মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কোন ষড়যন্ত্রেই শেষ রক্ষা হলো নাÑ জামায়াতে সুনামি

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

ফাঁসির কাষ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের নরঘাতকরা

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ শেষ রক্ষা হলো না। বহু চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, বিদেশী চাপ, লবিস্টদের অব্যাহত অপপ্রচারের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলে একে একে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতী নরঘাতকদের বিরুদ্ধে বিচারের রায় ও দ- কার্যকর হতে চলেছে। প্রায় ৪৪ বছর আগের পাপ, মহাপাপ করেছিল জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানী বাহিনীর এ দেশীয় দোসররা। মুক্তিকামী বাঙালী জাতির ওপর পাক জল্লাদ বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ওরা হামলে পড়েছিল। হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন আর অপহরণে মেতে উঠেছিল। ফলে সোনার বাংলা হয়েছিল শ্মশান। ১ কোটি বাঙালী নর-নারী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে টানা ৯ মাস চলা যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালী হয়েছে শহীদ। ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠন হয়েছিল।

মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালতে চলমান বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে নতুন করে আলোচনায় আসছে জামায়াত। একাত্তরের সে বর্বরতা, সে ধর্ষণ, সে হত্যা-গণহত্যা, সে লুণ্ঠন, সে অগ্নিসংযোগ, সে অপহরণ, সে বুদ্ধিজীবী হত্যা অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে জামায়াত। রাজাকার আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে শহরে-বন্দরে-গ্রামে নরঘাতকের ভূমিকা পালন করেছে জামায়াত। তারপরও বাঙালীর প্রিয় স্বাধীনতা এরা রুখে দিতে পারেনি। বিদেশী মানচিত্রের গর্ভ থেকে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতাকামী বাঙালী জাতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার দীর্ঘ চার যুগ সময় অতিবাহিত হলেও এ খুনী চক্রের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোন বিচার হয়নি। এখন শুরু হয়েছে। চিহ্নিত নরঘাতকদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় আসছে একে একে। কার্যকরের সূচনাও হয়েছে। সচেতন মহলে আলোচিত হচ্ছে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়েছে জামায়াতীদের ঘরে। সাইক্লোন নয়, বিপর্যয় নয়, এ যেন জামায়াতে সুনামি। ধর্মীয় আবরণে ঢেকে রাখা লেবাসের স্বরূপ শেষপর্যন্ত বিচারিক আদালতে একে একে উন্মোচিত হচ্ছে। একাত্তরের মহাপাপের মাসুল গুনতে শুরু করেছে জামায়াত। একাত্তরে জামায়াতের নরঘাতকদের পৈশাচিক হত্যাকা- ‘জেনোসাইড এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঙালী জাতি স্বাধীনতা লাভের পর এই জামায়াত ঘাপটি মেরে ছিল। দেশীয় একদল নব্য রাজাকারের আস্কারায় এরা পর্যায়ক্রমে নিজেদের ভিত নতুন করে রচনা করতে সক্ষম হয় এদেশে। সেনা শাসক জেনারেল জিয়া জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। শুরু হয় তাদের অপরাজনীতি। ফাঁকফোকর খুঁজে যখনই সুযোগ মিলেছে হাতছাড়া করেনি ধুরন্ধর জামায়াত। রাজনীতির পাশাপাশি এরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ভিতও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং প্রতিষ্ঠা, এনজিও থেকে শুরু করে একপর্যায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও ভাগ বসাতে সক্ষম হয়। নিজস্ব অর্থায়নে এরা এদের সমস্ত প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষমতাও অর্জন করে নেয়। সৃষ্টি করে নিজস্ব আর্মড ক্যাডার বাহিনী। গেল বছর এ বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে রাজনীতির নামে হরতাল, অবরোধ ডেকে হত্যাকা-সহ যে বর্বর আচরণের বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছে তা একাত্তরে তাদের কর্মকা- নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বিশাল শক্তি। মতাদর্শ এক হলেও গ্রুপিংয়ে বহুধা বিভক্তির সুযোগ নিয়ে এ দল জামায়াত আজ এদল, কাল ওদলের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের শক্তি দিনে দিনে আরও সংহত করতে সক্ষম হয়েছে। অস্ত্র তৈরি, অস্ত্র পরিচালনায় এরা হয়েছে পারদর্শী। স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে জামায়াত এদেশের পবিত্র পতাকাও হাতে পেয়ে যায়। পুরো জাতি তখন গুমরে কেঁদেছিল। কিন্তু তা ছিল বোবা কান্না। নব্য মীরজাফররা জামায়াতীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল নিজেদের হীন স্বার্থে ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নেয়ার লোভে। কিন্তু জামায়াত তো কাল সাপ। যে সাপের লেজেও বিষ থাকে। এদের ভেতরে, বাইরে স্বরূপ এক নয়। দেশের অশিক্ষিত, উঠতি বয়সের তরুণ, ধর্মান্ধ ও সাধারণ মানুষের একটি অংশকে বেকুব বানিয়ে ধোঁকা দিয়ে কাছে টানতে সমর্থ হয়েছিল। তাই তো যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হয়, তখন তাকে (সাঈদীকে) চাঁদে দেখা গেছেÑ এ ধরনের বানোয়াট, মিথ্যা প্রচার চালিয়ে ধর্মভীরু জনগোষ্ঠীকে ধোঁকা দিয়েছে। তাদের এ বক্তব্য পবিত্র ধর্মেও অগ্রহণযোগ্য। তারপরও তারা করেছে অপস্বার্থ হাসিলে।

রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে জামায়াতের কর্মকা- নিয়ে আলোচনায় বলা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারার সুবাদে এরা ভার্সিটি, কলেজ, হোস্টেল, মাদ্রাসা ও এলাকাভিত্তিক দখলদারিত্ব বজায় রাখতেও সক্ষম হয়। গড়ে তোলে কোচিং সেন্টারের নামে জামায়াতী আদর্শ প্রচারের সেন্টার। পাড়ায় পাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেছে মেস। লজিং মাস্টার থেকে শুরু করে দুরভিসন্ধিমূলক হেন কাজ নেই যাতে তারা হাত দেয়নি। একপর্যায়ে এদের পুরো রাষ্ট্র ক্ষমতাও এককভাবে দখল করার স্বপ্ন জেগেছিল। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নেই রয়ে গেছে। জামায়াতের ঘরে-বাইরে এখন চলছে মহাবিপর্যয়। রীতিমতো সুনামিকেও হার মানাচ্ছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ খুব অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে। এরপর ২১ বছর ছিল ক্ষমতার বাইরে। ’৯৬ সালে ক্ষমতা ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। পাঁচ বছর পর আবারও ছিটকে পড়ল ক্ষমতা থেকে। এরপর ২০০৯ সালে আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতা ফিরে পেল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তি আওয়ামী লীগ। এবার সবকিছু গুছিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে হাত দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। অত সোজা ছিল না এ কাজ। ঘরে-বাইরে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শত্রু। ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে সুচতুর জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছিল। এরপর বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ঢুকেছে চারদলীয় জোটে। পরে সে জোট হয়েছে ২০ দলীয়।

একদিকে ধর্মীয় সেøাগান, অন্যদিকে বেশভূষায় ধর্মীয় আবরণ। জামায়াতের বিরুদ্ধে কিছু হলেই ধর্ম গেল, ধর্ম গেল রব তুলে দেয়া হয়। এছাড়া বিশ্বজুড়ে ইসলামী কিছু দেশের অযাচিত হস্তক্ষেপ তো রয়েছেই। এর ওপর লবিস্ট নামের কিছু আন্তর্জাতিক টাউট বাটপাড়দের কাড়ি কাড়ি অর্থ দিয়ে জামায়াত এদের বানিয়েছে রীতিমতো বেতনভোগী কর্মচারী। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জামায়াতের পক্ষে এরা অবিরাম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকে জানাতে চাচ্ছে একাত্তরে এরা কোন অপরাধে জড়িত ছিল না। এ যেন বাঙালী জাতির সঙ্গে নির্মম পরিহাস।

ষড়যন্ত্রের সব জাল উপড়ে ফেলে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিগত শাসনামলে শুরু করে দেয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ। অত্যন্ত কৌশলী হয়ে এগোতে হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারকে। প্রথম দফায় জামায়াত-বিএনপির শীর্ষ কয়েক নেতাকে গ্রেফতার করে। শুরু করে দেয় বিচার। গঠন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইনেও সংশোধনী আনা হয়। এরপরও বিচার কাজ আদালত আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হয়নি বলে অপপ্রচার চলে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলে শুরু হয়ে যায় বিচারকাজ। এখন একে একে রায় হচ্ছে। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে ৯ জামায়াতী ও ২ বিএনপি নেতার ফাঁসির রায় হয়েছে।

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

০৬/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: