রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিজয় দিবস সন্ধ্যা

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মুনতাসীর মামুন

(বিজয় দিবস সংখ্যার পর)

অন্যভাবেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারী খাতে চুরি হয়েছে ১৭৮৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ তথ্য দিয়েছিলেন তৎকালীন (১৯৯৬) সরকারের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক।

দুর্নীতির কারণে চার্জশীট বেশি করা হয়েছে বেগম জিয়ার আমলে ৯২.৭৭ শতাংশ। দ্বিতীয় মুজিব আমলে ৬৮.৫০ শতাংশ। তবে, মনে রাখার বিষয় মুজিব আমল ছিল ৩ বছরের আর খালেদার আমল ৫ বছরের। সেদিক থেকে মুজিব আমলের পরিমাণ বেগম জিয়ার পরিমাণে প্রায় সমান সমান। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, বেগম জিয়ার আমলে চার্জশীটের একটি বড় পরিমাণ করা হয়েছে এরশাদ ও সাঙ্গোপাঙ্গদের বিরুদ্ধে। নিজের দলের বিরুদ্ধে নয়। শেখ মুজিবের কিন্তু সেই রাজনৈতিক সুবিধা ছিল না। কারও বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করাটাই বড় কথা নয়। চার্জশীট আঁটোসাটো কিনা অর্থাৎ মামলায় টিকবে কিনা বা চার্জশীটের ফলে শাস্তি হবে কিনা সেটাও প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কারণ, চার্জশীটের কারণে যদি শাস্তিই না হয়, বা মামলাই না টেকে তাহলে চার্জশীট করে কী লাভ? এবার তা হলে সে হিসাব দেখা যাক।

মুজিব আমলে চার্জশীটের পর সবচেয়ে বেশি শাস্তি হয়েছে, ৪৭.৯৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১৬.৮২ শতাংশ। বেগম জিয়ার স্থান তার ওপরে ২২.৪৬ শতাংশ এ হার জেনারেল এরশাদের শাসনামলের চেয়েও কম।

চার্জশীটের ফলে যে মামলা হয়েছে তাতেও দেখা যায় মুজিব আমলে শাস্তির পরিমাণ (অর্থাৎ হার) সবচেয়ে বেশি ৩২.৮৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১০.৮২ শতাংশ, বেগম জিয়ার স্থান জেনারেল এরশাদেরও নিচে, তাঁর স্বামীর ওপরে ২০.৮৪ শতাংশ।

এ উপাত্ত একটি বিষয়ই তুলে ধরে তা হলো, কলোনি ধারায় যাঁরা শাসন করেছেন তাঁরা জনস্বার্থে আগ্রহী নন যতটা আগ্রহী গোষ্ঠীস্বার্থে। জেনারেল জিয়া ও এরশাদ ছিলেন সামরিক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি, বেগম জিয়া ছিলেন পরোক্ষ।

বেগম জিয়ার প্রথম আমলের চিত্রও একই রকম। বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক বা উপনিবেশবিরোধী ধারায় ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ আমলে চিত্রটি দেখা যাক-

এ সময় পররাষ্ট্র থেকে সামাজিক নানা বিষয়ে উদ্যমী ও সাহসী সব পরিকল্পনা শুধু নেয়া নয়, কার্যকরও করা হয়, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি ও ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, মিয়ানমারের সঙ্গে ভূমিচুক্তি, সামাজিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ও খাদ্য খাতের সম্প্রসারণ ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন।

১৯৯৬-২০০০ সালে বাংলাদেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৯০ লাখ থেকে ২৭০ লাখ টনে উন্নীত হয়। কৃষিঋণ বিতরণ পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে বার্ষিক ৬.৬%-এ উন্নীত হয়। মুদ্রাস্ফীতি পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের সার্বিক সঞ্চয় (মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৯%) ও বিনিয়োগ (মোট জাতীয় উৎপাদনের ২২%) বাড়ানো হয়। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগণের সংখ্যা ৫৩% থেকে ৪৪%-এ নেমে আসে।

মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮০ থেকে ৩৮৬ ডলারে উন্নীত হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে মানব দারিদ্র সূচক ৪১.৬ থেকে ২০০১ সালে তা নেমে আসে ৩২ শতাংশে। মানুষের গড় আয়ু ৫৮.৭ থেকে ৬২ বছরে উন্নীত হয়। বিএনপি আমলে সাক্ষরতার হার ছিল যেখানে ৪৪ শতাংশ শেখ হাসিনার সময় তা বৃদ্ধি পায় ৬৭ শতাংশে। কৃষিক্ষেত্রে প্রবল উন্নতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে রক্ষার কৃতিত্ব দেখায় এই সরকার। নারীদের ক্ষমতায়নে সচেষ্ট থাকে। ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করে, বৈষম্যমূলক শত্রুসম্পত্তি আইন বাতিল করে, এই প্রথমবারের মতো অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা ও মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো বয়স্ক ও বিধবা ভাতা ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আওয়ামী লীগের পর জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০১-২০০৪-এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতি ত্যাগ করা হয়, মৌলবাদ বিকশিত হয়, ইসলামী জঙ্গীদের হুমকি ও বোমাবাজি, হত্যা বৃদ্ধি পায়, আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের এত অবনতি আর কখনও হয়নি। খাদ্যশস্যের দাম প্রচ-ভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্যান্য বিষয়ের কথা বাদ দিলাম। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ক্ষমতায় আসার পর জোট সরকার প্রথম যে কাজটি করে তা হলো, প্রধানমন্ত্রী তনয় ও ভ্রাতা এবং অর্থমন্ত্রীর পুত্রের কয়েকশ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ মকুফ।

আজ বাঙালীদের সরকার আসার পর এই রাষ্ট্রকে সবাই সমীহ করছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার করায় এই কথাই প্রমাণিত হলো যে এ রাষ্ট্র এখন দায়হীনতায় বিশ্বাস করে না। যে রাষ্ট্র পরিচিত ছিল শূন্য ঝুড়ি হিসেবে সে রাষ্ট্র আজ চাল রফতানি করছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ যদিও একই ভূখ-ে জনগণ দিগুণ হয়েছে। জঙ্গী মৌলবাদ দমনে নিরন্তর হওয়ায় এখন আর মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত নয়। গার্মেন্টেস রফতানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম। দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও প্রথম দিকেÑ এখন এ রকম অনেক রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। এগুলো কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ। মানুষের আয়ু ৩৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২০০ ডলারে। রিজার্ভ বেড়েছে বহুগুণ।

এতে একটি কথাই প্রমাণিত হয়। বাঙালীর সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা। যদি এ রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখতে পাওে, মানবতাবিরোধী অপরাধীও তাদের সমর্থকের যদি রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ করে ক্ষমতা দখল করতে না দেয় এবং ক্ষমতাসীনদের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম বা বর্তমান প্রজন্ম সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতে পারবে। আমাদের জেনারেশনও এখন পরিবর্তনের আবাস অনুধাবন করতে পারছে। এখন আর বিদেশে সবুজ পাসপোর্ট দেখলে ভ্রƒ কোঁচকায় না বা অজ্ঞ ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞেস করে না বাংলাদেশ কোথায়।

স্বাধীনতা অর্জনের দিনটি বিজয় দিবস হিসেবে কোন রাষ্ট্রই ঘোষণা করেনি। বাঙালী করেছে। প্রতি বিজয় দিবসে তরুণদের এই কথাই ভাবতে হবে আমরা বিজয়ী থাকব। এবং এই বিজয়ী থাকতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। এবং সেই ব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখার দায়িত্ব তরুণদেরই।

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪

১৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: