কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এখনও ববিতা

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪
এখনও ববিতা

সংসার ছবির জন্য কিশোরী মেয়ের প্রয়োজন। রাজ্জাক ও সুচন্দার মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করবে। পরিচালক জহির রায়হান এই চরিত্রে কাকে নেয়া যায় ভাবছিলেন। শালিকা ববিতার মুখটি ভেসে উঠল। একটু মুচকি হাসলেন তিনি। জানেন তাকে রাজি করান কঠিন হবে। কিন্তু একপ্রকার জোর করেই অভিনয়ে রাজি করান ববিতাকে। অবশ্য একটু দুষ্টুমি করতেও বাদ রাখেননি। অভিনয়ের প্রস্তাব দেয়ার সময় জহির রায়হান তাকে দুষ্টুমি করে বলেছিলেন, ‘তুমি ছোট্ট নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করলেও এখানে তোমার একটা ‘পেয়ার’-এর মানুষ থাকছে।’ এ ছবিতে ববিতার বিপরীতে ছিলেন মাহমুদ সাজ্জাদ। উল্লেখ্য, ‘সংসার’ ছবিতে পর্দায় ববিতার নাম ছিল ‘সুবর্ণা’। এ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে মার খায়। পরে অবশ্য নামটি আর ব্যবহার হয়নি। ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির মাধ্যমে ববিতা নামটির যাত্রা শুরু।

ছবিতে অভিনয়ে তাকে কেন রাজি করান কঠিন ছিল, তার ব্যাখ্যা ববিতা নিজেই দিলেন। তিনি বলেন, ‘চাওয়া পাওয়া’ চলচ্চিত্রটির দৃশ্য ধারণের কাজ চলছে কক্সবাজারে। ছবির নায়িকা আমার বড় বোন সুচন্দা। আমি আপার শূটিং দেখতে গিয়েছিলাম। একটা দৃশ্যে পাহাড় থেকে অনেকদূর দৌড়াতে হয় আপাকে। এই দৃশ্যটি কিছুতেই পরিচালকের পছন্দ হচ্ছিল না। ওদিকে গরম বালির ওপর বার বার দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ে ফোস্কা পড়ে গেল আপার। এ অবস্থা দেখে আমার কি পরিমাণ বিরক্ত লেগেছিল ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর যাই হউক সিনেমায় পা রাখব না। আমার বিরক্তির কারণ তিনি জানতেন জহির রায়হান। তাই অনেক কৌশল খাটিয়েছিলেন আমাকে ছবিতে অভিনয় করানোর জন্য। আজকে এই আমি তার জন্যই।

প্রথম ছবির পারিশ্রমিক ১২ হাজার টাকা দিয়ে ববিতা একটা টয়োটা গাড়ি কিনলেন। তখন তাঁর অসুস্থ মা ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। গাড়িটা কিনে পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে তিনি মাকে সারপ্রাইজ দিতে ক্লিনিকে গেলেন। মা সুস্থ হলে জীবনের প্রথম আয়ের টাকায় কেনা গাড়িতে চড়বেন এমনটাই প্রত্যাশা ছিল ববিতার। এই সুখ তাঁর কপালে ছিল না। ক্লিনিকে ঢুকে মাকে আর পেলেন না। তাঁর লাশ সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান তিনি ।

তাঁর পুরো নাম ফরিদা আখতার, ডাক নাম পপি। ছবিতে এসে নাম হয় ববিতা। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাটে। পৈতৃক বাড়ি যশোরে। ববিতার পরিবার একসময় বাগেরহাট থেকে চলে আসেন ঢাকার গে-ারিয়াতে। তাঁর মা কবিতা ও ছোটগল্প লিখতেন। বাবাও ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ। তারা চেয়েছিলেন সন্তানরা একটি সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠুক। তাদের চাওয়া পূরণ হয়েছে বৈকি। সুচন্দা, ববিতা আর চম্পা তিনজনই দেশের গ-ি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুণী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

অভিনয় জীবনে রাজ্জাক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল, আলমগীর, নাদিম (পাকিস্তান), ইমরান (পাকিস্তান) সহ বড় বড় তারকাদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ববিতা। কিন্তু হৃদ্যতার গল্প পাওয়া যায় রোমান্টিক নায়ক খ্যাত জাফর ইকবালকে ঘিরে। জাফর ইকবালের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে ববিতা বলেন, ইকবাল, মানে জাফর ইকবাল আমাকে পছন্দ করত। আমি শুনেছি, ওর বাসায় আমার বড় বড় ছবি টানানো থাকত। আমাকে নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছে সে। আমারও তাকে ভাল লাগতো তবে এটাকে ঠিক প্রেম বলা যাবে না।

ববিতার ‘ক্রেজি ফ্যান’-এর কমতি ছিল না। তিনি নিজেই স্মৃতি আওড়ালেন, আমার এখনকার টিএনটি নম্বর নিকটাত্মীয় ছাড়া আর কাউকে দিতে পারি না। এক ভদ্রলোক কয়েক বছর ধরে টেলিফোনে জ্বালাতন করছেন। তাঁর কারণে অনেকবার টেলিফোন নম্বর বদল করতে হয়েছে। কীভাবে যেন সে নম্বর পেয়ে যায়! ফোন করে তাঁর কথা একটাই ‘ববিতার সঙ্গে কথা বলব। সাভারে আমার যত সম্পত্তি আছে সব বিক্রি করে দেব। সেই টাকা দিয়ে আমি ববিতাকে টেলিফোন করব।’ তাঁর কাছ থেকে একটি ঘটনা জানা গেল-ববিতার জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। ববিতার হেয়ার স্টাইল, ববিতার ব্লাউজ কাট যখন মেয়েদের প্রথম পছন্দ সেই সময়ে এক ভক্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন শুরু করল। তার বক্তব্য হলো ববিতাকে এসে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। না হয় তিনি এখান থেকে সরবেন না! মহামুশকিলে পড়লেন ববিতা। অবশেষে পুলিশের সহায়তায় প্রেসক্লাবের সামনে গেলেন তিনি। সেখানে গিয়ে দেখলেন মশারি টানিয়ে ছেলেটি বসে আছে। মশারির ভেতর ববিতার নানা রকম ছবি, ভিউকার্ড, পেপার কাটিং ইত্যাদি। এ নিয়ে তখন পত্রিকায়ও কম লেখালেখি হয়নি।

দুশো’রও বেশি ছবিতে ববিতা অভিনয় করেছেন। এসব ছবিতে অভিনয়ে তিনি প্রতিবারই নিজেকে ছাড়িয়ে যেতেন। এজন্য ববিতা অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭৫ থেকে একটানা তিনবার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারের হ্যাটট্রিক রেকর্ডটি ববিতার দখলে। ‘প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ১৯৭৫-এ ‘বাঁদি থেকে বেগম’ ছবিতে। ১৯৭৫-এর পরের বছর দ্বিতীয়বারের মতো পান ‘নয়নমণি’ ছবিতে। ১৯৭৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ববিতা হ্যাটট্রিক করলেন ‘বসুন্ধরা’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে। তিনি চতুর্থবারের মতো পুরস্কার জেতেন ‘রামের সুমতি’ ছবিতে, ১৯৮৫ সালে। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড-চ্যানেল আই বেস্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১১-এর আজীবন সম্মাননা পান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা ববিতা। সত্যজিৎ রায়ের অশনি সঙ্কেত ছবিতে অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় শ্রেষ্ঠ নায়িকার পুরস্কার পান। ববিতা অনবদ্য অভিনয় প্রতিভার স্বীকৃতি হিসাবে ভারতের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট পার্লামেন্ট কর্তৃক ‘ডক্টরেট’ উপাধি লাভ করেলন। এ ছাড়াও তিনি চারবার বাচসাস, রিয়ালিটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বার বার যোগদানসহ ববিতা কায়রো, রোম, বার্লিন, যুক্তরাষ্ট্র, চেকোসেøাভাকিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব করেন। ববিতা সোভিয়েত ইউনিয়নে ও ব্রাজিলে বিশেষভাবে সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। তিনি সরকারী ও বেসরকারী অসংখ্য পুরস্কার তিনি লাভ করেছেন। এজন্য তাঁকে ‘পুরস্কার কন্যা’ বলা হত। ববিতা বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সবচেয়ে বেশিবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

পাভেল ভ্লাসভ

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৪

১১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: