রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পুরাকীর্তি ব্যবসায় আইএস

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫

এনামুল হক

সভ্যতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামিক স্টেট বা আইএস। এরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রাচীন শিল্পকলা ও অন্যান্য অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করে দিচ্ছে। এভাবে এরা শুধু নিষ্ঠুরভাবে লোকহত্যাই করছে না, প্রাচীন সভ্যতার স্বাক্ষরগুলোও এদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এরা পূরাকীর্তি পাচার করে বিপুল অর্থ আদায় করছে।

আইএসের এই ধ্বংসযজ্ঞের নমুনা নজিরবিহীন। সিরিয়ার ছয়টি বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে চারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পঞ্চম স্থান পালমিরা এখন তাদের হাতে। এ পর্যন্ত তারা সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ না চালালেও যে কোন মুহূর্তে চালাতে পারে। গত ফেব্রুয়ারি তারা ইরাকের মসুল মিউজিয়ামের অমূল্য সব ঐতিহাসিক নিদর্শন ও শিল্পকলা সেøজহ্যামার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। এভাবে আসিরীয়, আক্কাদিয় ও অন্যান্য সভ্যতার নানা নিদর্শন, তাদের যুদ্ধের দেবতা, বৃষ্টি ও কৃষিকাজের দেবদেবীকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। তারা যুক্তি দেখায়, মহানবী মুহম্মদ (দ.) মক্কায় যাওয়ার পর কাবা শরীফ থেকে নিজ হাতে মূর্তি অপসরারণ করেছিলেন। তার সাহাবীরাও পববর্তীকালে যেসব দেশ দখল করেছে, সেখানেও মূর্তি ধ্বংসের অভিযান চালিয়েছে। সুতরাং শুরু হলো বিশ্বের পূরাকীর্তির ইতিহাসের সবচেয়ে সর্বনাশা মুহূর্ত। গত দশটা মাস ইরাকের পশ্চিম ও মধ্যঞ্চলে আইএসের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় মানবসভ্যতার কয়েক হাজার বছরের মহামূল্যবান সব ঐতিহাসিক নিদর্শন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর এভাবে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যম-িত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

আইসিসের হাতে আক্রান্ত প্রাচীন নগরী হাত্রা হলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে ভালভাবে সংরক্ষিত পার্থিযান নগরী। সেটি যেমন ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পায়নি, তেমনি রক্ষা পায়নি আসিরীয় নগরী নিমরুদ। তাই গত ২০ মে সিরিয়ার তদেশের ও পার্শ্ববর্তী বিশ্ব ঐতিহ্যম-িত স্থান পালমিরা আইসিসের দখলে চলে গেলে এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভবিষ্যত নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এখনও এগুলোর ঐশ্বর্যের ওপর আঘাত নেমে আসেনি, এই যা রক্ষা। তবে আসতেই বা কতক্ষণ।

শুধু যে আইএস অমূল্য পূরাকীর্তি ধ্বংস করছে তা নয়, অন্যান্য জঙ্গী জিহাদী শক্তিও তাই করছে। ওয়াহাবী মতবাদের অনুসারীরা ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরব উপদ্বীপ থেকে বেরিয়ে এসে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শিয়া মাজারগুলোতে ধ্বংস ও লুণ্ঠন চালিয়েছিল এই যুক্তিতে যে, ওগুলো হলো অনৈসলামিক। ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হওয়ার পর ওয়াহাবী মতবাদের আরও বিস্তার ঘটে। আবু কাতাদা নামে এক র‌্যাডিকেল ইসলামী নেতা ফতোয়া দেন যে, কবর কেন্দ্রিক মসজিদ বা মাজার নাজায়েজ এবং সেগুলো জ্বালিয়ে দিতে হবে। ফলে লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে শুরু করে ইরাকের তিকরিত পর্যন্ত শত শত মাজার ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করা হয়। জিহাদীরা এ বছর তিউনিসের বারদো জাদুঘরের রোমান মর্মরমূর্তির অতুলনীয় সংগ্রসসহ পৌত্তলিকদের বিভিন্ন নিদর্শন টার্গেট করে হামলা চালায়। একই উদ্দেশ্যে গত ১০ জন মিসরের লুক্সবে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালান হয়।

পূরাকীর্তি ও অন্যান্য অমূল্য নিদর্শন ধ্বংসের পেছনে আইএসসহ জিহাদীরা যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও আছে। এসব ধ্বংসের কথা তারা ব্যাপকভাবে প্রচার করে যাতে করে এগুলোর সরবরাহে সঙ্কট সৃষ্টি করে চাহিদা বাড়ানো যায়। চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে। যারা এসব জিনিসের চোরাচালানে জড়িত তারা তখন বেশি দামে জিহাদীদের কাছ থেকে এসব সংগ্রহ করে। আইএসের রাজধানী সিরিয়ার রাকার জাদুঘরের প্রতœতাত্ত্বিক সামগ্রী এভাবে চড়া দামে সংগ্রহ করেছিল চোরাচালানকারিরা এবং সেগুলো বাক্সবোঝাই করে পাচার করে জাদুঘর খালি করে ফেলা হয়েছিল।

এইভাবে পূরাকীর্তির চোরাচালান এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএসের রাজস্বের অন্যতম প্রধান উৎস এবং এই চোরাচালানের এক বিশাল চক্র গড়ে উঠেছে। আইএসের দখলে থাকা তেলকূপে পাশ্চাত্যের বিমান হামলা যত বাড়ছে, পূরাকীর্তি বেচে ডলার সংগ্রহের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। শুধু যে আইএস এ কাজ করছে তা নয়, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি থেকে শুরু করে অপরাধী চক্র পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ এ কাজে যুক্ত। এরা পূরাকীর্তির গুদাম পরিচালনা করছে। অনেকে জীবিকার তাগিদে এই লুটপাটে জড়িয়ে পড়েছে। এভাবেই বেনগাজীস্থ লিবিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উধাত্ত হয়ে গেছে ৭৭০০ প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা, অলঙ্কার ও মূর্তি। মেসোপটোমিয়ার পূরাকীর্তির কোন কোনটি পাশ্চাত্যের নিলামে উঠেছে। এক তথ্যে জানা যায়, ২০১১ সালে হোসনি মোবারকের পতনের পর থেকে ৩শ কোটি ডলার মূল্যের মিসরীয় পূরাকীর্তি খোয়া গেছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫

২৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: