মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জন্মশতবর্ষে জয়নুল আবেদিন

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
জন্মশতবর্ষে জয়নুল আবেদিন
  • জাফর ওয়াজেদ

‘ব্রহ্মপুত্র নদী তাঁকে খুব টেনে নিতো। ব্রহ্মপুত্রের তীরে ছেলেবেলায় খেলে বেড়াতেন। শীতের নদী কুলু কুলু করে বয়ে যেত। জেলে মাছ ধরতো। মেয়েরা কাপড় কাঁচত, কলসি ভরে পানি নিয়ে যেত বাড়ি। যাত্রী এপার-ওপার করত খেয়া নৌকার মাঝি। তন্ময় হয়ে দেখতেন মানুষের এই আসা-যাওয়া। নদীর ওপারে ঘন বন, তাকালে দেখা যেত দূরে নীল আকাশের কোল ঘেঁষে ধূসর গারো পাহাড়। সবকিছু মিলে মায়ার মতো লাগত আমার কাছে। একদিন সকালে ওঠে বুঝতাম কেমন যেন মিষ্টি বাতাস বয়। দূরে বকুল ডালে কোকিল ডাকে। বুঝতাম বসন্ত এসেছে। বসন্তকালে গাছে গাছে কত ফুল ফুটত। সমস্ত প্রকৃতিতে রঙের হাট বসে যেত।’ নিজের শৈশব স্মৃতিকে এভাবে তিনি বিধৃত করেছেন। তিনি জয়নুল আবেদিন, শিল্পচার্য, যিনি নিজেই এদেশের চিত্রশিল্পে এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি। একজন জাতশিল্পী। অস্থিমজ্জায় এক পরিপূর্ণ শিল্পীসত্তার অধিকারী। তাঁর শিল্পী জীবনের সূচনাপর্ব, বিকাশ, সাফল্য, ব্যর্থতা থেকেই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায় একজন পথিকৃৎ-এর প্রতিকৃতি।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এদেশের প্রথম সফল আধুনিক চিত্রশিল্পী। জন্মেছিলেন কিশোরগঞ্জে ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। জীবন চলার পথে অর্থাৎ বাষট্টি বছর বয়সে তিনি সৃজনের রূপকার হিসেবে শুধু চিত্রকর্ম নয়, গড়ে তুলেছিলেন শিল্পচর্চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিকূল পরিবেশে শুধু চিত্র এঁকে চিত্রশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন, এদেশীয় চিত্রকলার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন তা নয়, পূর্ববঙ্গে প্রথম চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এদেশে শিল্পচর্চার বাতাবরণ তৈরি করেছেন। নিজের শিল্পী হয়ে উঠা এবং একটি জাতির জন্য শিল্পচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করা। একইসঙ্গে দুটি কঠিন কাজ সম্ভব হয়েছিল। কারণ, ছিলেন তিনি অস্থিমজ্জায় পরিপূণ শিল্পীসত্তার অধিকারী।

শিল্পাচার্যর জীবনকাল ১৯১৪ থেকে ১৯৭৬। শীতের মিষ্টিরোদে জন্মেছেন। ‘বৃক্ষরাজি সুশোভিত, কলমি কদম্ব মুকুলিত পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা একটি নিবিড় স্থান। অদূরে কুল কুল রবে প্রবাহিত হচ্ছে নরসুন্দা নদী। সেই নদীর পাশে কিশোরগঞ্জ থানা সংলগ্ন একটি ছোট সরকারী বাড়ি। এখানেই জয়নুল ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন। প্রভাতের মিষ্টিমধুর রবির কর যেন নবজাতকের মুখচুম্বন করল প্রগাঢ় স্নেহাদরে, মমতায়।’ পুলিশ পিতার সন্তানটির শৈশব কৈশোরে ছবি আঁকার সূচনা সৃষ্টিশীল মনের স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে। ছবি আঁকতেন ব্রহ্মপুত্রের, তার কাশফুল, খেয়াঘাটের। বিদ্যালয়ের খাতাপত্র ভরে তুলতেন চিত্র এঁকে। যখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র তখন, ‘বোম্বে ক্রনিকল’ নামক পত্রিকা আয়োজিত শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জীবনের প্রথম পুরস্কার এবং শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ময়মনসিংহ থেকে চলে গেলেন কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র হিসেবে শুরুতেই ইউরোপীয় শিল্পরীতি শিক্ষা দিযে সূত্রপাত তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠা। কিন্তু তিনি ক্রমশ হয়ে ওঠেন দেশজ ধারার অন্যতম প্রতিনিধি। তাঁর সহপাঠী শিল্পী শফিকুল আমীন উল্লেখ করেছেন, ‘তখন স্কেচ করার জন্য আর্ট স্কুল শনিবার ছুটি থাকত। আমাদের প্রথম স্কেচ করে আনতে বলা হলো, কৃষ্ণচূড়ার ডাল। সবাই স্কেচ করে নিয়ে গেলাম। জয়নুল ছাড়া অন্য সবার স্কেচ দেখে মনে হলো, সেগুলো এমন শুকনো নিষ্প্রাণ যে এখনই তা দিয়ে আগুন জ্বালানো যাবে। আর জয়নুল যা এঁকে নিয়ে গেলেন, তা দেখে মনে হলো, এখনই তাতে ফুল ফুটবে।’ছাত্রজীবন শেষ হতে না হতেই ১৯৩৮ সালে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র পথযাত্রার সর্বভারতীয় স্বীকৃতি পেয়ে যান। নিসর্গ দৃশ্যভিত্তিক জলরং চিত্রমালার জন্য একই বছর কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় প্রদর্শনী প্রতিযোগিতায় গভর্নরস গোল্ড মেডেল লাভ করেন। সক্রিয় প্রকৃতির আত্মাকে আবিষ্কার করার সক্ষমতা তাঁকে ছাত্রজীবনেই সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এবং যা ছিল সহজাত। আর্টস্কুল থেকে পাস করার পর সেখানেই শুরু করেন শিক্ষকতা। আর এ সময়ে আঁকেন দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা। পঞ্চাশের মন্বন্তরের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা না এলে তাঁর পক্ষে স্বীকৃতির বিষয়ে ছেদ পড়ত। সেসব চিত্র আজও প্রবহমান এবং জয়নুল আবেদিনকে চিনে নিতে সহজ হয়। তাঁর অর্জিত সুনিপুণ শিল্পদক্ষতা ও সৃজনশীল শিক্ষা দৃষ্টির স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং পরিণতিই হচ্ছে তাঁর তেতাল্লিশের শিল্প সাফল্য। যেন জয়নুলের কারণেই তেতাল্লিশের স্কেচমালা। তেতাল্লিশ বা পঞ্চাশের মন্বন্তরের পূর্ববর্তী এক দশকাধিককালের কর্মমুখর সময়গুলো জয়নুলের শিল্পীজীবনে সবচেয়ে পরিস্ফুটিত সময়। কেননা এই সময়কালের ভেতরেই তাঁর শিল্পী মন-মানস, তার সৃজনশীল সমর্থ হাত পাকাপোক্ত ভিত্তি পেয়েছিল অর্থাৎ ভিত্তি রচনা করেছিল উচ্চ মানসমৃদ্ধ কারিগরি দক্ষতা ও গভীরতা সম্পন্ন শৈল্পিক মেজাজের। তুলি, কলম, পেন্সিলের ড্রইং বা রেখাঙ্কন, হাল্কা ‘ওয়াশ’ প্রদত্ত স্কেচ এবং তৈলচিত্র; ছাপচিত্রও স্বচ্ছ অস্বচ্ছ জল রঙের তখন তিনি পরিপূর্ণ রূপকার। এই সময়কালেই তাঁর মধ্যে সঞ্চিত হয়েছিল, পুঞ্জিভূত হয়েছিল মহৎ শিল্প সৃষ্টির উপকরণ সম্ভার। আর সে পুঁজির বৈভবেই সৃষ্টি হয়েছিল সে বিখ্যাত ‘স্কেচমালা’। জলরঙের কাজেও তাঁর খ্যাতি তখনই তৈরি হয়।

দেশ ভাগের পর কলকাতার লোভনীয় জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে জয়নুল আবেদিন ফিরে আসেন স্বদেশে, পূর্ববাংলায়। ঢাকায় এসে তিনি ও তাঁর সহযোগী শিল্পীরা মিলে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৮ সালের ১৫ নবেম্বর প্রতিষ্ঠিত হলো ঢাকা ইনস্টিটিউট অব আর্ট। তিনি হলেন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। এর কাছাকাছি সময়ে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রধান নক্সাবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৫টি বছর জয়নুল আবেদিনের শিল্পীজীবনের শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যে উদ্দীপ্ত যৌবন পেরোনোর কাল। এই সময়কালের শেষ প্রায় দশবছরের মধ্যেই তিনি অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ও সুবিদিত একজন শক্তিধর অঙ্কনবিদ ও জলরংচিত্রী হিসেবে নিজের অবস্থানকে পোক্ত করেছেন। শিক্ষক হিসেবেও তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছিলেন। সৃজনশিল্পের ক্ষেত্রে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করা আবার গুণমুগ্ধ ছাত্র শিষ্যদের হাতে কলমে দীক্ষা দানের ক্ষেত্রেও শতকরা একশ’ ভাগ সুনাম অর্জন করার কৃতিত্ব একমাত্র জয়নুল আবেদিনেরই।

জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান পর্বে প্রচুর চিত্র এঁকেছেন শিক্ষকতার পাশাপাশি। স্বদেশের প্রতি গভীর ভালবাসা থেকে তিনি বাংলার জীবনকেই দেখেছেন তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। তাঁর জীবনের শুরু থেকে শেষাবধি গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঋতুচক্রে আবর্তিত বৈচিত্র্যময় আকাশের নীল; নদীর বাঁক ও পানি; দূরের এবং কাছের পাহাড়, বন-বনানী, ঘাস ও মাটির বর্ণিল রূপ, ফসলের মাঠে সবুজ এবং সোনালি হলুদের দোলায়িত লীলা প্রভৃতি এমন এক বাস্তব রং রূপ অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় যে, মূলত: তার সামগ্রিক প্রভাব জয়নুলের মন-মানসে স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত। এদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি সমান টান ছিল তাঁর। তারই ফলস্বরূপ কেবলমাত্র প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী তথা নিসর্গ কেন্দ্রিক জলরং চর্চায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত রাখেন নি। দেশের মানুষ, শ্রমজীবী কৃষক শ্রমিক এবং সাধারণ নর-নারী ও গ্রামীণ সমাজ পরিবেশ ব্যাপকভাবে তাঁর শিল্পের অঙ্গনে স্থায়ী ছায়া ফেলেছে তো বটেই, স্বচ্ছ জলরং মাধ্যমে অথবা পানিবাহিত অন্যান্য অস্বচ্ছ মাধ্যমে তিনি তাঁর অনুসৃত কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। প্রাকৃতিক পরিবেশ, নিসর্গ দৃশ্য; নদী ও নৌকা, পাখ-পাখালি, জীব-জন্তু প্রভৃতি এবং তার সঙ্গে মানুষ ছিল জয়নুলের জলরং চিত্রের প্রধান উপজীব্য বিষয়। তাঁর অনুসৃত এবং চর্চিত সবগুলো মাধ্যমেই বিষয়বস্তু হিসেবে প্রকৃতি; পরিবেশ ও মানুষ প্রাধান্য পেয়েছে। মানুষ ছাড়া শিল্প এবং নিসর্গ ছাড়া মানুষ জয়নুল চিত্রে তেমনভাবে ঠাঁই পায়নি। মানুষ ও গবাদি পশু ও কাক পর্যায় ক্রমিকভাবে তাঁর চিত্রে এসেছে। আকাশ ও নদী বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে তাঁর শিল্পে বিশেষত জলরঙে উপস্থাপিত হয়েছে গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে। জলরঙে স্বদেশের প্রকৃতি এবং মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন নিজের শিল্প ভা-ারকে। যা তাঁর বৃহত্তর উপজীব্যের ভিত্তি। মূলত তাঁর ব্যক্তি ও শিল্পীসত্তায় সবচেয়ে সুদৃঢ় হয়েছে মানবতা বোধ। এই বোধকে কেন্দ্র করেই স্বদেশ প্রকৃতি, পরিবেশ এবং গোটা বিশ্বের মানুষ তাঁর চিত্রকলার অঙ্গন জুড়ে রয়েছে। বিদেশ-বিভূঁইয়ে বলেও দেশজ বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করেছেন। বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিসুলভ শিল্পী চেতনার সুদৃঢ় ভিত্তি ছিল তাঁর মধ্যে। তাই তাঁর বিষয়বস্তু দেশকালের সীমানা অনায়াসে অতিক্রান্ত করতে পেরেছে। সাধারণ বিষয়বস্তু হিসেবে যা তিনি তাঁর চিত্রপটে তুলে ধরেছেন, তাতে অতি পরিচিত স্বদেশীয় মনোভঙ্গি ওঠে এলেও প্রকৃতপক্ষে যে উপজীব্য বা চিন্তা তাঁর উৎসমূলে কাজ করেছে, সেই উপলব্ধিতে কিন্তু কোন সীমিত পরিধির লক্ষণ নেই।

শিল্পাচার্য তাঁর সময়কালে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জলরঙের শিল্পীদের ঐতিহ্যের পথ ধরে নিজস্ব চিত্রাঙ্কনের একটি গুরুত্ববহ পটভূমি পেয়েছিলেন। জলরং মাধ্যমের চর্চাও ব্রিটিশ পদ্ধতিতেই তিনি শুরু করেছিলেন। ৪ বছর বিলেত বাস তাঁর সৃজনে সংযোজন করেছিল বিশ্বায়নের দৃষ্টিভঙ্গি। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের রচনা শৈলী ও গঠন কাঠামো গড়ে তুলতে শ্রম দিয়েছেন। অনেক সময় রং না দিয়েও তিনি শূন্যতাকে ছবির অতীব প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সুন্দরের শাশ্বত বৈশিষ্ট্যবলী তথা গতানুগতিক সৌন্দর্য রূপের অধ্যয়ন জয়নুলের কর্মকা-ের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। লোক ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। সে কারণেই তাঁর মন-মানসে সুদৃঢ় ভিত্তিতে আসন পেতেছে যে শাশ্বত রূপ-বৈশিষ্ট্য, তা সব সময় তাঁর কাছে ঘুরে ফিরে এসেছে। দ্বিমাত্রিক নক্সা-আঙ্গিক ও ফোক স্টাইল তাঁর কাজে স্বরূপে না হলেও প্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তাঁর জলরং প্রয়োগ বিন্যাসে হয়ে উঠেছিল স্বকীয় গুণবৈশিষ্ট্যের ধারক; যা একান্তই জয়নুল-শিল্পের ধ্বজাধারী।

‘কোন বস্তুর বাইরেরটা দেখে তৃপ্তি লাগত না, তার ভেতরে কী আছে, তার আবশ্যিক গুণটা কী, এই চিন্তা সর্বদা আমাকে অস্থির করত।’ আর এই অস্থিরতার টানে তিনি টানা ৪৩ বছর ধরে নিরলস চিত্রকর্ম সৃজনে ও সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। বস্তুর অপ্রয়োজনীয় অংশটা কী করে পরিহার করা যায়, সে সমস্যার সমাধান তিনি নিজেই করেছেন। জয়নুলের শিল্পকর্ম ও জীবন নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে এবং হবেও। গোড়ার দিকে ১৯৫৪ সালের আগস্টে মাসিক মাহেনও পত্রিকার ৬ষ্ঠ বর্ষ ও ৫ম সংখ্যায় খ্যাতিমান কবি ও সাংবাদিক সৈয়দ নুরুদ্দিন রচিত ‘শিল্পকলার পূর্ব বাংলার চরিত্র ও জয়নুল আবেদিন’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ছিল যথার্থ এবং সার্থক মূল্যায়ন। সাতচল্লিশ পরবর্তী পূর্ববঙ্গের শিল্পকলায় জয়নুলের অবদান ও শিল্পচিন্তার বিষয়টি বিশ্লেষিত হয়েছে দেশ ও জাতির অবদানগত প্রেক্ষাপট থেকে। সৈয়দ নুরুদ্দিনের মতে, পূর্ববঙ্গের সে সময়ের বন্ধ্যা আলো হাওয়াবিহীন অস্বস্তিকর মানসিক দারিদ্র্য থেকে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের প্রথম মুক্তি দিলেন শিল্পী জয়নুল। লিখেছেন, জয়নুল আবেদিন এলে আমরা যেন প্রথম আমাদের দেশের এবং দেশের মানুষের শিল্পরূপ দেখলাম। শিল্পরূপ কথাটি খুবই ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যেমন আমাদের সমাজের সম্পূর্ণ চিত্রটি, তার দুঃখ, তার দৈন্য, তার শক্তি, তার প্রেম, তার উদাসীন, তার জীবন সংগ্রাম এবং অন্যদিকে দেশের রৌদ্রের আর মেঘের আর খেত-খামারের বিশেষ রংটি পূর্ব বাংলার বিরাট নদীর আকস্মিক কিংবা টানা বিপুল বাঁক, নৌকার স্নেহময় দু’টো রেখা, ধরা পড়েছে। আবেদিনের ছবিতে যেন পূর্ব বাংলা প্রথম ধরা পড়েছিল। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা তাঁকে আপ্লুত করেছিল। বাঙালীর ভাষা, বাঙালীর সংস্কৃতির প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। বলেছেন, শিল্পাচার্য নিজেত্ত, ‘...তারপর ব্রিটিশ রাজত্ব শেষ হলো, পাকিস্তানে এলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায়। বাঙালীর ভাষা, বাঙালীর সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে আন্দোলন, সম্ভবত তারই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা এবং পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রভাবকে অস্বীকার করার একটা বিদ্রোহ হিসেবেই রচিত হলো আমার একটা চিত্র পর্যায় এবং সম্ভবত নিজেরই অঞ্চলের এসব শক্তি কাজ করেছে।...আমার চিত্র, প্রকৃতি ও মানবনির্ভর, বিষয়নির্ভর এবং আমার ছবির উৎপত্তি এবং রঙের যেদিনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী অঙ্কনধারা, লোকজ রীতিগুলো বেশি উৎসাহ যোগায়।’ শুধু নিজের শিল্পকার্ম নয়, আরও নানারকম জনপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে লোকশিল্পের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। লোকশিল্পের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন।

১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ‘বাঙলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’ ঢাকায় মিছিল বের করে। অগ্রভাগে বড় বড় অক্ষরে স্বাধীনতা শব্দটি লেখা চার অক্ষরের চারটি প্ল্যাকার্ড বহন করা হয়। স্বাধীনতার সপক্ষে তা ছিল প্রথম প্রকাশ ও প্রত্যয়দীপ্ত শিল্প-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কেন্দ্রিক রাজপথ-পরিক্রমা। এই সময় তিনি পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত হিলাল-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করেন। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পর সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘মনে হলো দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে যে অবহেলা আমি আড়াল থেকে ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করেছিÑ ধর্মের দোহাই দিয়ে একই দেশে বাঙালীদের প্রতি ঘৃণা ও অধীন রাখার যে মনোভাব তৈরি করা হয়েছে, তার হাত থেকে মুক্তি পেলাম।’ স্বাধীনতার পর প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে একটি রূপক পরিকল্পনা বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন। শিল্পাচার্যের প্রস্তাবনায়। দেশের গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে লোক ও কারুশিল্পীদের নিয়ে এসে পুনর্বাসিত করা ও তাদের কাজ সংগ্রহ করে একটি সমৃদ্ধ লোকশিল্প জাদুঘর গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় লোকশিল্পকে, লোক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচানোর লক্ষ্যে তা গড়ে তোলেন। তাঁর স্বপ্নের যাত্রা শুরুর পর তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯ মে পরলোক গমন করেন।

জয়নুল আবেদিন ছিলেন আপোসহীন শিল্পী। অব্যবস্থা, অনাচার শোষণের সঙ্গে আর শিল্প রচনার মধ্যে এবং শিল্প আঙ্গিক অনুসরণের মধ্যেও সর্বোতভাবেই তিনি স্বদেশীয়ানাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাঙালী জাতির সৃষ্টিশীল মানব হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য জন। জন্মশতবর্ষে বাঙালী জাতি খুঁজে পাবে তাঁর সেই সৃজন কর্ম, যেখানে স্বদেশ ভাবনার বিশালত্ব ধারণ করে আছে।

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: