মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রাজার পাহাড় হতে পারে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র

প্রকাশিত : ৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • শেরপুর শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে রাজার পাহাড়

রফিকুল ইসলাম আধার, শেরপুর থেকে ॥ পাহাড়-নদীঘেরা শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবারিত সবুজের সমারোহ নিয়ে এ গারো পাহাড়ের অবস্থান। ছোট-বড় অসংখ্য টিলাভূমি আর সবুজে ঘেরা এ গারো পাহাড় কত যে মনোমুগ্ধকর তা নিজের চোখে না দেখলে অনুভব করার নয়। ওইসব নৈসর্গিক আকর্ষণীয় এক টিলা ‘রাজার পাহাড়’।

প্রাচীনকালে সম্ভ্রান্ত রাজ বংশের এক রাজার অবস্থানের নামে এখানকার এ পাহাড়ের নাম হয় রাজার পাহাড়Ñ এমনই কিংবদন্তি রয়েছে। রাজার পাহাড়ের আগের সেই সৌন্দর্য এখন আর নেই। তবে এর বৈশিষ্ট্য প্রতিবেশী পাহাড়গুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী। গারো পাহাড়ে যতগুলো উঁচু টিলাভূমি রয়েছে, তার মধ্যে রাজার পাহাড়ের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি। এর চূড়ায় রয়েছে শতাধিক হেক্টর জমির সমতল বিরাণভূমি। সবুজ আর নীলের সংমিশ্রণে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ ছোঁয়া বিশাল পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য মনকে করে আবেগতাড়িত।

প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠা এ পাহাড়ে প্রতিদিন শতশত মানুষের ভিড়ে জায়গাটি হয়ে ওঠে কোলাহলপূর্ণ। নারী-পুরুষ ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের পদভারে হয়ে ওঠে মুখরিত। এ পাহাড় পর্যটন কেন্দ্র হলে ভ্রমণপিপাসুদের চাহিদা পূরণে যোগ হবে নতুন মাত্রা। দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এখান থেকে আয় হবে বছরে লাখ লাখ টাকা। এ রাজার পাহাড়ে প্রতিবেশী আদিবাসী গ্রামগুলোর অনেক বেকার ও হতদরিদ্রদের জন্যে হবে কর্মসংস্থান। তাহলে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদভারে আরও মুখরিত হয়ে ওঠবে এ রাজার পাহাড়।

এলাকাবাসী, ভ্রমণপিপাসু, পর্যটক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজার পাহাড়ের ইতিহাস ও সম্ভাবনার তথ্য। শেরপুরের শ্রীবরদী পৌর শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে কর্ণঝোরা বাজার সংলগ্ন এ রাজার পাহাড়। এটি মানুষের জন্য বিনোদন স্পটে পরিচিত হয়েছে।

বছরে প্রায় সব সময়ই শতশত মানুষ শহর থেকে এ রাজার পাহাড়ের নির্মল পরিবেশে বেড়াতে আসে। এ যেন এক পর্যটন স্পট। রাজার পাহাড়ের পাশের জনপদ বাবেলাকোনা। এটি যেন অসংখ্য উঁচু টিলায় ঘেরা অনবদ্য গ্রাম। প্রাচীনকাল থেকে এখানে গড়ে উঠেছে জনবসতি। ঝোপ-জঙ্গলে আবৃত গ্রামটি কালের আবর্তনে পরিচিত। আজ প্রাকৃতিক শোভাম-িত সবার কাছে পরিচিত বাবেলাকোনা রাজার পাহাড়।

১৯৮০ সালে পাগলা দারোগা নামে জনৈক ব্যক্তি এ রাজার পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে বসবাস শুরু। তিনি মারা গেলে এখনও তার ছেলে-মেয়েরা এখানে রয়েছে। তার ছেলে-মেয়েরা এ টিলার এক কোনায় গড়ে তোলেন কাঁঠাল, লিচু ও কলার বাগান। অপূর্ব সৌন্দর্যম-িত এ রাজার পাহাড়ের চারদিকে আছে হরেকরকম প্রজাতির গাছ-গাছালি। এ চূড়ার বিশাল সমতল ভূমিতে যেতে সরু পথ আর অদ্ভুত এক নির্জন পরিবেশ যে কাউকে যাওয়ার আগে মুগ্ধ করবে।

রাজার পাহাড়ের পাশেই বাবেলাকোনায় গারো, হাজং, কোচ অধ্যুষিত আদিবাসীদের সংস্কৃতির ভিন্নমাত্রায় রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনধারা। এখানের প্রাকৃতিক বিরূপতা জঙ্গল আর জন্তু জানোয়ারের মিতালীতে এ জনপদের চলমান জীবন সংগ্রামের বিরল দৃশ্য। আদিবাসীদের সংস্কৃতি, সংরক্ষণ ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে বাবেলাকেনা কালচারাল একাডেমি, যাদুঘর, লাইব্রেরী, গবেষণা বিভাগও মিলনায়তনের নিদর্শন। এখান থেকে আদিবাসীদের সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছুই।

মিশনারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হচ্ছে এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কর্ণঝোড়া ঢেউফা নদীর জোয়ারে কানায় কানায় ভরে ওঠে। কিন্তু দিনে ভাটা পড়ে শুকিয়ে যায় নদীর পানি। তবে খরস্রোতা এ নদীর পানি কখনোই কমে না। এর বুকজুড়ে রয়েছে বিশাল বালুচর। যা থেকে বালু সংগ্রহ করে নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। এটি যেন পাহাড়ের কৃলঘেঁষা বিকল্প সমুদ্র সৈকত।

বাবেলাকোনা গ্রামে উপজাতিদের কারুকার্যম-িত ধর্মীয় গীর্জা, মন্দির, উপাসনালয় ও অসংখ্য প্রাকৃতিক নির্দশনের সমাহার।

আদিবাসী সম্প্রদায়ের চাল-চলন, কথাবার্তা, ও জীবন প্রণালী দর্শনার্থীদের আরও আকৃষ্ট করে। তাদের সংস্কৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। তাদের জীবন যেন প্রবাহিত ভিন্ন এক ধারায়। এখানে রয়েছে ওয়ার্ল্ড ভিশন, বিডিআর ক্যাম্প, বিট অফিস, কারিতাস ও রাবার বাগান।

রাজার পাহাড়ের এ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে এসে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার নানাদিক জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন অনেকেই। রাজার পাহাড়ের পাশেই বাবেলাকোনা গ্রামের ভূপেন্দ্র মান্দা, সাবেক ইউপি সদস্য নেদারু ম-লসহ অনেকে জানান, রাজার পাহাড় আশপাশের সব টিলাভূমির চেয়ে উঁচু বেশি। তাছাড়া এর নিচ দিয়ে কয়েকটি ঝরণা বয়ে গেছে ঢেউফা নদীতে।

টিলা থেকে নিচের দিকে তাকালে চোখ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমনি এ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় আশপাশের কর্ণঝোড়া, মালাকোচা, দিঘলাকোনা, হারিয়াকোনা, চান্দাপাড়া, বাবেলাকোনাসহ ভারতের সীমান্ত এলাকা। এ পাহাড়ে পর্যটকদের কাছে পানি বিক্রেতা অমৃতমালা, আয়শা, শিউলী ও মিনালসহ অনেকে বলেন, এখানে পর্যটন কেন্দ্র হলে আরও অনেক লোক আসবে। আমাদের এলাকার আরও অনেকে এটা-সেটা বিক্রি করে জীবন চালাতে পারব। এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান আবু রায়হান বাবুল বলেন, এখানে পর্যটন কেন্দ্র হলে বছরে সরকারের আয় হবে লাখ লাখ টাকা। উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সুশীল নকরেক বলেন, এটি এখন সময়ের তাগিদেই প্রয়োজন। এখানে পর্যটন কেন্দ্র করা হলে আদিবাসীসহ অনেকেই কাজ করে আয় করার নতুন সুযোগ পাবে।

প্রকাশিত : ৩ জানুয়ারী ২০১৫

০৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: