কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার অবলম্বনে লিখেছেন

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

আনন্দ বেদনার সম্মিলনই জীবন। ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়েই চলে জীবনের খেলা। সবার কাছে ঘটনা স্বাগত হলেও দুর্ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। কিন্তু একে অস্বীকার যেমন করা যায় না, তেমনি শত চেষ্টাতে এড়ানোও সম্ভব হয় না অনেক সময়। দুর্ঘটনা শুধু মানুষের জীবনকে কষ্টের মধ্য দিয়েই নিয়ে যায় না, অনেক সময় জীবনকেও করে তোলে বিপন্ন। তারপরও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, জীবনযুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়। যেমনটা চেয়েছিল আমোস ডেকার। কিন্তু বারংবার তার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়। ল-ভ- হয়ে গেছে জীবনের সকল প্রত্যাশা, স্বপ্ন। ডেকার তো অন্য সবার মতোই চেয়েছিল তার জীবন আনন্দ উচ্ছ্বলে কেটে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। প্রতিভাবান ফুটবলার ছিল সে। এই ফুটবল খেলাই তার জীবনে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটিয়ে জীবনের গতিপথকে পাল্টে দেয়।

স্বপ্ন ছিল নামী ফুটবলার হয়ে উঠবে। কিন্তু একটি ফুটবল ম্যাচ তার স্বপ্নকে ভেঙ্গেচুরে দিয়েছিল। ফুটবল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এক খেলোয়াড়ের মাথার সঙ্গে মাথায় বাড়ি লাগলে চরম আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল ডেকার। সেই মাঠ ছাড়া ছিল তার সারা জীবনের জন্য ছাড়া। সে দুর্ঘটনায় অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল তার দেহে, মস্তিষ্কে ও মননে। সাধারণত মাথায় আঘাত পেলে মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যায় কিন্তু ডেকারের বেলায় উল্টো ঘটনা ঘটে যায়। সবই থাকে তার স্মৃতির মধ্য। কোন কিছুই সে ভোলে না। স্মৃতির এই অসাধারণ প্রতিক্রিয়া তার পেশাগত জীবনের গতিপথও পাল্টে দেয়। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি পুলিশ ও গোয়েন্দাগিরির জন্য উপযোগী বিধায় তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল পুলিশের গোয়েন্দা হিসেবে। বেশ চলছিল সে জীবন। প্রথম জীবনের ধাক্কা কাটিয়ে বলা চলে স্ত্রী মেয়ে নিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল তার জীবন।

কিন্তু জীবনের ধর্মই যেখানে উত্থান-পতন, তা এড়ানোর সাধ্য কার? ডেকারেরও ছিল না। প্রথম জীবনের দুর্ঘটনার থেকেও বড় এক আঘাতে তার জীবনকে পুরো ল-ভ- করে দেয়। বেঁচে থাকাটাই হয়ে ওঠে যেন বড় এক পাপ। উফ, কী কষ্টের সে জীবন। কাজ শেষে বাসায় ফিরে প্রিয়তমা স্ত্রী ও আদরের কন্যার সান্নিধ্যে সকল ক্লান্তি দূর করবেন এমন আকাক্সক্ষার পরিবর্তে যদি এসে দেখেন স্ত্রী, কন্যা আর শ্যালকের লাশ তাহলে এর চেয়ে কষ্টের কী আছে? মেঝেতে প্রিয় মানুষের রক্ত ডেকারের হৃদয়ে শুধু রক্তক্ষরণই করেনি, তাকে মানসিকভাবে পুরো বিপর্যস্তও করে তুলেছিল। স্ত্রী মেয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ তার জীবনের কোন দুঃস্বপ্ন ছিল না, এ ছিল কঠোর দুঃখময় বাস্তব সত্য। এ সত্য তার জীবনকে যেন নিয়ে গিয়েছিল নরকের অন্ধকারে। সেই অন্ধকার থেকে ওঠে আসা সত্যিই দুঃসাধ্য।

খুনের রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি ডেকার। কে বা কারা কী কারণে তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও কন্যাকে রক্তাক্ত করে তার জীবনকে অতল অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে তা জানতে পারেনি ডেকার। এই না পারা তাকে আরও বেশি বিপর্র্যস্ত করে তুলেছিল। এমনই সময় গোয়েন্দাগিরির চাকরিটা হারিয়ে ডেকারের মাথার ওপর যেন ভেঙ্গে পড়েছিল পুরো পৃথিবীই নয়, পুরো মহাবিশ্ব। কথায় বলে বিপদ যখন আসে তখন আসতেই থাকে গলাগলি করে একের পর এক। ডেকারের জীবনেও পরম্পরায় ঘটে যাওয়া সেই সত্য তাকে জীবনের কাছে বন্দী এক অসহায় জীবেই পরিণত করে তুলেছিল। বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিল না একসময়ের তুখোড় ফুটবলার ও দুঁদে গোয়েন্দা ডেকারের। অবর্ণনীয় কষ্ট কঠিনময় বছরখানেক সময় বয়ে যাওয়ার পর আবারও পরিবর্তনের হাওয়া আসে ডেকারের জীবনে। মানুষের জীবনে কোন কিছু সত্য না হলেও পরিবর্তন সত্য, এই চিরন্তন সত্যেরই প্রতিবিম্ব দেখা যায় ডেকারের জীবনে।

ম্যারি লেঙ্কস্টার যখন ডেকারের কাছে দেখা করতে আসে তখন থেকেই তার জীবনে শুরু হয়ে যায় নতুন মেরুকরণ। লেঙ্কস্টার গোয়েন্দা। ডেকারের পুরনো বন্ধু। সে এসে ডেকারকে শোনায় এমন এক কাহিনী, যার জন্য একটি বছর হন্য হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে ডেকার। এক ব্যক্তি থানায় এসে আত্মসর্র্মপণ করেছে এই বলে যে, সে ডেকারের স্ত্রী, কন্যার হত্যার জন্য দায়ী। কোন কারণ ছাড়া খুনী ধরা দেবে নিজে এসে, এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না লেঙ্কস্টারের। বিশ্বাস হয়নি ডেকারেরও। এমন সময়ই বালিংটনে এক মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। তেরোজন কিশোরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই খুনের রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব পড়ে ডেকারের ঘাড়ে। এই ঘটনার পেছনে ছুটতে গিয়ে ডেকার খুঁজে পায় তার জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার যোগসূত্র। বারবার ফিরে আসে জীবনের সেই দুঃসহ যাতনাময় অস্থির কিন্তু দেদীপ্যমান স্মৃতি।

ডেকারের জীবনের ঘটনা-দুর্ঘটনাকে এভাবেই জনপ্রিয় লেখক ডেভিড ব্যালডাচি তাঁর ‘মেমোরি ম্যান’ বইতে তুলে ধরেছেন।

বইটি মূূলত থ্রিলারধর্মী। বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত থ্রিল আর রোমাঞ্চ, ঘটনা-দুর্ঘটনার নানা বাঁক। ৪১৬ পৃষ্ঠার বইটি একটানা না পড়ে ওঠা যেন খুবই কষ্টকর হয়ে যায় পাঠকের জন্য। বেস্ট সেলার লেখক ডেভিড ব্যালডাচির ম্যাক্সওয়েল, সিয়েন কিং, জন পুলার, উইল রোবির মতো ‘মেমোরি ম্যান’-এর অ্যামোস ডেকোর চরিত্রটি স্বতন্ত্র এবং নায়কোদীপ্ত। এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে লেখক মানুষের জীবনের ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকেই তুলে ধরেননি শুধু, তুলে ধরেছেন কিভাবে দুর্ঘটনা মানুষের জীবনকে তছনছ করে দেয়, কিভাবে সুখের জীবনে অসুখ বাসা বাঁধে। থ্রিলার আর রোমাঞ্চধর্মী এই বইটির মধ্য দিয়ে লেখক জীবনের চরম সত্য, পরম বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন। বইটির কাহিনীর গভীরতা, চরিত্রের বলিষ্ঠতা আর থ্রিলারধর্মী বইটিকে অনবদ্য করে তুলেছে। বইটি উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের শীর্ষে।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: