মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • খালেদা বেগম

দিনমজুর স্বামী আর দু’সন্তান নিয়ে নাসিমা বেগমের সংসার। সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ও দু’সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন লেবাননে। নাসিমার সে স্বপ্ন হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্ন। বরং দূর প্রবাসে অসহায় নাসিমার ওপর নেমে এসেছিল পাশবিক নির্যাতন।

এ বছরের ৯ জুন রেহানা ও তার খালাত বোন রুবিকে দুবাই পাঠানো হয়েছিল এয়ারপোর্ট ক্লিনারের কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ২৫ জুন পর্যন্ত সেখানে নরকযন্ত্রণা ভোগের পর পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় ২৭ জুন দেশে ফিরে আসেন রেহানা একা। এখন পর্যন্ত রুবির খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিদেশে চাকরি পাওয়ার আশায় যে আদম ব্যবসায়ীকে তাঁরা ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন, সেই আদম ব্যবসায়ীর সহযোগীরাই রেহানা ও রুবিকে নাইজেরিয়ার এক নারীর কাছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়।

এ বছরই আরেকটি ঘটনায় উখিয়া উপজেলার টেকনাফ গ্রামের এক তরুণীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। মেয়েটিকে ৭০ হাজার টাকায় দিল্লীর একটি পতিতালয়ে বিক্রির সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় সে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনীতিক ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ৩১ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরে আসে তরুণীটি।

শুধু চাকরি দেয়ার নামেই নয়, প্রেম বা বিয়ের ফাঁদে ফেলে প্রায়ই কিশোরী এবং তরুণীদের বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা নড়াইলের এক তরুণীকে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে ভারতীয় পুলিশের সহায়তায় বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি ভাগ্যবিড়ম্বিত মেয়েটিকে দেশে ফিরিয়ে আনে। মুম্বাইয়ের পতিতালয়ে দীর্ঘ চার বছরের অন্ধকার জীবনে তরুণীটি আক্রান্ত হয় মরণব্যাধী এইডসে।

এ তো গেল সেসব নারীর কথা, যারা স্বামী বা পরিবারের সদস্য, সরকারী সংস্থা, এনজিও কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহের প্রচেষ্টায় কোনমতে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরে আসতে পেরেছেন। এর বাইরেও রয়েছে আরও বিপুলসংখ্যক হতভাগ্য নারী, যারা দালালের খপ্পড়ে পড়ে সবকিছু হারিয়ে এখন অন্ধকার জগতে। দূর প্রবাসে কোথায় আছে, কেমন আছেÑ কিছুই জানতে পারে না তাদের আপনজন। যারা ফিরে আসে তাদের কাছে জানা যায়, কি আমানবিক ও অসহায়ভাবে পৃথিবীর আদিমতম ঘৃণ্য পেশায় কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে আমাদের কিশোরী, তরুণীদের।

অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার বেশিরভাগ নারী সামাজিক কারণে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ করেন না। অনেকে আবার বিদেশে যাওয়ার খরচ হিসেবে নেয়া ঋণ শোধ করার জন্য এবং পেছনে ফেলে যাওয়া দরিদ্র পরিবারের খরচ যোগাতে বছরের পর বছর নির্যাতন মেনে নিয়েই ইচ্ছার বিরুদ্ধে নরক যন্ত্রণা সয়ে অবস্থান করছেন বিদেশে।

এহেন অমানবিক কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কিছু প্রতারক ও ট্রাভেল এজেন্সীর দালালচক্র। যারা ভাল কাজ দেয়ার কথা বলে বিশাল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দরিদ্র নারীদের বিদেশে পাঠায়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু বিদেশে পাচার হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার, নারী ও শিশুকল্যাণ সংগঠনের প্রতিবেদনে জানা যায়, গত তিন দশক বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পাচার হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার বাসিন্দারা পাচারের শিকার হচ্ছে বেশি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেনাপোল সীমান্ত, উত্তরের সোনামসজিদ স্থলবন্দর, গোদাগাড়ি, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, শাহপরির দ্বীপ, উখিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, হিমছড়িসহ মোট ৩০টি উপকূলবর্তী স্থান হতে সমুদ্র পথে পাচার হচ্ছে এদেশের অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশু।

মানব পাচার বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধকল্পে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারী সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, সম্প্রতি প্রণীত পাচার বিরোধী আইন ‘দি হিউম্যান ট্রাফিকিং ডিটারেন্স এ্যান্ড সাপ্রেশন অর্ডিন্যান্স-২০১১’।

সরকারের অন্যান্য উদ্যোগসমূহের মধ্যে রয়েছে স্বরাষ্ট্র সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি, জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা পর্যবেক্ষণ কমিটি এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের পাচারবিরোধী কমিটি গঠন। আরেকটি সরকারী উদ্যোগ হলো, পুলিশ হেডকোয়ার্টার ও জেলাপর্যায়ে পুলিশের মনিটরিং সেল গঠন। জাতীয় ও জেলাপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরকারী কর্মকর্তা, পুলিশ, তদন্তকারী ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, আইনজীবী, বিচারক, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা এবং পাবলিক প্রসিকিউটরদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া পাচারের শিকার বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উদ্ধার, চিকিৎসা, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্গঠনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে।

নারী পাচার রোধে সবচেয়ে বড় উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বিদেশে পড়াশোনা বা চাকরি যে কোন কাজে যেতে ইচ্ছুক, জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকহারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা দালাল বা পাচারকারী চক্র থেকে সাবধান থাকতে পারে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং গ্রামপর্যায়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানব পাচার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা যেতে পারে। পরিবারের ভাই, বাবা-মা বা স্বামী ও অন্যান্য শিক্ষিত, সচেতন সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের এ ব্যাপারে সতর্ক করতে পারেন, প্রয়োজনে বাধা প্রদান করবেন।

কিশোরী বা তরুণীদের দালালচক্র ও নারী পাচারকারীদের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত তথ্যের অন্তর্ভুক্তি নতুন প্রজন্মের মঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। মানব পাচার প্রতিরোধী ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। যেমন পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারী-বেসরকারী সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা পাচারকারীদের শনাক্ত করে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা করতে পারে। নারী পাচার বা যে কোন ধরনের মানব পাচার সম্পর্কিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী পাচারে কিছু রিক্রুটিং এজেন্ট রয়েছে ঘৃণ্য ভূমিকায়। তাই রিক্রুটিং এজেন্টরূপী দুর্বৃত্তদের লাইসেন্স প্রদানে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকৃত ও সৎ এজেন্সিগুলোর জন্য লাইসেন্স ফি একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে দালাল বা পাচারকারীদের শাস্তির জন্য কঠিন আইন প্রণয়ন ও এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: