মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা ’৫২ থেকে ’৭১

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আর দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক নানা স্মৃতিকে ধারণ করে রেখেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করতে চান তাঁদের কাছে এটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা পাঠাগার হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা নতুন প্রজন্মকে জানানোই এই সংগ্রহশালার মূল উদ্দেশ্য। দেশে এখন এটি মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্লভ সংগ্রহশালা হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে জন্ম রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের। মতিহারের সবুজ চত্বরে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবার নজর কাড়ে। এখানকার নয়নকারা অবকাঠামো পুলকিত করে দর্শনার্থীদের। এর মধ্যে শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা অন্যতম। ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যবাহী প্যারিস রোডের পূর্বপার্শ্বে এবং শহীদ মিনারের পাদদেশে ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগ্রহশালা হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করে। এর উদ্বোধন করেন তিন শহীদ-শিক্ষকপতœী বেগম ওয়াহিদা রহমান, বেগম মাস্তুরা খানম এবং শ্রীমতি চম্পা সমাদ্দার। প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নর স্থানীয় সংগ্রহশালা হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সংগৃহীত নিদর্শনসমূহের সময়সীমা নির্ধারিত হয় ’৫২-র ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত এবং তা প্রসারিত হয় দেশজুড়ে। কারণ ’৫২-র ভাষা আন্দোলনে একুশের রাতেই রাজশাহী কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থানে রাবি শিক্ষক ড. জোহার আত্মদান। এর পর থেকেই সংগ্রহশালার সম্প্রসারণ ঘটতে শুরু করে।

শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়ের নির্মিত শহীদ মিনারের মুক্তমঞ্চের গ্রীন রুমেই গড়ে উঠে শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সংগ্রহশালাটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। একই বছরের ৬ মার্চ তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজল সংগ্রহশালার প্রথম উদ্বোধন করেন। নির্ধারিত স্থান না থাকায় বছরের বিশেষ দিনগুলোতে এটা দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হতো। এরপর ১৯৮৯ সালের ২২ মার্চ রাবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আমানুল্লাহ আহমদ সংগ্রহশালার মূল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ৬৬০০ বর্গফুট জায়গায় তিনটি গ্যালারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সংগ্রহশালাটি। এখানে ’৫২, ৬৬, ৬৯ ও ৭১-সহ বাঙালীর আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন নিদর্শন পর্যায়ক্রমে প্রদর্শিত আছে।

প্রথম গ্যালারিতে ৫৯টি আলোকচিত্র, ৬টি প্রতিকৃতি, ২টি কোলাজ, ৮টি শিল্পকর্ম, পোশাক ও অন্যান্য বস্তু ৭টি, ভাস্কর্য ১টি, ডায়েরি ও অন্যান্য পা-ুলিপি ৪টি এবং বাঁধাইকৃত ২টি আলোকচিত্র রয়েছে। এখানে রয়েছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহীতে (রাজশাহী কলেজ হোস্টেল গেটে) নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের বাঁধাইকৃত আলোকচিত্র, আমতলার সভা, কালো পতাকা উত্তোলন ও মিছিল; ১৯৫২ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি, নগ্নপদ মিছিল; ’৫৩-র শহীদ মিনার; ’৬৯-র গণবিক্ষোভের মুখে পুলিশ বাহিনী; ’৬৯-র বিক্ষুব্ধ জনতা ও ব্যারিকেড; শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর, শহীদ রফিক, শহীদ বরকত, শহীদ সালাম ও শহীদ শামসুজ্জোহার প্রতিকৃতি; ২১ ফেব্রয়ারি মিছিলের অগ্রভাগে শামসুজ্জোহা; ’৬৯-এ রাবি শিক্ষকদের মিছিল, গুলিবিদ্ধ-হাসপাতালে মৃত-কফিনে শায়িত ড. জোহার ছবি।

এছাড়া আছে প্রখ্যাত শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের শিল্পকর্ম, সুজা হায়দারের বর্ণমালা, আবু তাহেরের অসহায় আত্মা, উত্তম দের কোলাজ ‘মুক্তিযোদ্ধার শার্ট’, প্রণব দাসের ভাস্কর্য ‘আর্তনাদ’।

দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে ১০৮টি আলোকচিত্র, ৩৫টি প্রতিকৃতি, ৯টি শিল্পকর্ম, ১৯টি বাঁধাইকৃত আলোকচিত্র, ৩টি ভাস্কর্য, পোশাক ও অন্যান্য বস্তু ৯৯টি এবং ৫টি ডায়েরি। এছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, জাতীয় ৪ নেতা এবং রাবির শহীদ শিক্ষকদের প্রতিকৃতি; বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ; স্বাধীনতার ঘোষণা-বাণীর প্রতিলিপি, মুজিবনগরে ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র, ঢাকার রাজপথ, ’৭১-র গণবিক্ষোভ, সংগ্রামী জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষ, ’৭১-র ছাত্রী নিগ্রহ, ধর্ষিতা মাতা-জায়া, গণহত্যা, ২৫ মার্চ ঢাকার রাজপথ, পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ দলিলের চুক্তিপত্র, মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত পোস্টার, শিল্পীদের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, শহীদদের পোশাক ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান চৌধুরী এবং সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ডায়েরি ও পা-লিপি; রাবি এবং রাজশাহীর শহীদদের আলোকচিত্র।

তৃতীয় গ্যালারিতে আছে ১১২টি আলোকচিত্র, ১টি প্রতিকৃতি, ১১টি শিল্পকর্ম, ১টি বাঁধাইকৃত আলোকচিত্র, ৬টি ভাস্কর্য, ৪০টি ডায়েরি-পা-ুলিপি, পোশাক ও অন্যান্য বস্তু ৫৬টি। এখানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ দলিলচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ, রণাঙ্গনে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, বিজয়ী মুক্তিসেনা, হানাদারমুক্ত ঢাকা শহর, গণকবর, বুদ্ধিজীবী হত্যা, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র (মাইন, বুলেট, রকেট লাঞ্চার ইত্যাদি); শহীদ বুদ্ধিজীবী ও শহীদ সাংবাদিকদের ছবিসহ বন্ধবন্ধুকে নিয়ে একটি আলাদা বোর্ড; রাবির গণকবর থেকে প্রাপ্ত নাম না জানা অসংখ্য শহীদদের মাথার খুলি-হাড় ও তাঁদের ব্যবহৃত জিনিস। এছাড়া শিল্পী কামরুল হাসানের মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত পোস্টার এবং শিল্পী আমিনুল ইসলামের শ্বেতপত্র-৭১, চলচ্চিত্রে স্বাধীনতা যুদ্ধ।

শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য মুক্তিযুদ্ধ-অনুপ্রাণিত তৈলচিত্র, ছাপচিত্র ও জলরঙ ছবির সংগ্রহ। বাংলাদেশের প্রধান চিত্রশিল্পীবৃন্দ যাঁদের কাজ এই সংগ্রহে স্থান পেয়েছে তাঁদের মধ্যে আছেন আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, মোস্তফা মনোয়ার, রফিকুননবী, হাশেম খান, রশীদ চৌধুরী ও দেবদাস চক্রবর্তী।

এই সংগ্রহশালার একটি প্রধান অংশ গবেষকদের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা পাঠাগার। প্রতি বছর এমফিল ও পিএইচডি গবেষকরা গবেষণাকাজে পাঠাগারটি ব্যবহার করেন। এখানে আছে ১৯৪৭ থেকে ’৭১-এর ওপর প্রায় তিন হাজার বই, পুস্তিকা, ইশতেহার ও সংকলন। বইয়ের পাশাপাশি এখানে আছে ১৯৪৭ থেকে ’৭১ সালের বাঁধাইকৃত বিভিন্ন পত্রিকা। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্টের কাটিংসহ নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করা রয়েছে এই সংগ্রহশালায়।

এসবের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন সম্পর্কে সংগ্রহশালাটি নতুন প্রজন্মকে প্রতিনিয়ত অবহিত করছে। দেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালাটি নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

জাকির হোসেন তমাল

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪

২১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: