মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাফল্যের অন্য নাম রোকেয়া

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • নাজনীন বেগম

৮ম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে বড় বোনের সূচীশৈলী দেখেই নিজের পোশাক নিজে তৈরি করার আগ্রহ থেকে আস্তে আস্তে তিনি আজকের একজন ফ্যাশন ডিজাইনার ও ক্রাফট প্রমোটার হতে পেরেছেন। তিনি রোকেয়া খানম। তাঁর ডিজাইন করা পোশাক এখন পাওয়া যায় ঢাকার অভিজাত অনেক শোরুমে। নিজে তৈরি করেছেন ‘বুলন ক্রাফট’ নামে একটি ফ্যাশন হাউস। এক সময়ে নিজের পোশাক যখন নিজে তৈরি করতেন তখন তিনি ছিলেন একক ডিজাইনার ও কর্মী। এখন তিনি ডিজাইনার একজন তবে সেখানে প্রায় ১৫০ জন কর্মী নিরলস কাজ করে তৈরি করছেন ‘বুলন ক্রাফট’ নামে একটি সফল ফ্যাশন হাউস। তৈরি করেছেন নিজস্ব কাস্টমার গ্রুপ। কীভাবে একক প্রচেষ্টা থেকে নিজস্ব কাস্টমার গ্রুপ তৈরি হলো, সফল হতে হলে কীভাবে প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করতে হয়, কীভাবে সাফল্য অর্জিত হয়Ñ এসব কথা জেনে নেওয়া যাক।

রোকেয়া খানমের জন্ম এমন এক শহরের যে শহরের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নকশিকাঁথার স্টিচের কাজের। এই ঐতিহ্যবাহী সূচীশৈলীটি শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমানভাবে সমাদৃত। ছোটবেলা থেকেই রোকেয়ার এই সূচীশৈলীর প্রতি আকর্ষণ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ছিল পোশাক সেলাই করার প্রবণতা। বিশেষভাবে বড় বোন পোশাক সেলাই করে সেই পোশাকের ওপর যখন সুতার নকশার কাজ করতেন তাতে চমৎকৃত হতেন তিনি। তা ছাড়া বাড়ির পাশেই ছিল মহিলাদের নকশিকাঁথার কারখানা। সেসব দেখেই রোকেয়ার এই সূচীশৈলীতে আকর্ষণ জন্মায়। ৯ম শ্রেণীতে পড়ার সময় নিজের ঈদের পোশাক নিজে তৈরি করার মাধ্যমে চমকে দেন সবাইকে। সেই সময়ে বাড়ির বড়দের উৎসাহে যোগ দেন জাগরণী চক্রে। শুরু করেন বিভিন্ন স্টিচের পণ্য তৈরির কাজ।

একসময় ঢাকার অরণ্য ক্রাফটে ডাক পড়ে রোকেয়ার। তিনি ঢাকায় এসে বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজের অর্ডার নিয়ে তা যশোরের নারীকর্মীদের দিয়ে বিভিন্ন নকশার কাজ করে তা আবার অরণ্য ক্রাফটে সরবরাহ শুরু করেন। ঢাকায় কয়েকবার পণ্য সরবরাহ করার পর তাঁর কাজের দক্ষতা নজর কাড়ে সবমহলে। আরও অর্ডার পান আড়ং, বিবি রাসেল ও টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের বিখ্যাত প্রমোটার মুনিরা ইমদাদের কাছ থেকে। এভাবেই নিজের সাধনা, একাগ্রতা, অধ্যাবসয় ও মেধা দিয়ে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন। এসব কাজের মাঝেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ালেখা করেছেন, চালিয়ে গেছেন সংগীতচর্চা। সঙ্গে ছিল তাঁর ছোট ভাই। একসময় কাজের ব্যস্ততা ও আরও কিছু করার বাসনা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকার সময়ে তিনি নিজেই বাড়িতে গড়ে তোলেন পোশাক তৈরির কারখানা। আবার কিছু অর্ডার নিয়ে তা পাঠিয়ে দিতেন যশোরে। যেখানে ছিল রোকেয়ার কাজ করার জন্য প্রায় একশ’ নারীকর্মী। ঢাকায় কারখানায় কাজ করতেন জনাদশেক কর্মী।

১৯৯৯ সালে প্রমোটার মুনিরা ইমদাদের সহকারী হিসেবে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরে যোগ দেন রোকেয়া খানম। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লী ওয়ার্ল্ড ক্রাফট কাউন্সিলে ক্রাফট প্রদর্শনীতে অংশ নেন। এর মাধ্যমে আবারও দক্ষ হয়ে ওঠেন রোকেয়া খানম। ২০০১ সাল থেকে শুরু করেন নিজস্ব প্রডাকশন হাউসে কাজ। সেই কারখানায় তিনি তৈরি করা শুরু করেন শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, ফতুয়া ও পাঞ্জাবি। কিছু কাজ তিনি এখনও যশোর থেকে করে আনেন। কারণ যশোরের সূচীশৈলীর স্বতন্ত্র ধারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছে সব সময়ে। দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন তাঁর পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও। এরই মধ্যে তাঁর নিজের পণ্য নিয়ে তিনি নেপাল, আমেরিকায় বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন এবং বেশ কিছু পণ্যের অর্ডার আনতে সক্ষম হয়েছেন। ক্রাফট প্রমোটার হিসেবে লাভ করেছেন বেশ কিছু পুরস্কারও।

রোকেয়া খানম শুধু প্রডাকশন দিয়ে নয় সেই সঙ্গে ‘বুলন ক্রাফট’ নামে একটি স্বতন্ত্র ধারার বুটিক শপ তৈরি করেছেন। নিজেরই অর্ডার দিয়ে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁতের শাড়ি তৈরি করে আনেন। বিভিন্ন পণ্য দিয়ে সাজানো তাঁর শোরুমে পোশাকের প্রতি মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।

রোকেয়া খানম বলেন, একজন নারীকে শিক্ষা লাভের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়াটাও জরুরী। এই প্রত্যয় নিয়েই কাজ করতে হবে প্রতিটি নারীকে। চলার পথে বাধা আসবে, আসে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতাও। নিজের ভিত মজবুত হলে সাফল্যের দরজা খুলে যায় দ্রুত। এই বিশ্বাস নিয়ে প্রতিটি নারীকে এগিয়ে যেতে হবে।

রোকেয়া খানম ১৯৯৮ সালে মুস্তফা আনসার আমিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে অবদ্ধ হন। তাঁর কর্মজীবনে স্বামীসহ তাঁর নয় ভাই-বোনের সহযোগিতা পেয়েছেন সর্বত্রভাবে। তাই তাঁর চলার পথে তেমন কোন বাধা আসেনি।

বুলন ক্রাফটের বাইরে রোকেয়া খানমের আছে নিজস্ব একটি ভুবন। সেটা তাঁর সংগীত সাধনা। যশোরে ওস্তাদ গোপালচন্দ্র বর্মণের কাছ থেকে ছোটবেলায় থেকেই সংগীতচর্চা করেছেন। ঢাকায় সৈয়দ জাকির হোসেনের কাছে তামিল নিয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত সংগীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন। রোকেয়া খানম চান নিজস্ব ডিজাইনের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য ক্রাফটসমগ্রী সবমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং তাঁর প্রডাকশন হাউসের মাধ্যমে কিছু দুস্থ ও অসহায় নারীকর্মী নিয়োজিত থেকে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। দেশের প্রতিটি নারী স্বাবলম্বী ও সফল হতে পারবেন এটাই তাঁর প্রত্যাশা।

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: