আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হিউজেসের জন্য ক্রিকেটের কান্না

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪
  • মোঃ নুরুজ্জামান

‘জন্মিলে মরিতে হয়’Ñ মানব জীবনের অমোঘ সত্য। তবু এমন কিছু মৃত্যু থাকে যা মেনে নেয়া কঠিন। ফিলিপ হিউজেস তেমনি একজন। বড় কোনও তারকা হয়ত হয়ে ওঠেননি, ঈশ্বর তাঁকে সেই সুযোগটাই তো দিলেন না, এমন মৃত্যু দিলেন যাতে কেঁদে উঠল গোটা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। ঘটনা ২৫ নবেম্বর স্থানীয় শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে। ১৪০ কিলোমিটার গতিতে ধেয়ে আসা পেসার সিন এ্যাবটের বাউন্সারটা হুক করতে গিয়ে চোখ সরিয়ে নেন বাঁ-হাতি হিউজেস। মাথা ঘুরে যায় পেছন দিকে। লাফিলে ওঠা বল এসে লাগে ঠিক হেলমেটের নিচে, কানের পেছন দিকে। কয়েক সেকেন্ড হাঁটুতে দু’হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকার পর মুখ থুবড়ে পড়ে যান সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের পিচে। মিনিট পনেরোর মধ্যে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। দুদিন লাইফ সাপোর্টে (কোমায়) থাকার পর অগণিত ক্রিকেটপ্রেমীর প্রার্থনা উপেক্ষা করে শুক্রবার হিউজেসকে পরোলোকে তুলে নেন বিধাতা।

জন্ম বেড়ে ওঠা নিউ সাউথ ওয়েলসে। ঘরোয়া ক্রিকেট দিয়ে সখ্যতা ঐতিহ্যবাহী সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজিতে)। ২০০৯ সালে টেস্ট আগমন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে, গত বছর মেলবোর্নে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ওয়ানডে অভিষেক। অথচ বিধাতার কি উপহার, প্রিয় সিডনিতেই শেষ ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিলেন, আবার জীবনের ইনিংসে আউট হলেও ব্যাট হাতে অপরাজিত ৬৩ রানে! হিউজেসের সম্মানে এসসিজিতে তৈরি হবে স্মৃতিস্তম্ভ। নিউ সাউথ ওয়েলস প্রধানমন্ত্রী মাইক বার্ড এ ঘোষণা দেন, তাতে সমর্থন দেয় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সিএ-র নির্বাহী প্রধান জেমস সাদারল্যান্ড বলেন, ‘এখানে ক্রিকেটের হাতেখড়ি, এখানেই বেড়ে ওঠা, হিউজেসের সম্মানে সিডনিতে স্মিৃতিস্মারক নির্মাণের সিদ্ধান্তে সমর্থন আমাদের। অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অগণিত ক্রিকেটপ্রেমী ওকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। হিউজেস চিরদিন বেঁচে থাকবে এসসিজিতে, আমাদের হৃদয়ে।’

মাত্র ২৫ বচর বয়সে প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিউজেসের প্রয়াণে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে থমকে গেছে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব। ক্রিকেট মক্কা লর্ডসে গেটের বাইরে ফুলের তোড়া, শারজায় পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড টেস্টের স্কোর বোর্ডে ‘বিদায় হিউজেস’ টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা পরিত্যক্ত, আর শেফিল্ড শিল্ডের সেই ম্যাচ তো পরিত্যক্ত হয় মঙ্গলবারই, যেদিন আঘাত পান তিনি। ভারত খেলেনি প্র্যাকটিস ম্যাচ। বাংলাদেশ-জিম্বাবুইয়ে চতুর্থ ওয়ানডের আগে পালন করা হয় নীরবতা। কেবল তাই নয়, হিউজেসের মৃত্যুতে স্থগিত করা হয় ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্ট। যেটি ৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সফরকারী তবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ নিয়ে কোনও রকম হস্তক্ষেপ করবে না তারা। সিএ-র সিদ্ধান্তই মেনে নেবে ক্রিকেট মোড়ল ভারত। শেষ পর্যন্ত পুরো সূচীতেই পরিবর্তন আনে সিএ। নতুন সূচী অনুযায়ী দ্বিতীয় টেস্টের ভেন্যু এ্যাডিলেড ওভালে ৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে প্রথম টেস্ট। আর ১৭ তারিখ ব্রিসবেনে দ্বিতীয়, ২৬ তারিখ মেলবোর্নে তৃতীয় এবং সিডনিতে চতুর্থ ও শেষ টেস্ট শুরু ৬ জানুয়ারি। ১ ডিসেম্বর সোমবার ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) পরিবর্তিত এই সূচী প্রকাশ করে। সব মিলিয়ে শোকে কাতর ক্রিকেটবিশ্ব। যে শন এ্যাবটের বলে জীবনাবসান হলো, সেই তিনিও হয়ে পড়েন মুহ্যমান। হাসপাতালে, শেষকৃত্যে সব জায়গায় কেমন বিষণœ। যেন পৃথিবীটা মিথ্যা। ছুটে গেছেন ব্র্যাড হ্যাডিন, স্টিভেন স্মিথ, শেন ওয়াটসন, ডেভিড ওয়ার্নার-মাইকেল ক্লার্ককরা তো সারাক্ষণই হাসপাতালে ছিলেন। কদিনে হিউজেসের পরিবারের সদস্য হয়ে সময় পার করছেন দু’জন। ছিলেন সাবেক তারকা ব্রেট লি, জাস্টিন ল্যাঙ্গাররা। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিইও সাদারল্যান্ড, যার সুদৃষ্টিতে মাত্র ২০ বছর বয়সেই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল প্রতিভান ওপেনার হিউজেসের। দেশের জার্সিতে খেলেছেন ২৬ টেস্ট (৩৩ গড়ে ১৫৩৫ রান, সেঞ্চুরি ৩ ও হাফ সেঞ্চুরি ৭টি), ২৫ ওয়ানডে (৩৬ গড়ে ৮২৬ রান, সেঞ্চুরি ২ ও হাফ সেঞ্চুরি ৪টি) ও ১ টি২০। হিউজেসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্থগিত করা স্থগিত হয়ে যায় প্রথম টেস্ট। বুধবার শেষকৃত্য, ক্লার্করা বৃহস্পতিবারই মাঠে নামেন কী করে? নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তরাঞ্চলে ফিলিপ হিউজেসের জন্মশহর ম্যাকসভিলে সিএ’র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে চিরবিদায় জানানো হবে আজ। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আরও জানিয়েছে, দুপুর আড়াইটায় ম্যাকভিলের হাই স্কুল স্পোর্টস হলে হিউজেসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠান দেশটির রেডিও-টেলিভিশনে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। স্থগিত প্রথম টেস্ট কবে শুরু হবে, সেটি শিগগিরই জানিয়ে দেবে সিএ। ৩০ নবেম্বর রবিবার ছিল প্রয়াত ফিলিপ হিউজেসের ২৬তম জন্মদিন। বৃহস্পতিবার থেকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ভারত-অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্ট। মাইকেল ক্লার্কের অনুপস্থিতিতে দলে ফেরাটা প্রায় নিশ্চিতই ছিল। ভাবুন তো বেঁচে থাকলে কী আনন্দ পেতেন। একটি বল সব তছনছ করে দিল সব। সবাইকে কাঁদিয়ে আনন্দ-বেদনার উর্ধে চলে গেলন তরুণ হিউজেস। অস্ট্রেলিয়া তো বটেই রবিবার জন্মদিনে তাই আরেক দফা কাঁদে ক্রিকেটবিশ্ব। ১৯৮৮ সালের ৩০ নবেম্বর কলাচাষি বাবার ঘর আলো করে পৃথিবীতে এসেছিলেন ফিলিপ হিউজেস। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে ক্রিকেটার হবেন। বাবা-মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করে হয়েছেন আন্তর্জাতিক তারকা। প্রতিবছর ঘটা করে তার জন্মদিন পালন করে আসছে পরিবার। আগের জন্মদিনের চেয়ে এবারের জন্মদিনটা একটু বেশি উচ্ছ্বাস নিয়ে করতে চেয়েছিল হিউজের পরিবার। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট দিয়ে ফের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা। মায়ের হাতে কেক কেটে ২৬তম জন্মদিন পালন করবেন। সেই বাবা-মা আজ সন্তানকে চিরবিদায় জানাবেন! ২৬টি মোমবাতির আলো নয়, জন্মশহর ম্যাকসভিলে জ্বলবে হিউজেসের শেষকৃত্যের মশাল! বিধাতার কি বিচার। যেখানেই থাক, ভাল থাক হিউজেস।

প্রয়াত সতীর্থের জন্মদিনে অধিনায়ক ক্লার্ক বলেন ‘হ্যাপি বার্থডে ব্রো। সারা জীবন তোমাকে ভালবাসব। তোমাকে ভাই হিসেবে ডাকতে পেরে আমি গর্বিত। এও জানি, তোমাকে চিরকাল মিস করব। যেখানেই থাক, তোমার জন্য শুভ জন্মদিন।’ এখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি ক্লার্ক। তিনি আরও বলেন, ‘১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনে এমন সাচ্চা ও বড় মনের ছেলে আমি কমই দেখেছি। অনেক সময় হয়েছে ও রান পাচ্ছে না, দল থেকে বাদ পড়েছে। তবু কোন অভিযোগ করেনি। নির্বাচকদের সামনে সবময় মাথা নিচু করে থেকেছে। এটাই ছিল ওর নিজস্বতা।’

প্রকাশিত : ৩ ডিসেম্বর ২০১৪

০৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: