আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ছড়াকার দৈত্য

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫
  • শিশির মনির

জানালার পাশে বসে তোতাপাখির মতো বই মুখস্থ করছিল দিহান। আগে বড় ভাইয়া যখন স্কুলে যেত, দিহান তখন স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না ধরত। কিন্তু তখন তো দিহানের স্কুলে যাবার বয়স হয়নি। তাই আব্বু আম্মু বুঝিয়ে বলত, ‘তোমার এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। সময় হলে আমরা ঠিকই তোমাকে স্কুলে পাঠাব।’ দিহান এখন স্কুলে যায়। কিন্তু এখন স্কুলে যাওয়া আর পড়া মুখস্থ করা দিহানের কাছে সবচেয়ে কষ্টের কাজ। এদিকে আব্বু আম্মু বলেছে, দিহানকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে। দিহান ভাবে এটা নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু আব্বু আম্মুর কথা তো রাখতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় নিজের ঘুমিয়ে পড়ে দিহান ।

বাগানের ভিতর দিয়ে দিহান হেঁটেই চলছে। এতো সুন্দর বাগান সে আগে কখনো দেখেনি। রঙবেরঙের ফুল। ফুলের সুভাস। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি। সব কিছুই দিহানের কোমল মনকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দূর থেকে ঘাসের উপর দিহান কি যেন একটা দেখতে পেল। দিহান পা টিপে টিপে কৌতূহল মন নিয়ে সামনে এগোতে লাগল। দিহানের মাথায় নানা ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। কি হতে পারে বস্তুটি? ভাবতে ভাবতে দিহান বস্তুটির একদম কিনারে চলে এসেছে। একি! এটাতো আলাউদ্দিনের সেই আশ্চর্য প্রদীপের মতো মনে হচ্ছে। দিহান নিচু হয়ে প্রদীপটি হাতে নিল। বড় বড় চোখ করে প্রদীপটি দেখতে লাগল। আরে, এটা তো অবিকল সেই প্রদীপ! আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ!

এইতো সেদিন দিহান দাদুর কাছে আলাউদ্দিনের প্রদীপের গল্প শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে এটার দেখা মিলবে দিহান কল্পনাতেও কখনো ভাবেনি। দিহান ভয়ে ভয়ে প্রদীপের একপাশ ঘষতে লাগল। প্রথম ঘষাতে তেমন কিছু হল না। দ্বিতীয় ঘষাতেও কোন কিছুর দেখা মিলল না। দিহান তৃতীয়বারের মতো প্রদীপটা ঘষল। ঘষা শেষ করতেই, আশ্চর্য! দাদুর কথামত সত্যি সত্যিই মস্তবড় একটা দৈত্য এসে দিহানের সামনে হাজির হল। দিহানের খুশি আর কে দেখে।

দৈত্যটার মস্ত বড় মাথা। মাথার উপর লম্বা দুটো শিং। পিছনের দিকে এক গাছি চুল। গলায় তিন চারটা মালা ঝুলানো। গায়ে লম্বা রঙিন পোষাক। পেটের ভূড়িটা যেন পোষাক ছিঁড়ে চলে আসবে, ঠিক এমন। দীর্ঘ লম্বা দুটি হাত। দু’হাতের বাহুতে আবার নীল দুটো রঙের ব্যান্ড লাগানো। পায়ের দিকটা মাছের লেজের মতন। প্রথমে বেশ খুশি হলেও দৈত্যের এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখে দিহান ঘাবড়ে গেল।

কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে দৈত্যটা বলে উঠল,

‘হুকুম করুন মহারাজ।’

দিহান কিছুটা ভীত হয়ে চুপ করে রইল। কোন কথা বলল না।

‘মহারাজ, ভয় পাবেন না। আপনার কি চাই? হুকুম করুন মহারাজ।’

এবার দৈত্যের কথা আশ্বস্ত হলো দিহান। মনে সাহস যুগিয়ে বলল,

‘দৈত্য, তোমার নাম কি?’

‘আমার নাম ছড়াকার টুংটান।’

‘তুমি কি ছড়া লিখ?’

‘হ্যাঁ, মহারাজ আমি সুন্দর সুন্দর ছড়া লিখি।’

ভয় কাটিয়ে দিহান এবার সাবলীলভাবে কথা বলতে লাগল।

‘আমাকে একটা ছড়া শোনাবে?’

‘অবশ্যই শোনাব মহারাজ। তার আগে বলুন আপনার কি চাই?’

দিহান মনে মনে এক মিনিট ভেবে নিল। আব্বু আম্মু বলেছে পরীক্ষায় প্রথম হতে। সেদিন মিস ক্লাসে সবাইকে বলেছে, সব সময় সত্য কথা বলতে হবে। সত্যবাদী হতে হবে। দাদু ভাই বলেছে- আমাকে অনেক বড়ও হতে হবে। অনেক ভেবে-চিন্তে দিহান এবার বলে উঠল,

‘টুংটান। তুমি আমাকে এমন একটা মন্ত্র শিখিয়ে দাও যাতে, আমি অনেক বড় হতে পারি।’

‘মহারাজ, এই মন্ত্র সবশেষে শিখিয়ে দেব। তার আগে বলুন আপনার আর কি চাই?’

‘টুংটান। তাহলে তুমি আমাকে ক্লাসে প্রথম বানিয়ে দাও।’

‘প্রথম হওয়া নয়তো সহজ/ ইচ্ছে খুশি চলে/ প্রথম হয় তারা/ যারা মনযোগ দিয়ে বই পড়ে।’

ছড়ায় ছড়ায় টুংটানের অভিনব উত্তর দিহানের খুব ভালো লাগল। এবার টুংটান আবার বলল,

‘বলুন মহারাজ, আপনার আর কি চাই?’

‘টুংটান। তুমি আমাকে সত্যবাদী বানিয়ে দাও। আমি যেন সব সময় সত্য কথা বলতে বলতে পারি’

‘সত্য কথা বললে তবে/ তৃপ্তি আসে কাজে/ সত্যবাদী হতে হবে/ নিজ চেষ্টায় তবে।’

দিহান বুঝতে পারল, পরীক্ষায় প্রথম আর সত্যবাদী হওয়া এই দুটোই নিজ পরিশ্রম আর চর্চাতে হতে হয়। এবার দিহান বলল,

‘টুংটান। তুমি বরং আমাকে বড় হওয়ার মন্ত্রটা শিখিয়ে দাও। তুমি যেটা সবশেষ শেখাবে বলেছিলে।’ টুংটান এবার জবাব দিল, ‘কাজের গুণে বড় হয়ে/ জীবন কর জয়/ বড় হতে তোমার/ এত কেন ভয়?

একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে টুংটান বাতাসে মিলিয়ে গেল। দিহান টুংটানকে চারদিকে খুঁজে বেড়াতে লাগল। কিন্তু কোথায়ও টুংটানের দেখা মিলল না। দিহানের মন খারাপ হতে লাগল। টুংটান, টুংটান’ বলে চিৎকার করতে করতে দিহান ঘুম থেকে জেগে উঠে। দিহানের চিৎকারে আম্মুর ঘুমও ভেঙ্গে যায়। দিহান নিশ্চয়ই স্বপ্নে কিছু দেখেছে। আম্মু বিষয়টা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে। দিহান উঠে বসে পড়ল। একটু আগে তার সঙ্গে কি ঘটেছে ভাবতে লাগল। দিহান বুঝল এত সময় সে স্বপ্নের জগতে ছিল। স্বপ্নে ‘টুংটান’ নামের এক দৈত্য এসে, দিহানকে শুধু এটাই শেখাতে চাইল, ‘পরিশ্রম করেই বড় হতে হয়। পরিশ্রম ছাড়া কোন কিছু লাভ করা যায় না।’ দিহান আম্মুকে বলল, ‘আম্মু আমি পড়তে বসব।’

ঘুমকাতুর চোখে আম্মু বলল, ‘কি বল বাবা? এতো রাতে কেউ পড়তে বসে? এখন রাত দুইটা বাজে। ঘুমাও সকাল হলে পড়তে বসবে।’

দিহান আবার ঘুমাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম যেন চোখে আসছে না। বার বার টুংটানের কথাগুলো মনে পড়ছে। আর ভাবছে কখন সকাল হবে!

বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজ, সিলেট

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫

১৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: