আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘আমার সোনার বাংলা’র সুচিত্রা মিত্র ॥ শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ঘাসে ঘাসে’ যে জীবন- সেই জীবনের বর্ণিলচ্ছটায় রেঙে ওঠে যে নাম- তিনি সুচিত্রা মিত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ তাঁর কণ্ঠে মূর্ত হয়ে ওঠেছিল সেই ১৯৪৮ সালে। তাঁর গাওয়া সুর অবলম্বন করে বাংলাদেশে গীত হয় জাতীয় সঙ্গীতটি। গানটির যদিও একাধিক সুর রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের শীর্ষশিল্পী হিসেবে সুচিত্রা মিত্র নক্ষত্রের মতো আলোকিত হয়ে বিরাজ করছেন আজও শ্রোতার হৃদয় মঞ্জরিতে। বঙ্গবন্ধু তাঁর কণ্ঠে গান শুনে বিমোহিত হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রবাদপ্রতীম দুই শিল্পীর তিনি একজন। অপরজন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা রবীন্দ্রনাথের মোহর। দু’জনেই ছিলেন মুখার্জী পরিবারের সন্তান। রবীন্দ্রনাথের দুই কন্যা হিসেবে খ্যাত দু’জনের কণ্ঠ ও গায়কী দু’রকম। একজন বিশ্বভারতী, অপরজন শান্তিনিকেতনে আজীবন শুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে নিজেদের উৎসর্গ করে গেছেন। দু’জনের সঙ্গে বাংলাদেশের ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে শিল্পী তৈরিতে শ্রমও দিয়েছেন। নিষ্ঠার সঙ্গে গড়ে তুলেছেন শিষ্যদের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও সুচিত্রা মিত্র ছিলেন এ দেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু। কণিকাও ছিলেন বাংলাদেশ, বাঙালীর অন্তঃপ্রাণ। রবীন্দ্র গানে মহিলা শিল্পীদের ঘরানা যেন এই দু’জন। কারও গান শুনলে শ্রোতার মনে আপনা-আপনিই প্রশ্ন জাগে একালেও, কণ্ঠটা কেমন? কণিকা, নাকি সুচিত্রার মতো! কাকতালীয়ভাবে দু’জনের জন্ম একই বছরে। ১৯২৪ সালে। কণিকা নশ্বর পৃথিবী ছেড়েছেন ২০০০ সালে। ১০ বছর পর রবীন্দ্রসঙ্গীতের আরেক মহাতারকা সুচিত্রা মিত্রও চলে গেলেন। জীবদ্দশায় তাঁদের নাম পাশাপাশি উচ্চারিত হতো। মৃত্যুর পরও হচ্ছে। কারণ সমসাময়িক দুই শিল্পী প্রায় বিপরীত গায়কী নিয়েও নানাভাবেই পাশাপাশি ছিলেন সব সময়ই। পেশায় উকিল, নেশায় সাহিত্যিক সৌরীন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায় ও সুবর্ণলতা দেবীর কন্যাটি মায়ের কাছে একটু-আধটু শিখলেও তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা শান্তিনিকেতনেই। কণিকারও তাই। শান্তিনিকেতনে যাওয়ার আগে অবশ্য সুচিত্রা স্কুলের সঙ্গীত শিক্ষক অনিতা সেন, অনাদি কুমার দস্তিদারের কাছেও কিছুদিন শিখেছেন। আর শিখেছেন বেতারে পংকজমল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসর শুনে শুনে। ১৯৪১ সালে বৃত্তি নিয়ে শান্তিনিকেতনে যান সুচিত্রা। এ যেন স্বপ্নপূরণের মতোই ছিল তাঁর কাছে। বিশ্বকবির মহাপ্রয়াণের কুড়ি দিন পর শান্তিনিকেতনে পা রাখেন দশম শ্রেণীর ছাত্রীটি। পড়াশোনা শেষে ভর্তি হন স্টাফ কলেজে ১৯৪৬ সালে। তার আগের বছর ১৯৪৫ সালে বের হয় তার দু’দুটো গানের রেকর্ড। প্রথমটি রবীন্দ্র সঙ্গীতের দু’টো গানÑ মরণ রে, তুচ্ছ মম শ্যামসমান এবং হৃদয়ের একূল ওকূল। অপরটি বাবা সৌরীন্দ্র মোহন মুখার্জীর লেখা দুটি আধুনিক বাংলা গান- তোমায় আমায় ক্ষণেক এবং তুমি আসবে না। ১৯৪৬ সালে চালু করেন নিজের সঙ্গীত শিক্ষার স্কুল। ‘রবিতীর্থ’। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী সেই থেকে নিজেও গানের শিক্ষক। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রীও নেন। ১৯৬৩ সালে যোগ দেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে শেষ। ১৯৮৪ সালে বিশ্বভারতী ছেড়ে দেন আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ ছাড়াই। চাকরিকালেই তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে এমএ পাস করেন।

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির প্রথম রেকর্ড করেন সুচিত্রা মিত্র ১৯৪৮ সালে। রেকর্ডের অপর পিঠের গানটি ছিল সার্থক জনম আমার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গান দুটির পুনরায় রেকর্ড করেন। শান্তিদেব ঘোষের করা স্বরলিপি অনুসারে তিনি গানটি গেয়েছেন। তবে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর করা সোনার বাংলার স্বরলিপির সঙ্গে প্রামাণিক সুর হিসেবে এটিও স্বরবিতানে স্থান পেয়েই মুক্তিযুদ্ধ কালে প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরে সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া সুরের গানটিই গাওয়া হতো। একাত্তর সালের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য কলকাতার রাজপথে সেখানকার বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা যে মিছিল বের করে, তার অগ্রভাগে তারাশংকর, প্রেমেন্দ মিত্র, কাননদেবী, দেবব্রত বিশ্বাসের পাশে ছিলেন সুচিত্রা মিত্র। মুক্তিযুদ্ধের পরও শরণার্থীদের তহবিল সংগ্রহে বহু অনুষ্ঠানে গেয়েছেন সুচিত্রা। এমনকি রবীন্দ্র-নজরুলের কবিতাও আবৃত্তি করেছেন। সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাওয়া উমাপ্রদাস মৈত্র নির্মিত ‘জয় বাংলা’ ছবিতে তিনি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অভিনয় করেছিলেন।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় বঙ্গবন্ধু সফর করেন। ব্রিগেড ময়দানে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ওই অনুষ্ঠানের শুরুতে সুচিত্রার নেতৃত্বে শত শত শিল্পীকণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে রাতে রাজভবনে রাজ্যপাল আয়োজিত রাজনীতিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন বঙ্গবন্ধু। সুচিত্রা মিত্রও ছিলেন। অবশ্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে আগে দেখেননি। শুধু গানই শুনেছেন। তদুপরি নাম শোনার আগেই সুচিত্রা মিত্রকে চিনে ফেললেন।

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আপনি এসেছেন দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি আপনার গানের ভক্ত।’ সুচিত্রা মিত্র সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমি আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কেন। গান শোনাবেন না?’ সুচিত্রা স্মিত হেসে বলেছিলেন, ‘আপনি শুনতে চাইলে শোনাব।’ সেদিন কলকাতার রাজভবনে কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীই বঙ্গবন্ধুকে গান শুনিয়েছিলেন। সুচিত্রা মিত্রও গেয়েছিলেন ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু ওগো কর্ণধার।’ সুচিত্রা মিত্র ১৯৭২ সালেও ঢাকা এসেছেন। গেয়েছেন রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনতার সামনে। তারপরও বহুবার এসেছেন এই বাংলায়। ১৯৮৬ সালে বিটিভির জয়ন্তীতেও এসেছিলেন। সুচিত্রা মিত্র প্রথম পূর্ববঙ্গে আসেন ১৯৫৭ সালে দেবব্রত বিশ্বাসের বুলবুল ললিতকলা একাডেমির আমন্ত্রণে। গান গেয়েছিলেন রাতভর। কমরেড মনি সিংহ ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের শ্রোতা।

গণনাট্য সংস্থার শিল্পী সুচিত্রা মিত্র সব ধরনের গানই হাটে-মাঠে-ঘাটে জনসাধারণের মধ্যে গান গেয়ে বেড়াতেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পীটি কবির গান সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কখনও যান্ত্রিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন না। তার কণ্ঠে গান যেন প্রাণে এবং নতুন তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। শিল্পী হিসেবে এখানেই ছিল তাঁর সার্থকতা। খুব উদার মনস্ক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানের ব্যাপারে। চাইতেন আরও বেশি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হোক। শ্রোতার কাছে এ অনন্য সৃষ্টি আরও বেশি করে পৌঁছে যাক।

তাঁর ছড়ার বইয়ের নাম ‘খেয়াল খুশি।’ অনেকটা খেলার পুতুল গড়ার মতো। সাগরময় ঘোষ গ্রন্থের মুখবন্ধ দিয়েছিলেন, তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন বিষ্ণুদেÑ ‘সুচিত্রা মিত্রের গান শুনে।’ অরুণ মিত্র, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তও লিখেছেন। যেসব শিল্পীর সৌজন্যে রবীন্দ্রনাথের গানের ভুবনটিকে চেনা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নামÑ সুচিত্রা মিত্র। শিল্পীর দায়িত্ব তাঁর মতো এমন আশ্চর্যভাবে ক’জনেই বা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্ধশতাব্দী কালেরও বেশি এমন করে এই গানের রূপবৈভবে শ্রোতার মনের দরোজায় বার বার নাড়া দিয়েছেন ক’জন? রবীন্দ্র সঙ্গীত আর সুচিত্রা মিত্র পরস্পর হাত ধরে পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর দৃপ্ত উজ্জ্বল গায়নÑভঙ্গিমায়, অনন্য সাধারণ বিন্যাস-কল্পনায় এবং যে কোন ধরনের গানে প্রার্থিত রস সঞ্চারে তিনি অতুলনীয়া। তুল্য মূল্যের বিচারে হয়ত বা তাঁর চেয়ে কোন হার্দ্যকণ্ঠ অথবা সঙ্গীত শৈলীর ক্রিয়াপরতা শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক আনন্দ দিয়েছে কিন্তু তার মতো রবীন্দ্র সঙ্গীতের মর্মবেদনা শ্রোতার হৃদয়ে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন ক’জন শিল্পী! ঘরোয়া আসরে, চার দেয়াল ঘেরা মঞ্চে, টিভির, বেতারে বা উন্মুক্ত প্রান্তরে সর্বত্রই তিনি সমান প্রদীপ্ত। এখানেও তিনি অতুলনীয়। আর রবীন্দ্র সঙ্গীত যে কেবলই সুর, কেবলই বাণী নয়, তা আমাদের উপলব্ধি করিয়েছেন যাঁরা, সুচিত্রা মিত্র কি কেবল অন্যতমাÑ এ প্রসঙ্গ শেষ হওয়ার নয় তাঁর সময়কাল হতেই।

সুচিত্রা মিত্রের কাছে রবীন্দ্রনাথের জগতকে বড় স্নিগ্ধ, বড় শান্তির, বড় আনন্দের মনে হয়েছে। জীবন ঘুরপাক খেতে খেতে যেখানেই যাক, জীবনের শেষ কামনা-শান্তি। এই আকুতিই ধরে রাখে রবীন্দ্রসঙ্গীত। এ ব্যাপারে তাঁর কোনও সংশয় ছিল না। বলেছেনও শিল্পী, ‘রবীন্দ্রনাথের গান শুধু সুর, তাল, লয় নয়। রবীন্দ্রনাথের গানের সাহিত্য মূল্য না বুঝলে কিছুই হবে না। বারে বারে পড়তে হবে। বুঝতে হবে। উচ্চারণ, পাংচুয়েশন শিখতে হবে। গানটাকে চোখের সামনে দেখতে হবে, ‘ভিসুয়ালাইজ’ করতে হবে। যারা তা পারে না, করে না। গান আছে অনুভূতি নেই। সুর আছে, বাণী আছে, প্রাণ নেই। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর মনে হয়েছে বিশাল বড় বিশাল তাঁর ব্যাপ্তি কিন্তু তাঁকে সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ছিল অপছন্দ। রবীন্দ্রনাথকে যেন ব্যবসা করে না তোলা হয়, বার বার সে কথা বলেছেনও তিনি। তবে ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, রবীন্দ্র সঙ্গীত অর্থকড়ি হয়ে ওঠার। মনে হয়েছে তাঁর। রবীন্দ্রনাথ ‘সেলস’ রবীন্দ্র হুজুগ।

সুচিত্রা মিত্রের গান শুনলে বিশ্বাস করা যায় এ কেবল কথার কথা নয়। তাঁর অস্তিত্বের দু’কূল ছাপিয়ে এ গানের ব্যাপ্তি না হলে রবীন্দ্র সঙ্গীতের এমন নিবেদন কি কখনই সম্ভব হতো? কিন্তু ‘তবু মনে হয় জানিনে কিছু/বুঝেইছি বা কী/এ গভীরতর/তল পেতে/এখনও তো কত বাকি/স্রষ্টার বিপুল সৃষ্টি/মনের আকুতি/অন্তরের যন্ত্রণা/কতটুকু পেরেছি ধরতে?’ এই বোধই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি গানের অনুভব-বেদনা তাঁকে প্রাণিত করেছে অন্তরতম অনির্বচনীয়তা প্রকাশে। পথচলার আনন্দে সকল রসের ধারায় স্নাত হয়ে উন্মোচিত করে চলেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের নানান দিগন্ত। এখানেই তার সার্থকতা। শিল্পীর সম্পর্কটা গলার সঙ্গে শ্রোতার কানের। সুরের ঐশ্বর্য মিলিয়ে রবীন্দ্র বাণীর সাহিত্যরস শ্রোতার কানে ঢেলে দিয়েছেন সুচিত্রা মিত্র। শিল্পী হতে গেলে ভাল গলা থাকলেই হবে না, ভেতরে আরও একটা জিনিস থাকা চাই বলে তিনি মনে করতেন। শিল্পীর ব্যক্তিত্ব একটি অন্য জিনিস হিসেবেই তাঁর জীবনে প্রতিভাত। বলতেন, যাঁরাই ভাল গান করেন, তাঁরাই ভাল শিল্পী নন। যে সব গানে খুব বেশি অলঙ্করণ, সে ধরনের গানের প্রতি ছিল বীতরাগ। তাঁর ধারণা- অলঙ্করণের ঠেলায় বাণী হারিয়ে যায়। সহজ চলনের গান, উদার দৃপ্তভঙ্গি, প্রতিটি কথা যেখানে স্পষ্ট, গাছের পাতার মতো একটি একটি করে ঝরে পড়ছে, তার একটা আলাদা আবেদন রয়েছে। বেশি কেরামতিতে অবস্থা দাঁড়ায়- ‘আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে।’

সুচিত্রা মিত্র বিশ্বাস করতেন শিল্প আর শিল্পীর মধ্যে কোথাও বিরোধ নেই। একে অপরের পরিপূরক। মহান শিল্প মহৎ শিল্পীর মাধ্যমে রূপায়িত হয়, প্রকাশিত হয়, প্রচারিত হয়। মহান শিল্পের মাধ্যম মহৎ শিল্পী এ কথা অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের গানের অলৌকিক ব্যঞ্জনা, অপরিমিত রসাস্বাদন; অনুপম রূপকল্প; কথা ও সুরের এই একাত্মতা যে সামগ্রিক সৌন্দর্য-সুষমা, যে ভাবগম্ভীর এক পরিবেশ সৃষ্টি করে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তা অনন্য। এই বৈশিষ্ট্যর জন্যেই তাঁর গান স্ব-মহিমায় ভারতীয় সঙ্গীতজগতে উদ্ভাসিত। মহৎ শিল্পী তিনিও, তাই অক্লেশে এমনভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে সক্ষম হয়েছিলেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে সুচিত্রা মিত্র এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান- যার প্রাণবিন্দু রবীন্দ্রসঙ্গীত। এই গান যতদিন বেঁচে থাকবে, সুচিত্রা মিত্রও বেঁচে থাকবেন ততদিন আমাদের প্রাণের গভীরে।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: