কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ইতিহাস ও প্রয়োজনীয়তা

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৫
  • পার্থিব রাশেদ

ফিল্ম আর্কাইভের গুরুত্ব প্রথম সচেতনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন ফ্রান্সের আঁরি ল্যাংওয়া। ১৯৩৫ সালে তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ‘সিনেমাতেক ফঁসে’ নামে পৃথিবীর প্রথম পরিপূর্ণ আর্কাইভ স্থাপিত হয়। আঁরি ল্যাংওয়ার মাধ্যমেই চলচ্চিত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি পরবর্তীতে একটি শিল্পের পর্যায়ে রূপ নেয়। এ কাজের মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিলেন যে, ১৯৬৮ সালে ফ্রান্স সরকার ল্যাংওয়াকে সিনেমাতেক থেকে চাকরিচ্যুত করতে চাইলে তাঁর পক্ষে প্যারিসে গণআন্দোলন শুরু হয়ে যায়। দেশ-বিদেশের ভাল চলচ্চিত্র সংগ্রহের চেষ্টা ল্যাংওয়ার এতটাই প্রবল ছিল যে ফ্রান্সের কোন চলচ্চিত্র উৎসবে বিদেশী কোন ভাল চলচ্চিত্র এলে তিনি প্রায় অগোচরেই একরিল করে তাঁর আর্কাইভের জন্য প্রিন্ট করে নিতেন। ব্যাপারটা কিছুটা আইনবহির্ভূত হলেও তার এ আইনবিরোধী কাজের জন্যই নাৎসি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে সারা বিশ্বের প্রায় ৫৫ হাজার চলচ্চিত্র রক্ষা পায়। যা আজও বিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের তৃষ্ণা মেটায়। এই আর্কাইভকে কেন্দ্র করেই বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র আন্দোলন ফ্রান্স নিউওয়েবের জন্ম হয়েছিল। যার মাধ্যমে চলচ্চিত্র শিল্পটি পেয়েছিল গঁদার, ত্রুফো, রিভেত, রোমার ও শ্যাভরলের মতো অসাধারণ চরচ্চিত্রকার। এমনকি ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’র মতো বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র সাময়িকী ও এর কর্ণধার আঁদ্রে বাজার মতো চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক হয়ত তৈরি হতো না ‘সিনেমাতেক ফ্রসে’র মতো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলে। এরপর থেকেই শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিবেচনা করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্রের প্রিন্ট, চিত্রনাট্য, স্থিরচিত্র, আবহসঙ্গীতের স্বরলিপি, চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সাজ-সরঞ্জাম, চলচ্চিত্র বিষয়ক রচনা, ডায়েরি ও পা-ুলিপি সংরক্ষিত করে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ফিল্ম আর্কাইভ। ১৯৩৫ সালে স্থাপিত যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ’র মাধ্যমে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ফিল্ম আর্কাইভ। তবে আর্কাইভকে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের বিকাশে প্রথম ব্যবহার শুরু হয় সোভিয়াত রাশিয়ায়। বর্তমানে পৃথিবীর ১০০টির অধিক দেশে ১৩২টি ফিল্ম আর্কাইভ রয়েছে। এ ফিল্ম আর্কাইভগুলোতে নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হয়। চলচ্চিত্রের ওপর করা হয় গবেষণা এবং দেয়া হয় প্রশিক্ষণও। প্রকাশ করা হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক ম্যাগাজিন, বুকলেট, স্মরণিকা, ক্যাটালগ ও বুলেটিন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। পুনা ফিল্ম এ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সতীশ বাহাদুরের বিশেষ অবদান রয়েছে আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায়। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের অনুরোধে সতীশ বাহাদুর, বাদল রহমান ও ভারতীয় ফিল্ম আর্কাইভের তৎকালীন কিউরেটর বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ১৯৭৮ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট এ্যান্ড আর্কাইভ প্রকল্পটি সরকারিভাবে অনুমোদিত হয়। প্রথম কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় শিল্পী একেএম আবদুর রউফকে। তথ্য মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল গণযোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের ব্যবহার, চলচ্চিত্র শিল্পী-কলাকুশলিদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান, গবেষণা, প্রদর্শন ও রেফারেন্সের সুবিধাসহ চলচ্চিত্র সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন, চলচ্চিত্রবিষয়ক নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। এজন্য ১৯৭৮ সালের ২২ জুন এক সরকারী হ্যান্ড আউটে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫ কোটি ব্যয় সাপেক্ষে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট এ্যান্ড আর্কাইভ’ স্থাপনের ঘোষণা দেয়া হয় এবং জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের কর্মীরা বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটির উন্নতির জন্য কাজ করা শুরু করেন। তাদের আগ্রহ ও উদ্দীপনায় খুবই স্বল্পসময়ের মধ্যে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভকে রাজস্ব বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এমনকি এ বছরই প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাজের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম আর্কাইভের সদস্যপদ লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ সংগ্রহ করে দেশী-বিদেশী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চলচ্চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৫৬ সালে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। এছাড়া রয়েছে ১৯৩৫ সালে নির্মিত দেবদাস, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালিত ও অভিনীত একমাত্র চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’র অংশবিশেষসহ আরও অনেক ধ্রুপদী চলচ্চিত্র। এমনকি ল্যুমিয়ের ব্রাদার্স নির্মিত পৃথিবীর প্রথম চলচ্চিত্রসহ রয়েছে পথের পাঁচালী, তিতাস একটি নদীর নাম, দি ব্যাটলশিপ পটেমকিন, রশোমনের মতো পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র। বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ভল্টে বিভিন্ন ধরনের প্রায় তিন হাজারের মতো চলচ্চিত্র সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সবচেয়ে বড় একটি অবদান হলোÑ প্রতিষ্ঠার পরপরই সফল কয়েকটি চলচ্চিত্রবিষয়ক কোর্সের আয়োজন করা। আলমগীর কবিরের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এ কোর্সগুলোই বাংলাদেশের ভাল চলচ্চিত্রের আন্দোলনকে বেগবান করে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জাতীয় সীমানার গ-ি পেরিয়ে প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক পরিম-লে। এ কোর্সের মাধ্যমেই তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, প্রয়াত তারেক মাসুদদের মতো কৃতী চলচ্চিত্র নির্মাতা পায় বাংলা চলচ্চিত্র। হঠাৎ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে থমকে যায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভের কাজ। সামরিক সরকার ১৯৮৪ সালে সরকারী সকল প্রতিষ্ঠানসমূহের মূল্যায়নের জন্য ব্রিগেডিয়ার এনাম কমিটি গঠন করে। তখন ফিল্ম ইনস্টিটিউট এ্যান্ড আর্কাইভ নামের প্রতিষ্ঠানটি থেকে ইনস্টিটিউটকে আলাদা করে ফেলা হয়। তখন থেকে ফিল্ম ইনস্টিটিউট এ্যান্ড আর্কাইভ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ সময় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম থেকে চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের আলাদা করে দেয়া হয়। ফলে ক্রমান্বয়ে প্রায় অকার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় ফিল্ম আর্কাইভ। অবহেলা ও অযতেœর কারণে নষ্ট হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এমনকি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও নষ্ট করে দেয়া হয় অনেক চলচ্চিত্রের প্রিন্ট। এমনকি ১৯৭৮ সালে আর্কাইভের জন্য বরাদ্দকৃত জমিও বেদখল হয়ে যায়।

অতঃপর ২০০৩-০৪ সালের দিকে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে ফিল্ম আর্কাইভে। এ কর্মচাঞ্চল্য পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ২০০৪ সালে ফিল্ম আর্কাইভের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনের মধ্য দিয়ে। এ উপলক্ষে ‘রজতজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ ও সেমিনার আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবার আর্কাইভ মুখরিত হয়ে ওঠা শুরু করে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকর্মীদের পদচারণায়। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রপ্রেমী ব্যক্তিত্ব ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। চলচ্চিত্রকর্মীরা আর্কাইভের প্রথম কিউরেটর একেএম আবদুর রউফের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের মধ্যে। ২০০৬ সালে তারই তত্ত্বাবধানে আবার শুরু হয় চলচ্চিত্র এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স। এ সময় ৩টি ফিল্ম এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স ও একটি উচ্চতর ফিল্ম এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এ কোর্সের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ এ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ এ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ২০০৭ সালে নতুন করে শুরু হয় বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগারগাঁয়ের জায়গা পুনঃরুদ্ধারের কাজ। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর হক সরকার লিটুর উদ্যোগে এ আন্দোলনে সামিল হন চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, প্রয়াত তারেক মাসুদ এবং চলচ্চিত্রকর্মী মনিস রফিক, রিপন, পলাশ, পারভেজ, দীপু, আনিছুর রহমানসহ অনেকে। সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনসহ নানা আয়োজনের পর অবশেষে জায়গা পুনঃরুদ্ধার সম্পন্ন হয় এবং বর্তমানে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়া সম্প্রতি সরকারী উদ্যোগে ফিল্ম ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। প্রথম ব্যাচের কোর্স প্রায় সমাপ্ত হতে চলেছে। ফলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকলের ক্ষোভ প্রায়ই শেষ হতে চলেছে।

এতসব ভাল খবরের মধ্যেও একটি পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভের একান্ত অনীহা। এখনও তাদের মধ্যে তাদের সৃষ্টি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার অনুভব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে ফিল্ম আর্কাইভ কর্তৃপক্ষ ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মীরা। অথচ ভবিষ্যত প্রজন্মের চলচ্চিত্রকর্মীদের প্রয়োজনেই স্বাধীন ও বাণিজ্যিক দুই ধারার চলচ্চিত্র সংরক্ষণ জরুরী। তাছাড়া শুধু স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা নয়, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও ফিল্ম আর্কাইভ হয়ে উঠুক স্বাধীন-বাণিজ্যিক দুই ধারার চলচ্চিত্রের প্রধান কেন্দ্রস্থল।

১৭ মে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ৩৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ প্রত্যাশাই হয়ে উঠুক চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকলের ভাবনা ও কাজ।

লেখক : চলচ্চিত্রকর্মী

parthibrashed@ymail.com

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৫

১৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: