কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দিল্লীতে কয়েকদিন

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • মোফাজ্জল হোসেন

আগ্রার স্মৃতিভরা দিনগুলো পেছনে ফেলে এসে পৌঁছলাম দিল্লী। এই সেই দিল্লী, যার প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে মিশে রয়েছে অনেক হাসি-কান্না আর বিরহ-বেদনার ইতিহাস। দিল্লীর তক্ত তাউসের জন্য কত ঘটনাই না ঘটেছে। ঘটেছে কত হত্যা, ষড়যন্ত্র, কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধÑ তার ইয়ত্তা নেই। আমি এসে পৌঁছলাম সেই দিল্লী। আমি যে দিল্লী দেখতে চাই, সে তো হিন্দুস্তানের রাজধানী দিল্লী নয়। সে হলো স্মৃতি দিয়ে ঘেরা দিল্লী।

আমি দেখেছি ঐতিহাসিক লালকেল্লা, হুমায়ুনের সমাধি সৌধ, কুতুব মিনার, দিল্লীর বিখ্যাত বাজার চাঁদনী চক, জামে মসজিদ, বিড়লা মন্দির, বিড়লা প্রসাদÑ যে স্থানে মহাত্মা গান্ধী নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার। তাঁর সমাধিতে নির্মিত হয়নি কোন সৌধ, নেই কোন আচ্ছাদন। নিরাবরণ এই মাজার আমাকে মুগ্ধ করেছে।

আমি দেখতে গিয়েছি পুরাতন দিল্লী। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৮ সালে এই নগরটি নির্মাণ করেন। নগরীর পূর্বদিকে যমুনা নদীর ধারে লালকেল্লা নির্মিত হয়। নগরের চারপাশে তৈরি হয় একটি বিরাট প্রাচীর। প্রাচীরের মধ্যে অনেক দরজা ছিল। আর প্রাচীরের বাইরে ছিল একটি জলপূর্ণ পরিখা। নগর প্রাচীরের পশ্চিম দিকে লালকেল্লা অবস্থিত। এর পরিধি প্রায় দেড় মাইল। দুর্গে প্রবেশের দুটো গেট। দুর্গের প্রবেশ পথে রয়েছে সাজানো বাজার। এই বাজারের শেষে রয়েছে প্রাঙ্গণ, তারপর রয়েছে আরও একটি প্রাঙ্গণ। এরপর রয়েছে দেওয়ানী আম ও নবুয়ত খানা। এখানে রয়েছে বিখ্যাত দেওয়ানী খাস। এই দেওয়ানী খাসেই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মোগল সম্রাট মিলিত হতেন। এটি সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের তৈরি। এখনেই পূর্বে অতি মূল্যবান হীরা-মণি-মানিক্য ইত্যাদি দ্বারা সুসজ্জিত ময়ূর সিংহাসন শোভা পেত। সে স্থান আজও আছে। হলের দুই পাশে শ্বেতপাথরের দরজার ওপর লেখা ছিলÑ ‘অগর ফিরদৌস বররুষে জমিনাস্ত ও হামিনাস্ত, হামিনাস্ত ও হামিনাস্ত।’ যার অর্থ হলোÑ স্বর্গ যদি কোথাও থাকে তা এইখানে, এইখানে ও এইখানে।

ময়ূর সিংহাসন শেষ করতে ৭ বৎসর লেগেছিল এবং এতে ৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদিরশাহ কর্তৃক এটি লুণ্ঠিত হয়। আমি দেওয়ানী খাসের আরও ভেতরে প্রবেশ করলাম। মনে পড়ল, এই কক্ষে কত রাজনৈতিক ইতিহাসের পটপরিবর্তন ঘটিয়ে, কত বিষাদময় স্মৃতিতে মর্মিত হয়ে আছে এর প্রতিটি ইট-পাথর। এই ইট-পাথরের যদি ভাষা থাকত, তবে কত হাসি-কান্না আর বেদনার কাহিনী আমরা শুনতে পেতাম। কত ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে দেওয়ানী খাসের এই ইট-পাথর।

এই সেই কক্ষ, যেখানে বসে মোগল সম্রাট তাঁর আড়ম্বরপূর্ণ রাজসভা করেছেন, দেশ শাসন করেছেন, ফরমান জারি করেছেন। এই সেই কক্ষ, যেখানে আওরঙ্গজেব সিংহাসনকে কন্টকমুক্ত মুক্ত করার জন্য নৃশংসভাবে হত্যা করেন আপন ভাই দারা ও মুরাদকে। এই কক্ষের প্রতিটি ইট-পাথর এসব অতীত ঘটনার নীবর সাক্ষী। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম কক্ষের দেওয়ালগুলোর দিকে। ওরা যেন আমার কাছে কথা কয়ে উঠল। এই কক্ষ এমনি কত ইতিহাসের স্মৃতি বহন করছে, তার ইয়ত্তা নেই। হৃদয় ভরা এক বেদনা নিয়ে আমি বের হয়ে এলাম লালকেল্লা হতে।

আগেই বলেছি, দিল্লীতে হাজারও ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে যা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার। সম্রাট হুমায়ুনের মকবরার পশ্চিম দিকে কিছু দূরে হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার। মকবরার ভিতরটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো। দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত দর্শক ও ভক্তরা এসে মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায়। হযরত নিজামুদ্দিনের দরগায় এসে আমার সামনে ভেসে উঠল ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজী দিল্লীর একপ্রান্তে তৈরি করেছিলেন এক মসজিদ। তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পর ফকির নিজামুদ্দিন আউলিয়া এলেন সেই মসজিদে। সেখানেই তিনি রয়ে গেলেন। তাঁর পুণ্য খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দূরে বহুদূরে। তাঁর ভক্তের দল দিন দিন বেড়ে গেল। স্থানীয় লোকের পানীয় জলের অভাবে ফকির একটি দীঘি খননের জন্য মনস্থির করলেন, যার জলে তৃষ্ণা নিবারণ করবে জনসাধারণ। কিন্তু এক অপ্রত্যাশিত বাধা এলো। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের বিরাগভাজন হন। গিয়াসউদ্দিন তুঘলক মোগলদের আক্রমণ হতে রক্ষার জন্য পত্তন করেন নতুন নগর। আর নগর ঘিরে তৈরি করলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এই নগর প্রাচীর নির্মাণ নিয়েই নিজামুদ্দিন আউলিয়া আর গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের সঙ্গে বাধে বিরোধ।

নিজামুদ্দিনের দীঘি খননের জন্য চাই প্রচুর মজুর আর সম্রাট গিয়াসউদ্দিনের নগর প্রাচীর নির্মাণের জন্যও প্রয়োজন অসংখ্য মজুরের। কিন্তু দিল্লীতে মজুরের সংখ্যা পরিমিত। বাদশাহ চাইলেন, তাঁর নগর প্রাচীরের নির্মাণ কাজ আগে শেষ হোক। তারপর হবে নিজামউদ্দিনের বিনা মজুরির খনন। বাদশাহের জোর ছিল অর্থের ও ক্ষমতার। কিন্তু ফকিরের জোর ছিল হৃদয়ের ভক্তির। মজুররা বিনা মজুরিতে কাটতে লাগল নিজামুদ্দিনের দীঘি। বিঘিœত হলো গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের প্রাচীর নির্মাণ। দিবারাত্রি খননের ফলে ফকিরের দীঘি পূর্ণ হলো জলে। আর তুঘলকের নগর প্রাচীর নির্মাণ রইল অসমাপ্ত।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক রেগে গেলেন ফকিরের ধৃষ্টতায়। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্রোহ দমনের জন্য তাঁর চলে যেতে হলো সৈন্য-সামন্ত নিয়ে। অবশেষে সুলতান গিয়াসউদ্দিনের যখন ফেরার সময় হলো. নিজামুদ্দিনের অনুসারীরা তখন প্রমাদ গুনলেন। দিল্লীতে ফিরে নিজামুদ্দিনের ওপর সুলতান প্রতিশোধ নেবেন। গিয়াসউদ্দিনের ক্রোধ এবং নিষ্ঠুরতা কারও অজানা ছিল না । তাই তাঁকে অবিলম্বে দিল্লী ত্যাগের অনুরোধ করেন ভক্তরা। ফকির নিজামুদ্দিন মৃদু হাস্যে উত্তর দেনÑ ‘দিল্লী দূর অস্ত-দিল্লী অনেক দূরে।’ অবশেষে সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এসে উপস্থিত হলেন নগরপ্রান্তে। আর পুত্র মোহাম্মদ পিতার অভ্যর্থনার জন্য তৈরি করেন বিরাট ম-প। লোক-লস্কর ও বিশাল ভোজের ব্যবস্থা করে অভ্যর্থনা করার আয়োজন করা হলো। আর ছিল হাতির প্যারেড। কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় সমগ্র ম-পটি ভেঙ্গে পড়ে। গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের মৃত্যু হয় ওই দুর্ঘটনায়। নগরপ্রান্তে এভাবে সুলতান গিয়াসউদ্দিনের জীবনাবসান ঘটে। দিল্লী নগরীতে আর তাঁর ফেরা হলো না। দিল্লী তাঁর জন্য হয়ে রইল অনেক দূরÑ চিরকালের জন্য। ফকিরের কথাই সত্যি হলোÑ ‘দিল্লী দূর অস্ত-দিল্লী অনেক দূর।’

হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মকবরার ভিতর আরও অনেক কবর রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারার কবর। অতি সাধারণ এই সমাধি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ যেন জাহানারার করুণ জীবনের এক নীরব দীর্ঘশ্বাস। জাহানারা ছিলেন রূপসী, নির্ভীক আর তেজস্বিনী। এই চিরকুমারীর জীবনের দীর্ঘকাল কেটেছে আওরঙ্গজেবের কারাগারে। জাহানারা ছিলেন কবি। জাহানারার সমাধির পাশে এসে মনে পড়ল সেই কবিতাটিÑ

দিল্লীর বুকে সবচেয়ে বড় দেখিয়াছি যাহা/ বিশাল মসজিদ শাহী ইমারত ভাবিওনা কিছু তাহা/নিজাম মাজারে মসজিদের ধারে একখানি আছে গোর/ সবা হতে ছোট একটি কবর নাহি তার ছাদ দোর/ গগনচুম্বী মাজার স্তম্ভ সমাধি সৌধ মিছে/ সবার উপরে মৃত্যু সত্য সবাই তাহার পিছে/ তাই খোদালো ছোট্ট গোর লিখে গেল নিজ হাতে/ ‘ধূলি মাটি আর তৃণদল বিনা গজায় না যেন তাতে।’

শাহজাহানের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জাহানারা রইলেন তাঁর পাশে। অবশেষে একদনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। আর তাঁর ইচ্ছায় তাঁর দেহ সমাধিস্থ হয় নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সমাধির পাশে। তাঁর সমাধির ওপর নির্মিত হয়নি কোন সৌধ, নেই কোন আচ্ছাদন। তাঁরই স্বরচিত একটি কবিতা উৎকীর্ণ রয়েছে সমাধির গাত্রে। ‘বেগায়ের সবজা লা পোশাদ কসে মাজারে মারা কে কবর পোষে গড়িয়ান হামিন পিরাহ বসন্ত।’ অর্থাৎ ‘একমাত্র ঘাস ছাড়া আর কিছু যেন না থাকে আমার সমাধির ওপরে। আমার মতো দীন অভাজনের সেই তো শ্রেষ্ঠ আচ্ছাদন।’প্রত্যহ নিশীথে নির্মল নীলাকাশ থেকে ঝরে পড়ে বিন্দু বিন্দু শিশির, যেন সারারাত হাজারও তারার চোখের জলে স্নাত হয় সমাধি।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের সাবেক মহাব্যবস্থাপক

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: