কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অরুণাভ সরকার কম লিখেও তিনি অগ্রগণ্য

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়...
  • মাহমুদ কামাল

অরুণাভ সরকার ষাটের দশকের অগ্রগণ্য কবি। চুয়াত্তর বছরের জীবনে কবিতা লিখেছেন খুবই কম। গদ্য ও শিশুতোষ বই রয়েছে যে কয়টি তাও হাতে গোনা। এত কম লিখেও তিনি তাঁর দশকের অন্যতম একজন কবি এ কথা দুর্জনেরাও স্বীকার করেন। ‘দুর্জন’ এই অর্থে; জীবিত সময়ে তিনি ভুল বানান এবং ভুল বাক্য সম্পর্কে যাদের সমালোচনা করেছেন তাঁরা তাঁকে অপছন্দ করতেন এবং এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। লেখার চেয়ে আড্ডায় পারদর্শী ছিলেন। অরুণাভ সরকারের কবিতা সংখ্যাতত্ত্বে বিচার করলে তা হবে সাধারণ ভুল। কবিতার শিল্পমূল্যই কবিতা বিচারের শুরু এবং শেষ কথা। বিরলপ্রজ কবির কবিতাগুলোর আলোচনা উপর্যুক্ত আলোকে সদর্থক বলে বিবেচনা করি।

কম লিখেও যাঁরা হীরকদ্যুতির মতো পঙ্ক্তিমালার অধিকারী হন অরুণাভ সরকার তাঁদেরই একজন। পত্র-পত্রিকার সম্পাদকদের লেখার চাহিদা তিনি মেটাতেন পুরনো কবিতা দিয়ে। একই কবিতা তিনি বারবার ছেপেছেন। বোধকরি তা কোন সাহিত্য সম্পাদকের নজরে পড়েনি। আমি তাঁর কবিতার মনোযোগী পাঠক ছিলাম বলেই এ বিষয়ে বহুবার তাঁকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। তিনি তার জবাবে যা বলতেন তা এখানে মুদ্রণযোগ্য নয়। তিনি কখনই অতিপ্রজ কবি ছিলেন না বলেই নতুন লেখার প্রতি আগ্রহ ছিল কম। তবে, ভুল বানান কিংবা শব্দ ব্যবহারের জন্য যেমন তাঁর গালমন্দ উপহার পেয়েছি, পাশাপাশি একই কবিতা ছাপানোর বিষয় বারবার ধরিয়ে দেয়ার কারণে প্রশংসাও পেয়েছি।

কেমন কবি তিনি ছিলেন? এ প্রসঙ্গে কয়েকটি মন্তব্য হাজির করি: ‘নগরে বাউল’ যখন প্রকাশিত হয় তার পরপরই এক আলোচনায় কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁকে ‘ধূসর নগরে প্রেমিক বাউল’ নামে বিশেষিত করেছিলেন। কবি রফিক আজাদ অভিধা দিয়েছিলেন ‘লিরিকের রাজা’ হিসেবে। সেই ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে কবি আল মাহমুদ ‘নগরে বাউলকে স্বাগত’ শিরোনামে লিখেছিলেনÑ “তরুণ কবিরা তাদের প্রথম বইয়েই নিজের স্বতন্ত্র বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব পথটিও চিনে নেন। উপকরণ যাই হোক, ‘নগরে বাউল’ গ্রন্থে একজন তরুণ কবির পক্ষে যতটা সম্ভব এই স্বাতন্ত্র্য ঘোষিত হয়েছে। স্বাদেশিকতা ও প্রেমকে কবি সমকালীন সাযুজ্যে সংবদ্ধ করে পঙ্ক্তিমালা সাজিয়েছেন।”

আল মাহমুদ অরুণাভ সরকারের কবিতার মূল সুরটি ঠিকভাবেই ধরতে পেরেছিলেন বলে বিবেচনা করি। কবিতার ভিড়ে খুব সহজেই অরুণাভ সরকারকে আলাদা করা যায়। অন্যান্য কবির মতো নারী তাঁর প্রিয় বিষয়। এ নারী ‘জবাকুসুমের’ মতো, এ নারী কখনো ফেরে না। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত কবিতার একটি, ‘নারীরা ফেরে না।’ আমরা এ কবিতাটি পুনরায় পাঠ করে এর ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করব। ‘যাওয়া বলে কিচ্ছু নেই, সবই ঘুরে-ফিরে আসে/শূন্যতায় মাথা কুটে ফিরে আসে সমস্ত সংলাপ/সব শীৎকার, চীৎকার/বিশাল রণপায় চেপে/প্রাচীন গোধূলি ফিরে আসে,/নীলিমা-ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরে পাখি,/নদী, তারও গতি নয় শুধুই সাগরে/সেও মেঘে-মেঘে ঝর্ণার নিকটে ফিরে যায়।/শুধুএকবার চলে গেলে /নারীরা ফেরে না।’ উপর্যুক্ত কবিতাটি নারী ভাবনার এক অন্যরকম প্রেষণা। সবকিছুই ঘুরে ফিরে আসে। পাখি, নদী এমনকি সমুদ্রের পানি বাষ্প হয়ে মেঘের মধ্য দিয়ে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরে আসে। কবি এই চিরায়ত বিষয়টির সঙ্গে এক করে ফেলেছেন নারীর চলে যাওয়াকে। শেষ দুই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন ‘একবার চলে গেলে/ নারীরা ফেরে না।’

কবিতাটি খুবই সহজ সরল ভাষায় লেখা। নেই কোনও দুর্বোধ্য শব্দ। বাক্যগুলোও স্ফূর্তি পেয়েছে তাঁর অন্যান্য কবিতার সহজাত নির্মাণশৈলীর মতোই। কিন্তু অর্থদ্যোতকতা কবিতাটিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কবিতাটি কি আমাদের গার্হস্থ্য জীবনের বিশেষ করে নগর জীবনের জটিল ঘটনা সূত্রের চিত্রকল্প? এত সহজ ভাষায় এ রকম অর্থদ্যোতক কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে অরুণাভ সরকারকে শনাক্ত করা সহজ হয়ে ওঠে। নারীরা ফেরে না এই পঙ্ক্তিটি এক সময় কবিতাপ্রেমীদের মুখে মুখে ফিরত। কিন্তু পুরুষও তো একবার জগত সংসার থেকে চলে গেলে আর ফেরে না। আপনার কবিতায় নারীর না ফেরার ঘটনা ইহলৌকিক। আপনার ফেরাও তো আর কখনো ঘটবে না। তবে আপনার রেখে যাওয়া সামান্যসংখ্যক অসামান্য কবিতা বারবার ফিরে আসবে পাঠকের সংবিৎ- এ।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: