আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অনিশ্চিত

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • নভেরা চৌধুরী

কিছুক্ষণ আগেই তিনি মারা গেলেন।

মারা যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও তিনি বার বার বলছিলেন, ‘পানি খাব। পানি দাও। জরি! তুই কোথায়? পানি! পানি!!’ জরি পানি নিয়ে এসে দেখে তার বাবা আর নেই।

জরি ধপ করে মাটিতে বসে পড়লো। তার হঠাৎ সবকিছু অন্যরকম লাগছে। চোখ দিয়ে কোন পানি আসছে না। মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। জরি মাথা তুলে একবার ছাদের দিকে তাকালো, তারপর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। তার খুব অসহ্য লাগছে। চারপাশের আলো হঠাৎ করে কি বেড়ে গেছে, নাকি কমে গেছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে আলোটা চোখে খুব লাগছে। কি হচ্ছে, জরি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। জরি ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকালো। কি অদ্ভুতভাবে তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর গায়ের ওপর পাতলা চাদরটা এলোমেলো হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক করা। চোখ হালকাভাবে মেলে তিনি তাকিয়ে আছেন। জরির হঠাৎ মনে হলো, বাবা যেন কিছু বলে উঠবেন। তাঁর চেহারায় কেমন যেন একটা উৎকণ্ঠা, চোখে এখনও সেই বিষণœ দৃষ্টি।

জরি বাবার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। তার আর কিছুই ভালো লাগছে না। আবার যেন নিজেকে খুব বেশি হালকা লাগছে। প্রায় দেড় বছর জরিকে খুব যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাবার এ্যাকসিডেন্টের পর থেকে শুরু করে আজ এতগুলো দিন একা কিভাবে যে সে সবকিছু দেখাশোনা করেছে, ভাবতেই অবাক লাগে। কই? তার বড় দুই ভাই তো কোনদিন দায়িত্ব নিয়ে কিছু করে নাই। শুধু মাঝে মধ্যে বিদেশ থেকে অল্প কিছু টাকা পাঠিয়েছে। তবে সেটাও নিয়মিত না। বছরে হয়তো দু-একটা চিঠি আসতো, তাও সেটা বড় ভাইয়ার; ছোট ভাইয়ার না। সেই চিঠিগুলো পড়লে মনে হতো, সত্যি! বড় ভাইয়াও যদি ছোট ভাইয়ার মতো না লিখতো, ভালো হতো।

জরি,

তোরা কেমন আছিস? বাবার কি খবর? আমি বেশি ভালো নাই। তোরা তো দেশে আছিস, মহাসুখে। কোন ঝামেলা নেই, মাত্র দুটা প্রাণী। এখানে যে আমার কি অবস্থা তা তো তোরা কোনদিন বুঝবি না।

যাক, সেসব কথা। এখানে আমার আবার আরেক ঝামেলা। আমি যেখানে কাজ করি, সেখানে মাঝখানে ক’দিন ছুটিতে ছিলাম। ছুটি শেষ হলে জানতে পারি, আমার জায়গায় নাকি ওরা অন্য আরেকজনকে নিয়ে নিয়েছে। এখন বুঝ, আমার অবস্থা। তোরা তো সব সময় আমাকে স্বার্থপরই ভাবিস। এখন ক’দিন টাকা পাঠাতে পারবো না, সেটার জন্যও আবার কিনা কি ভাববি।

এই সব বলে আর কি হবে। বাবার খোঁজ-খবর আমাকে জানাস। বাবার পা নেই, সেই এক ভালো। কাজ-কর্ম করতে হয় না। বাবার মতো যদি আমিও হয়ে যেতে পারতাম!

ভালো থাকিস।

ইতি

তোর বড় ভাই

মাসুদ।

চিঠি পড়ার পরপরই জরির চোখে পানি চলে আসতো। বাবাকে কখনো চিঠিগুলো দেখায়নি জরি। বাবা জিজ্ঞেস করলেই বলতো, ‘ভাইয়া টাকা পাঠিয়েছে। আর তোমার খবর জানতে চেয়েছে।’ শুনে বাবাও চুপ করে যেতেন। কারণ, তিনিও সবকিছু বুঝতে পারতেন।

খুব ছোট বেলায় টাইফয়েড জ্বরে মা মারা যান। জরি তখন মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে। তারপর থেকেই বাবা ইফতেখার সাহেব তিন ছেলে-মেয়েকে একাই মানুষ করেন। কলেজের চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর বাড়ি ভাড়ার সামান্য কিছু টাকা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালান। দেখতে দেখতে এতগুলো বছর চোখের পলকে পার হয়ে গেলো। আর পিছনে ফিরে তাকানোর সময় হয়নি। তবে মাঝে মাঝে পুরনো কথাগুলো হুট করেই মনে পড়ে যায়। আর তখন জরির মনে হয়, সত্যিই যদি মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজ তাদের জীবনটা এ রকম অনিশ্চিত হতো না। সংসারের এই হাল দেখতে হতো না।

জরি হঠাৎ নড়ে-চড়ে বসলো। এতক্ষণ সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেন মনে করতে পারলো না। আবার চারপাশে তাকালো জরি। একটু আগে যেরকম সব লাগছিলো, এখনো ঠিক সেরকমই লাগছে। রোদের আলোটাও একই রকম আছে। তার মানে কি? খুব একটা সময় পার হয়নি? ক’টা বাজে? উঠে গিয়ে সে ঘড়ি দেখবে সেই ইচ্ছাটাও করছে না। জরির মনে পড়লো, আজ তার বান্ধবী লীনার জন্মদিন। সব বান্ধবীরা মিলে যাওয়ার কথা ছিল। কোন ড্রেসটা পরে যাবে তাও ঠিক করে রেখেছিল। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠান। ভেবেছিল দুপুরের পর বাবাকে বলবে। আর তো বলা হলো না! কোনদিন বলা হবেও না।

এসব কি ভাবছে জরি? এখন কি বান্ধবীর জন্মদিন নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা? বাবার মৃত্যুতে কোথায় হাউমাউ করে কাঁদবে, তা না। চোখে কোন পানিই আসছে না। কেন যে কান্না আসছে না, এই ভেবেও খুব বিরক্ত হলো জরি। এতসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো জরি, টেরই পেল না। ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখলোÑ

খুব ঘন ঝোপ-ঝাড়ের ভিতর দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা দিয়ে জরি বাবার হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। স্বপ্নে জরির বয়স মাত্র দশ-এগারো বছর। তার গায়ে টুকটুকে লাল রঙের ফ্রক। হাতে হালকা সবুজ রঙের আইসক্রিম। আইসক্রিম খেয়ে জরি মনে হয় খুব মজা পাচ্ছে। একটু পরপরই তার মুখটা হাসি-হাসি হয়ে যাচ্ছে। এক সময় তারা একটা নদীর ঘাটে এসে পৌঁছলো। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। কিন্তু কি আশ্চর্য! নৌকাগুলোর কোন মাঝি নেই। জরি তাকিয়ে দেখলো, একটা নৌকা ঘাট থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। সেই নৌকায় অনেকগুলো মানুষ। কিন্তু মানুষগুলোর কারোর মুখ বোঝা যাচ্ছে না। সবাইকে কালো কালো ছায়ার মতো লাগছে। জরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকগুলো বাবাকে নৌকায় তুলে ফেললো। নৌকাটা এত দ্রুত ছেড়ে দিলো যে জরি, ‘বাবা! বাবা!’ বলে লাফ দিতে গিয়েই পানিতে পড়ে গেলো। নৌকাটাও দ্রুত দূরে চলে যাচ্ছে। ইফতেখার সাহেব মেয়েকে বাঁচানোর জন্য নৌকা থেকে ঝাঁপ দিতে চাইছেন। কিন্তু তিনি হাজার চেষ্টা করেও পা নাড়াতে পারছেন না। তাঁর পা নৌকাতে আটকে আছে। তিনি ক্রমেই মেয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে জরির মনে হলো স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে পানির শব্দটা যেন আরো বাড়ছে। পানির শব্দটা এখন আবার বৃষ্টির শব্দের মতো লাগছে। শব্দটা এত জোরে হচ্ছে যে জরির ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

ঘুম ভাঙ্গলো সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। তখন বাইরে খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে, শিলা বৃষ্টি। তাদের আধা-পাকা বাড়িটার টিনের চালে বড় বড় শিলা পড়ছে।

বৃষ্টির সাথে কি শীতও বাড়লো নাকি? বাইরে থেকে ঠা-া হাওয়া আসছে। খুব শীত শীত লাগছে। আবার স্বপ্নের কথা মনে হতেই পাশ ফিরে দেখলো বাবা তার পাশেই শুয়ে আছেন। কিন্তু তবু আজ তিনি নেই।

বাবা নেই, আর কোনদিন তিনি মেয়ের জন্য হাত বাড়াবেন না; ভাবতেই জরি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। সত্যিই তো মেয়েকে একা অথৈ জলের মধ্যে ফেলে তিনি চলে গেলেন। তার জন্য বাবার ওপর খুব অভিমান হলো জরির। জরি কোনভাবেই কান্না থামাতে পারছে না। সেই সাথে বৃষ্টির বেগও আরও বাড়ছে। থামার আর নাম নেই। আজ বোধ হয় আকাশটারও খুব কষ্ট। যে কষ্টের কথা সে কোনদিন কাউকে বুঝাতে পারবে না, জরির মতো। বৃষ্টির শব্দ আর কান্নার শব্দ মিলেমিশে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

জরির ফোন বাজছে। লীনা ফোন করেছে। জরি কান্নাটাকে অনেক কষ্টে আটকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় ফোন ধরলো।

‘হ্যালো জরি! কিরে তুই কোথায়?

আমি বাসায়।’

বাসায় মানে? তুই কখন আসছিস?’

আমি আসছি না।’

সেকি? কেন?’

‘ভাল লাগছে না রে।’

‘ভাল লাগছে না, বললেই হবে! তোর গলায় কি হয়েছে? কি রকম যেন শোনাচ্ছে। সর্দি লেগেছে নাকি?’

‘হুঁ।’

‘হুঁ আবার কি? তাড়াতাড়ি চলে আয়।’

‘বললাম তো, আসতে পারবো না।’

‘তোর কি হয়েছে, ঠিক করে বলতো।’

‘বাবা মারা গেছেন।’

‘কি?’

‘বাবা মারা গেছেন।’

‘কি বলছিস? উফ্ জরি! তোর ফাজলামি করার অভ্যাসটা আর গেলো না। আসতে না চাইলে না আসবি। তার মধ্যে আবার বাবাকে নিয়ে টানাটানির দরকার কি?.....’

জরি লাইনটা কেটে দিলো। তার আবারও গলাটা ধরে আসছে। কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে, সে আরো কিছুক্ষণ কাঁদলো। তারপর চোখ মুছে ক’টা বাজে দেখে নিলো। সোয়া ৬টা বাজে। কতগুলো ঘণ্টা পার হয়েছে। অথচ জরির কাছে মনে হচ্ছিল সময়টা যেন কাটছে না, আটকে আছে। প্রত্যেকটা মিনিট ঘণ্টার মতো হয়ে গেছে।

অন্ধকার হয়ে আসছে। জরি ঘরে বাতি জ্বালালো। তার হাতে এখন অনেক কাজ। ভাইয়াদেরকে ফোন করে জানাতে হবে বাবার মৃত্যুর ব্যাপারটা। আত্মীয়-স্বজন, তারপর পাড়া-প্রতিবেশী যারা আছে সবাইকে খবর দিতে হবে। বাবার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বৃষ্টিও এখন কমে এসেছে। অনেক দেরি হয়ে গেছে। জরি ওঠে পড়লো। তার হাতে সময় খুব কম।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: