কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তবুও ট্রাজেডি

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

আহ! যদি পাখি হতে পারতাম! আকাশে পাখির ডানা মেলে ওড়াওড়ি দেখে এমনটা মনে হতেই পারে যে কারও। হবেই বা না কেন? কে না চায় উন্মুক্ত আকাশে ভেসে মেঘের সঙ্গে পাড়ি দিতে অনন্ত আকাশ । এমন শখ পূরণের জন্যই ফরাসী পদার্থবিজ্ঞানী জ্যাঁ ফ্রাঙ্কোইস পিলাত্রি রজার হট এয়ার বেলুনের সঙ্গে একটি হাইড্রোজেন বেলুন জুড়ে দিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন বেশি সময় ধরে আকাশে ভেসে বেড়াতে পাখির মতো। দুর্ভাগ্য রজার ও তাঁর সঙ্গীর। হাইড্রোজন বেলুনে আগুন ধরে মৃত্যুবরণ করতে হয় উভয়কেই। সেটাই ছিল খুব সম্ভবত আকাশযাত্রায় মৃত্যুর মিছিলের প্রথম ঘটনা। বিমান আবিষ্কারের পর থেকে আকাশযাত্রা হয়ে উঠে সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন মাধ্যম। বিমানে চড়ে মানুষ বিশ্বের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়ানো শুরু করে। সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হলেও যুগে যুগে অনেক ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর বিমানযাত্রাকে নিরাপদ রাখতে নানান পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও কিছু ট্রাজেডি ঘটে যায়।

টেনেরিফ বিমানবন্দর দুর্ঘটনা

কেএলএম এবং প্যান এএম দুটিই ছিল বোয়িং ৭৪৭ বিমান। এ দুটি বিমানের সংর্ঘষ ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২৭ মার্চে। প্রাণ হারিয়েছিল ৫৮৩ জন। ইতিহাসে বিমান দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর সংখ্যার দিক দিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় ঘাতক দুর্ঘটনা। বিশ্ববাসী শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। স্পেনের টেনেরিফ দ্বীপের বিমানবন্দরের আকাশসীমায় ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার আগে নিকটবর্তী গ্রান ক্যানারিয়া বিমানবন্দরে বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি গ্রুপ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল এবং অন্য একটি বোমা বিমানবন্দরে পুঁতে রাখা হয়েছিল এ গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে বিমানগুলো গতিপথ পাল্টে এ বিমানবন্দরে অবতরণ করা শুরু করে। তৈরি হয়ে গিয়েছিল অনেকটা গাদাগাদি অবস্থা। এমনকি ট্যাক্সিওয়েতেও বিমান রাখা হয়েছিল। প্যান এএম বিমানটি রানওয়েতে উড্ডয়নের জন্য অপেক্ষা করছিল, অন্যদিকে কেএলএম বিমানটি চেষ্টা করছিল অবতরণের। কুয়াশা এতই ঘন ছিল যে, একটি বিমান থেকে আরেকটিকে দেখা যাচ্ছিল না। টাওয়ার কন্ট্রোলার কেএলএমকে নিচে অবতরণ করার ক্লিয়ারেন্স না দিলেও কেএলএমের পাইলট অবতরণ করছিল। সে যে ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করছিল, তা কিন্তু নয়। ভাষাগত অস্পষ্টতায় বিমানের ক্রুরা টাওয়ার কন্ট্রোলারের কথা উল্টো বুঝছে এই ভেবে সে অবতরণ করা শুরু করে দিয়েছিল। ফলে ধাক্কা লাগে প্যান এএমের সঙ্গে। সংঘটিত হয় বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনার জন্য কয়েকটি বিষয় দায়ী ছিল। বিমানবন্দরটিতে কোন গ্রাউন্ড রাডার ছিল না। শুধু রেডিওয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ট্রান্সমিশন সমস্যার কারণে কন্ট্রোলারের কথা স্পষ্ট বুঝতে না পারা ছিল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। কেএলএমের ২৪৮ যাত্রীর সবাই এবং প্যান এএমের ৩৯৬ যাত্রীর মধ্যে ৩৩৫ যাত্রীই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এ দুর্ঘটনা পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর কন্ট্রোলার ও পাইলট এবং ক্রুদের মধ্য তথ্য আদান-প্রদানে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয় সেজন্য স্টার্ন্ডারাইজড শব্দমালা নির্ধারণ করা হয়। কোন ভুল পদক্ষেপের জন্য আগে ক্রুরা পাইলটকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত না, কিন্তু এ ঘটনার পর ক্রুদের মতামতকে পাইলটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, সে নিয়ম তৈরি করা হয়। তাছাড়া ক্রু রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ এখন সকল পাইলটের জন্য বাধ্যতামূলক।

জাপান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১২৩

আগস্ট মাসটি জাপানিদের জন্য দুঃখের। আগস্টের ৬, ৯, ১২ এই সমান্তরাল ধারায় তিনের ব্যবধানে ঘটেছে ভয়াবহ তিন দুর্ঘটনা। প্রথম দুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি। আর তৃতীয়টি হচ্ছে বিমান ট্র্যাজেডি। ১৯৮৫ সালের ১২ আগস্ট টোকিও বিমানবন্দর থেকে ওসাকা বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল বোয়িং ৭৪৭ এর একটি বিমান। কিন্তু ওড়ার ১২ মিনিটের মাথায় যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। পাইলট চেষ্টা করছিল বিমানটিকে নিচে নামিয়ে আনার। কিন্তু কোনমতেই বিমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। ৩২ মিনিট পর বিমানটি যখন টোকিও থেকে একশ’ কিলোমিটার দূরের থাকামাগাহারা পর্বতের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পর্বতের সঙ্গে এটির পাখার ধাক্কা লাগে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিধস্ত হয়ে যায় বিমানটি। ১৫ জন ক্রুসহ ৫০৯ যাত্রীর ৫০৫ জনই মৃত্যুবরণ করে ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। একক কোন বিমান দুর্ঘটনায় এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রাণহরণকারী। বিমানটির পেছনের অংশে যান্ত্রিক গোলযোগ সাত বছর আগেই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ঠিকমতো তা মেরামত করা হয়নি। আর এতেই ঘটে গিয়েছিল সর্বনাশা দুর্ঘটনা।

চারখি-দাদ্রি বিমান দুর্ঘটনা

নয়াদিল্লীর পশ্চিমের ছোট্ট একটি গ্রাম চারখি-দাদ্রি। গ্রামটি হঠাৎ সারাবিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কারণে। সময়টা ১৯৯৬ সালের ১২ মার্চ। সৌদি এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৪৭-১০০বি বিমানটি দিল্লী থেকে সৌদির উদ্দেশে যাত্রা করেছিল এবং কাজাখস্তান এয়ারলাইন্স ইলুশিন ২-৭৬ বিমানটি কাজাখস্তানের চিমকেন্ট থেকে দিল্লীর উদ্দেশে আসছিল। কিন্তু বিধিবাম; বিমান দুটি গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। বরং বিমান দুটি বিধস্ত হয়ে প্রাণ হারায় ৩৪৯ জন। কাজাখস্তানের বিমানটি বিমানবন্দর থেকে ১৩৭ কিলোমিটার দূরে যখন ১৫০০০ ফুট উঁচুতে ছিল, তখন একে অবতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল আর সৌদি বিমানকে ১৪০০০ ফুট উঁচু দিয়ে ওড়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু কাজাখস্তানের বিমানের পাইলট প্রথমে ১৪৫০০ ফুট এবং তারপর ১৪০০০ ফুট উঁচু দিয়ে নামছিল। কাজাখ পাইলট ইংরেজী জানতেন না ভাল করে, ফলে তাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তাছাড়া তিনি উচ্চতা ও দূরত্ব নিয়েও সংশয়ে ভুগছিলেনু। তার এ সংশয়ই কাল হয়ে দাঁড়ায়। মেঘের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কাজাখ বিমানটির লেজ সৌদি বিমানের পাখায় আঘাত করে। আর এতে বিধস্ত হয়ে যায় দুটি বিমানই। পাইলটের ইংরেজী ভাষার দক্ষতার অভাব এবং সেকেন্ডারি এয়ার কন্ট্রোল রাডারের ঘাটতিই এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ বলে চিহ্নিত করেছিল ঘটনার তদন্তকারী লাহৌতি কমিশন।

তুর্কি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৮১

৩ মার্চ, ১৯৭৪। ব্রিটিশ ইউরোপিয়ান বিমানকর্মীরা তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। তাই প্যারিস থেকে লন্ডনে যাওয়ার জন্য রাগবি খেলোয়াড়, সুন্দরী ফ্যাশন মডেল আর জাপানি ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনিরা বুকিং করেছিল তুর্কি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৮১। ইস্তাম্বুল থেকে প্যারিস হয়ে হিথ্রো বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল বিমানটির। অরলি ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করে। প্যারিসের কাছাকাছি আরমেনভাইল বনের কাছাকাছি এলে হঠাৎ বিমানটির রিয়ার কার্গো দরজাটি উড়ে যায়। বাতাসের চাপে ভারসাম্য হারিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। পাইলট যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। বিমানটি বনের বড় গাছের ডালের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বিধস্ত হয়ে যায় এবং মারা যায় ৩৪৬ জন। এটি ছিল ম্যাকডোনেল ডগলাস ডিসি-১০ বিমান। এর নকশার দুর্বলতার কারণেই বাতাস ও যাত্রীদের ভার সহ্য করতে না পেরে কার্গো দরজাটি উড়ে গিয়েছিল।

এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যে কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ বিমান দুর্ঘটনাটি। ইন্দিরা গান্ধী অমৃতসরে শিখদের বিরুদ্ধে অপারেশন ব্লু স্টার পরিচালনা করেছিলেন। এতে উগ্রপন্থী শিখরা প্রতিশোধস্বরূপ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল বোয়িং ৭৪৭-২৩৭বি বিমানটিতে। সময়টা ছিল ১৯৮৫ সালের ২৩ জুন। বিমানটি দিল্লী থেকে কানাডার মন্ট্রিলের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। এতে ২৬৮ জন ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক, ২৭ জন ব্রিটিশ ও ২৪ জন ভারতীয় নাগরিক ছিল। এটি যখন ৩১০০০ ফুট উঁচু দিয়ে আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিচ্ছিল, তখন বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রাণ হারিয়েছিল ৩২৯ যাত্রী। এটি ছিল কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। বিমানটিতে যখন বোমা বিস্ফোরণ ঘটে, ঠিক ওই সময়টাতে নারিতা বিমানবন্দরেও বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনার তদন্ত ও বিচার চলে বিশ বছর ধরে। বিচারপতি জন মেজরের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ২০১০ সালে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে শিখ জঙ্গীদের দোষারোপের সঙ্গে সঙ্গে কানাডার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ও রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের দুর্বলতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

সৌদি ফ্লাইট ১৬৩

১৯৮০ সালের ১৯ আগস্ট সৌদি ফ্লাইট ১৬৩ তে আগুন ধরে মারা যায় ৩০১ জন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হজযাত্রী। বিমানের নাম লকহেড এল-১০১১-২০০ ট্রাইস্টার। বিমানটি রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মিনিট সাতেক পরই ক্রুরা প্লেনের কার্গো ডিপার্টমেন্ট থেকে ধোঁয়ার গন্ধ পান। কিছুক্ষণের মধ্যই সেন্ট্রাল ইঞ্জিনে আগুন লাগার কারণে ইঞ্জিনটি বন্ধ হয়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে ক্যাপ্টেন বিমানটিকে আবার রিয়াদ বিমানবন্দরে অবতরণ করানোর চেষ্টা করছিলেন। বিমানটি রানওয়েতে নিরাপদে নামিয়েও এনেছিলেন তিনি; কিন্তু বিমানটিতে আবারও আগুন লেগে যায়। এতেই ঘটে সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা।

মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭

তারিখটি ছিল ১৭ জুলাই ২০১৪। আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুরে আসছিল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর বিমানটি। বিমানটিতে বেশিরভাগই ছিল ডাচ্ নাগরিক। এটি যখন ইউক্রেনের শাকতারেস্ক এলাকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাশিয়াসর্মথিত বিদ্রোহীদের মাধ্যমে মিসাইল ছুড়ে বিমানটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এতে প্রাণ হারায় ২৯৮ জন। ওই সময়টাতে ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে রাশিয়াপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সৈন্যদের যুদ্ধ চলছিল। তবে বিদ্রোহীরা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। চলতি বছরের অক্টোবর নাগাদ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হলে জানা যাবে আসল রহস্য।

মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৩৭০

এ বিমানটি স্রেফ নিখোঁজ হয়ে গেছে। ৮ মার্চ, ২০১৪। মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর বিমানটি কুয়ালালামপুর থেকে বেজিংয়ে যাওয়ার পথেই নিখোঁজ হয়ে যায়। এতে প্লেনে ক্রুসহ ছিল ২৩৯ জন। দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিতে যাওয়ার পর এটি রাডারের বাইরে চলে যায়। অদ্যাবধি যাত্রীসহ এ বিমানটির কী হয়েছে কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তন্নতন্ন করে খোঁজা হলেও এখনও তা রহস্য হয়েই রয়েছে।

কিছু স্মরণীয় বিমান দুর্ঘটনা

১৯৭৯ সালের ২৫ মে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৯১ ইঞ্জিন বিকলের কারণে বিধ্বস্ত হয়, যা ২৭৩ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। ১৯৮৩ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর কোরিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ০০৭ সোভিয়েতের আকাশসীমা দিয়ে যাওয়ার সময় মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়, এতে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে মারা যায় ২৬৯ জন। ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই ইরানের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ তে আমেরিকান নেভি মিসাইল নিক্ষেপ করলে, বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ২৯০ জন মানুষ মারা যায়। ১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর প্যান এএম ফ্লাইট ১০৩ স্কটল্যান্ডের লকারবিতে সন্ত্রাসবাদী বোমা হামলায় বিধস্ত হয়ে মারা যায় ২৭০ জন। ২০০১ সালে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৫৮৭ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়, যা কেড়ে নেয় ২৬৫টি প্রাণ। ২০০১ সালের ৯ নবেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা চালিয়ে টাওয়ারটিকে বিধ্বস্ত করে দেয়া হয়। এতে নিহত হয়েছিল ২৯০৭ জন। ২০০৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইলুসিন ২-৭৬ বিমানটি কুয়াশার কারণে ইরানের এক পাহাড়ে ধাক্কা খেলে ২৭৫ জন ওই দুর্ঘটনায় মারা যায়। ২০০৬ সালে তুপোলেভ তু-১৫৪ বিমানটি ইউক্রেনে বিধস্ত হয় যাতে মারা যায় ১৭০ জন। ২০০৯ সালে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ বিমানটি বিধ্বস্ত হলে ২২৮ জন মানুষ মারা যায়। ২০১২ সালে ডানা এয়ারলাইন্সের ম্যাগডোনেল ডগলাস এমডি-৮৩ বিমানটি লাওসের একটি ভবনে আছড়ে পড়লে মারা যায় ১৬৩ জন যাত্রী। চলতি বছরের গত ২৪ মার্চ জার্মানি উইংসের একটি বিমান আল্পস পর্বতমালায় বিধ্বস্ত হয়। এতে মারা যায় ১৫০ জন। এ বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছিল বিমানটিরই কো-পাইলট আন্দ্রেজ লুবিৎজ।

বাংলাদেশে বিমান দুর্ঘটনা

১৮৯২ সালে ঢাকায় বেলুনে চড়ে আকাশ পরিভ্রমণ করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল এর চালক জিনেট ভ্যান ট্যাসেল নামক এক নারী। এই বেলুনে চড়ার ব্যবস্থা করেছিল ঢাকার নবাব পরিবার। জিনেট বুড়িগঙ্গার তীর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত বেলুনটি নিরাপদে অবতরণ করাতে পারেননি। একটি গাছে আটকে গেলে এক পুলিশ কর্মকর্তা নামাতে গেলে হাত ফসকে পড়ে গেলে তিনি গুরুতর আহত হয়ে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কদিন পর মারা যান। এটা ছিল বাংলায় প্রথম আকাশ দুর্ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান দুর্ঘটনায় শহীদ হয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ডগলাস ডিসি-৩ বিমানটি ঢাকার অদূরে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫ জন প্রাণ হারিয়েছিল। ফকার এফ ২৭-৬০০ বিমানটি ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরের নিকট বৈরী আবহাওয়ায় পড়ে বিধ্বস্ত হয় এবং এতে দেশের প্রথম নারী পাইলট কানিজ ফাতেমাসহ ৪৯ জন প্রাণ হারান। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা।

প্রায়শই বাংলাদেশ বিমানগুলো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিপদের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ বিমানগুলোর ত্রুটির দুর্বলতায় অনেক প্রশিক্ষণার্থী পাইলট অকালে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন। সম্প্রতি রাজশাহীর শাহ্ মুখদুম বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির ১৫২ মডেলের সেনা প্রশিক্ষণ বিমান বিধস্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে মেধাবী প্রশিক্ষণার্থী তামান্না রহমান হৃদি এবং গুরুতর আহত হয়েছেন প্রশিক্ষক। এই ঘটনার ৬ দিনের মাথায় শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিধ্বস্ত হয়েছে একটি প্রশিক্ষণ বিমান। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন দুই পাইলট।

যে কারণে ঘটে বিমান দুর্ঘটনা

ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশান সেফটি বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী বেশিরভাগ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে পাইলটের ভুলে অথবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। আবহাওয়ার কারণে খুব কমই বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ঘটে যাওয়া ৪৫% বিমান দুর্ঘটনার জন্য পাইলটরাই দায়ী ছিল, যার মধ্যে খারাপ আবহাওয়ার সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া অন্তর্ভুক্ত। ২২% দুর্ঘটনা ঘটে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। আর কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যখন পাইলট যন্ত্রপাতির সঙ্কেত ভুল নির্ণয় করে বা যান্ত্রিক ত্রুটি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়।

বিমানে অটো পাইলট সিস্টেমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিমান দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে জানা যায় সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে। প্রয়োজনীয় এবং নির্দেশিত সময় ছাড়াও অনেক সময় বিমানকে অটো পাইলটের হাতে ফেলে রাখে পাইলটরা। ফলে কোন জরুরী অবস্থা বা যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হয় তাদের। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২ ঘণ্টার বিমান যাত্রায় মাত্র ৮০ সেকেন্ড পাইলট নিজের হাতে বিমান পরিচালনা করে! আর বাকি পুরো সময় এটি থাকে অটোপাইলটের হাতে। তাই ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন পাইলটদের অটোপাইলট ব্যবহারের প্রবণতা কমানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে।

যেভাবে নিরাপদ থাকতে পারেন বিমানযাত্রায়

এয়ার ক্র্যাশ তদন্তকারী সংস্থা গবেষণা করে দেখেছে যে, দুর্ঘটনার সময় যারা পেছনের আসনে বসেন, তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সামনের আসনের যাত্রীদের থেকে বেশি। আরেকটি উপায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে, সেটা হলো প্লেনে বসে মদ না খাওয়া, মানে মাতাল না হওয়া। বিপদের সময় সজাগ যাত্রীরা বিমান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মাতাল যাত্রীদের বের হওয়ার সুযোগ কম থাকে। তবে মিসাইল দিয়ে বিমান উড়িয়ে দিলেতো আর বেঁচে থাকার উপায় নেই! অনেকে স্মার্টনেস দেখাতে যেয়ে সিটবেল্ট বাঁধেন না। এটা আসলে বোকামি। দুর্ঘটনা বলে কয়ে ঘটে না। ক্রাশ ল্যান্ডিংয়ের সময় সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে ‘আহত’ না হয়ে ‘নিহত’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ বিষয়ে যাত্রীদের সর্তক থাকা প্রয়োজন।

শেষ কথা

গাড়ি, ট্রেন বা জাহাজ দুর্ঘটনার তুলনায় বিমান দুর্ঘটনার হার অনেক কম। এই হার আরও কম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ট্রান্সপোর্টেশান সেফটি বোর্ড ও এয়ার ক্র্যাশ তদন্তকারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১.২ মিলিয়ন বিমান ফ্লাইটে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, একজন বিমানযাত্রীর আকাশ পথে সঙ্কটে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু তারপরও যে বিমান দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলো কেড়ে নেয় শত সহস্র প্রাণ। ধূলিসাৎ করে দেয় হাজারো রঙিন স্বপ্ন। বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটে পাইলটের অদক্ষতা ও অসেচতনতা, বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি, নিরাপত্তা সামগ্রীর ঘাটতি এবং বিমানবন্দরের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে অথচ একটু সর্তক থাকলেই এ কারণজনিত দুর্ঘটনাগুলো এড়ানো সম্ভব।

http://www.amadershomoy.com/converter/

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: