিয়েছিল রাশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স ও জার্মানিতে। সমালোচিতও হয়েছে একযোগে। উনিশ শ’ ছত্রিশ সালের আগে এ বই অবিকৃতভাবে রাশিয়ায় প্রকাশিত হতে পারেনি।

ভূমি সংস্কার নিয়ে তলস্তয়ের গভীর ভাবনা ছিল। উনিশ শ’ সাত সালে ভূমি সমস্যার সমাধান চেয়ে রুশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁর মতো অভিজাত শ্রেণীর বাসিন্দা নেখলিউদভও স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছিল ভূমির মায়া। নিজের বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদের এক অংশ নামমাত্র খাজনায় দিয়ে দেয় কৃষকদের। বাকি সম্পত্তি বেচে দেয়। বিপ্লবের দিকে এগুচ্ছে তখন রাশিয়া।

সমাজের মধ্যেই এমন শর্ত তৈরি হয়েছিল যা তলস্তয়ের মতো ক্ষমতাশীল শিল্পীর পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ‘আন্না কারেনিনা’য় এতটা এগুতে পারেননি তিনি। জমিদার লেভিন কৃষকের সঙ্গে সমঝোতার কথা ভেবেছে কিন্তু জমিদারী ব্যবস্থা তুলে দিয়ে নয়। তার ভাবনা, ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকবে। কৃষকরা অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সে নিজেও তাদের সঙ্গে কাজ করবে। সময়ই এর বেশি এগুতে দেয়নি তলস্তয়কে। ‘যুদ্ধ ও শান্তি’তে এগুতে পেরেছেন আরও কম। অভিজাত পিয়ের ভূমিদাসদের মুক্ত করার সাহস দেখিয়েছে। ডিসেম্বর বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। ওই সময়ের জন্য যথেষ্ট সাহসী কাজ।

তলস্তয়ের উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে নেখলিউদভ উজ্জ্বল গতিশীলতা নিয়ে বিকশিত। পরিবর্তনগুলো খুব স্বাভাবিক তার ভেতর। উনিশ বছর বয়সে কাতিউশার সঙ্গে দেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন সে। ছুটিতে ফুফুদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। ভূমি সংস্কারের ওপর নিবন্ধ লিখবে সে। একদিন বিকেলে বাড়ির ছেলে মেয়েরা খেলতে গিয়ে দেখে কখন যেন ওরা দু’জন আলাদা হয়ে গেছে। উনিশ বছরের নেখলিউদভ আর ষোলো বছরের কাতিউশা পেয়ে যায় নিজেদের হৃদয়ের বার্তা। নেখলিউদভের সমস্ত অন্তকরণ তখন কাতিউশাময়। কাতিউশাকে পেতে এক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে সে। লেখক বলছেন- ‘নেখলিউদভ হাত ছাড়িয়ে নিল। কেমন যেন একটু লজ্জিত হলো, বিভ্রান্ত বোধ করল, এমনকি নিজের প্রতি কিঞ্চিত ঘৃণাও বোধ করল। এ লজ্জা ও বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে ওর ভাল আমিটা যে নিজের মুক্তি খুঁজছিল- এই বিশ্বাস যদিও নিজের মনে দৃঢ় করতে পারত তাহলে ও হয়ত বেঁচে যেত, তা না করে ও ভাবল ওর ইতস্তত ভাবটা নিতান্তই বোকামি, ওর উচিত আর পাঁচজনের মতো ব্যবহার করা।’ বেপরোয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত তাই করল সে। ‘ওর ভেতরকার পশুটা আজ যে কেবল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এমন নয় আজ সেই পশুর অস্থির পদাঘাতে ওর সত্যিকার আমি চূর্ণ বিচূর্ণ। প্রথম সফরে ওর যে আমিটা এ বাড়িতে এসেছিল আজকের ভোর রাতেও যাকে একবার দেখা গিয়েছিল সে যেন এখন ওর প্রতি পদক্ষেপে দূরে সরে যাচ্ছে। আজ ওর মধ্যে জেগে উঠেছে দুর্বার পশু শক্তি... নেখলিউদভ নিজেকে জিজ্ঞেস করল ‘কিছুক্ষণ আগে সদ্য যা ঘটে গেল তার অর্থটা ঠিক কী? এ ঘটনা আমার অদৃষ্টে কী বহন করে আনছেÑ পরম আনন্দ না চরম দুর্ভোগ?’ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিজের মনেই জবাব দিল, ‘এ রকম তো হামেশাই ঘটে থাকে। সকলেই এই রকম করে।’ মনকে এভাবে বুঝ দিয়ে ও নিজের ঘরে ঘুমোতে চলে গেল।’

ঠিক দুর্ভাগ্য নয় এ ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আত্মউপলব্ধি আর অনুশোচনা অন্য মানুষ বানিয়ে দিয়েছিল তাকে। দশ বছর পর আবার যখন কাতিউশার সঙ্গে দেখা, কাতিউশা তখন আসামির কাঠগড়ায় আর সে জুড়ির আসনে। তার জন্যই যে কাতিউশার এ পরিণতি তা বুঝতে পেরে বিবেক দংশনে দগ্ধ হয় নেখলিউদভ। পুনর্জন্ম হয় তার। যীশুর যেমন পুনরুত্থান হয়েছিল। প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় সে। বাঁচাতে চায় কাতিউশাকে চূড়ান্ত সাজা থেকে। কিন্তু পারে না। সাইবেরিয়ায় নির্বাসন হয় তার। নিজের সম্পত্তি, সুনাম, সাফল্য সব ফেলে সেও সঙ্গী হয় কাতিউশার। সাইবেরিয়ায় রওয়ানা হওয়ার আগে কাতিউশাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল সে। কাতিউশা প্রত্যাখ্যান করে। নেখলিউদভের ভাবনাতেও ছিল না যে সে প্রত্যাখ্যাত হবে। সারা রাত অস্থির পাঁয়াচারি করে শেষে বাইবেল খুলে বসে। লেখক বলেন, ‘সেই রাত থেকে নেখলিউদভের পক্ষে শুরু হলো সম্পূর্ণ এক নতুন জীবন। সে যে জীবনের কোন নতুন পরিবেশে প্রবেশ করেছিল তা নয় কিন্তু সেদিন থেকে ওর জীবনে যা যা ঘটেছিল সবই সে দেখল নতুন আলোকে নতুন অর্থে, নতুন তাৎপর্যে।’

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অন্তর্দ্বন্দ্বে পীড়িত, যৌক্তিক একজন মানুষকে তলস্তয় শেষ পর্যন্ত বাইবেলের বাণীতে মুক্তি দিয়েছেন। তলস্তয়ের বেলায় এমনই হয় প্রায়শ। তারপরও বিপ্লব ও প্রতিরোধবিরোধী ধর্মপ্রচারক তলস্তয়কে ছাপিয়ে ওঠেন শিল্পী তলস্তয়, লেনিন তাঁকে বলেছেন, ‘রুশ বিপ্লবের দর্পণ’।

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: