কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ছায়ানট, সন্জীদা খাতুন ও পয়লা বৈশাখ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • দাউদ হায়দার

বছর পনেরো আগে বার্লিনের এক দৈনিকে ‘বাংলাদেশের কার্নিভাল’ তথা পয়লা বৈশাখ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে সেকুলার এবং এথনিক উৎসব। আবালবৃদ্ধবনিতার অংশগ্রহণ। যেমন খুশি সাজ। ঢাকা শহর নানারঙে উজ্জ্বল। হরেক মুখোশ, হরেক ফ্যাশন, নাচগান, পথে-চত্বরে হরেক খাবার। চাঁদি-ফাটা রোদে নারী-পুরুষ ঘামে জবজবে, কিন্তু স্ফূর্তির খামতি নেই। শুরু সূর্য উদয়ের আগে, ঢাকার রমনা নামে পার্কে। শেষ সূর্যাস্তের পরে। নামেমাত্র শেষ, আনন্দহুল্লোড়, নানা অনুষ্ঠানের কমতি নেই। কার্নিভাল উপলক্ষে সরকারী ছুটির দিন। প্রতিবেদক বলছেন, বেঙ্গলি কার্নিভাল। মিথ্যে বলেননি। ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে বেঙ্গলি কার্নিভালের মিল নেই, সাংস্কৃতিক এথনিকে। ফারাক বিস্তর। কিন্তু, ছিটেফোঁটা মিল ইদানীং লক্ষণীয়। কার্নিভালে কেবল পোশাকের বৈচিত্র্য নয়, যোগ হয়েছে মুখোশও।

আরও বলছেন, নানা রঙিন সাজপোশাক, মুখোশ, শোভাযাত্রার প্রবর্তক ঢাকার চারুকলার শিল্পী, ছাত্রছাত্রীর মগজ থেকে উদ্ভূত। এই উদ্ভাবন বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদীদের তীব্র কষাঘাত। মৌলবাদীর রক্তচক্ষু ধার ধারে না, মেয়েরাও হিজাব পরে না। নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলছে সেকুলার বাংলাদেশ। বাংলা নববর্ষে পয়লা বৈশাখের কার্নিভালে শ্রেণীগত বৈষম্যও স্পষ্ট।

এই স্পষ্টতা তথা বিভাজন প্রতিবেদক দেখেছেন সরেজমিনে। হাড় জিরজিরে গরিবের কাছ থেকে ওয়াটার রাইস (পান্তাভাত ) এবং হিলসা ফিশ কিনে, খেয়ে গরিবকে সাহায্য করেন খাদকরা, যারা উচ্চ-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। সারাবছর ওয়াটার রাইস খান না, গরিবকে সাহায্য করেন না। এই শ্রেণীর কাছে, বছরে একদিন, ওয়াটার রাইস খাওয়া ফ্যাশন। লোক দ্যাখানো।

প্রতিবেদক যেহেতু শাদা, উপরন্তু যুবতী, রসিয়ে লেখেন, কয়েকজন তাঁকে বড় হোটেল-রেস্তরাঁয়, ঢাকা ক্লাবে লাঞ্চ ডিনারে নিমন্ত্রণ জানান। তিনি পান্তা খেতে চান, নিমন্ত্রণকারীরা মুখ সিঁটকান। এও বাহ্য। নিমন্ত্রণকারীদের বাড়িতে গিয়ে পান্তাভাতের হাঁড়ির গামলা-মাসলা দেখতে চান, একজনও দেখাতে পারেন না, বরং ইউরোপের দামি থালাবাসন, গ্লাস, চামচ হাজির করেন। টেবিলে সাজানো।

বাংলাদেশে, বিশেষত ঢাকায়, বাংলা নববর্ষে, পয়লা বৈশাখে, নানা জাঁকজমক অনুষ্ঠানের গল্প শুনেছি, শুনি। চোখে দেখিনি। অবশ্য, কেউ কেউ ভিডিও ক্যামেরায় বন্দী করে দেখিয়ে বলেছেন, সবটা তুলতে পারিনি।

ইংরেজী ভাষায় নস্টালজিয়া বলে একটি শব্দ আছে। বয়স হলে নাকি লোকে নস্টালজিক। স্মৃতি খামচায়। টেনেহিঁচড়ে তুলে আনে। দ্যাখে অতীত, ফেলে-আসা দিন, দৃশ্য।

পড়ি সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে। বাসা মালিবাগে, আবুজর গিফারি কলেজের পেছনে (তখনও অবশ্য কলেজ হয়নি)। বাসা-স্কুলের দূরত্ব সাকুল্যে পাঁচ মিনিটের। ক্লাস সেভেনের ছাত্র। পঞ্চাশ বছর আগের কথা বলছি।

২৯ চৈত্রে, অগ্রজ জিয়া হায়দারের সঙ্গে নবাব ভাই (লেখক কাজি আনোয়ার হোসেন)-এর বাড়িতে গিয়েছি, সেগুনবাগিচায়। জিয়া ভাইয়ের বন্ধু তিনি, বয়সে যদিও বড়। যেহেতু জিয়া ভাইয়ের বন্ধু, সেই সুবাদে নবাবকেও ভাই বলি।

বাড়িতে ঢুকতেই, এক যুবতী, বয়সে জিয়া ভাইয়ের বড়, বললেন, জিয়া, ভাইবোনদের নিয়ে রমনা পার্কে এসো সকালে, নববর্ষে, পয়লা বৈশাখে। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে।

ফেরার সময় জিয়া ভাই বললেন, উনি ডক্টর কাজি মোতাহার হোসেনের মেয়ে, ডাকনাম মিনু, ভালনাম সনজীদা খাতুন, চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গান। পয়লা বৈশাখে যদি যাস, মিনু আপার গান শুনবি। লিনুও (ফাহমিদা খাতুন) যেতে পারে, গাইবে হয়ত।

হুবহু মনে নেই, বয়ানমালা ওইরকমই তবে। যেটুকু বাজছে কানে।

জিয়া ভাই যাননি। গিয়েছিলুম পাশের বাড়ির মনুকে নিয়ে, সহপাঠী। বয়সও এক।

অনুষ্ঠানে সাকুল্যে ৫০ জন শ্রোতাও নয়, বালক দলে আমরাই দু’জন। শ্রোতাকুলের কেউ দাঁড়িয়ে, বসে, কেউ খোশগল্পে, কারোর পায়চারি, যেন প্রাতঃভ্রমণে। পরনে অবশ্য ট্রাকস্যুট নয়। সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি। সকালের হাওয়ায় খোশমেজাজি। অনুষ্ঠান এক ঘণ্টারও নয়।

গান (রবীন্দ্রসঙ্গীত) ছিল গোটা চারেক (কান যদি প্রতারক না হয়)। মিনু আপার কণ্ঠে একটি। গোটা তিনেক কবিতাও পাঠ। একটি আবৃত্তি করেন গোলাম মুস্তাফা (অভিনেতা)। আজকের দিনের কোন সাংস্কৃতিক মস্তানকেও দেখিনি।

পরের বছর, শ্রোতার সংখ্যা খুব যে বেড়েছে, আদৌ নয় তা। আমার কাছে পয়লা আকর্ষণ অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা এবং অভিনেত্রী রেশমা। কোন কবিতা পড়েননি তিনি (চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করতেন। বাংলা একাডেমিতে ওঁর কবিতাপাঠ শুনেছি, মধুসূদনের কবিতা)। আজকের অশিক্ষিত, আনকালচারড, হেড়ে-গলার অভিনেত্রী নন তিনি।

ঊনসত্তরের অনুষ্ঠানে শ্রোতার সংখ্যা বেশি, শ’দুয়েক। সনজীদা খাতুন মহা খুশি। দেখতে পাচ্ছি, তাঁর উদ্যোগ, শ্রম ক্রমশ বিস্তারিত। ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে-ঘরে। ছায়ানটকে নিয়েই যাত্রা শুরু। এই শুরুর প্রথমদিকের সাক্ষী এবং অংশগ্রহণ আজ স্বপ্নের।

সনজীদা খাতুনই বাংলার মানুষের রক্তে চারিয়ে দিয়েছেন পয়লা বৈশাখ, নববর্ষের আত্মিক-ঐতিহ্য।

প্রচেষ্টা তাঁর একক, ছায়ানট এবং অবশ্যই ওয়াহিদুল হককে নিয়ে। নারী সর্বদাই আদ্যাশক্তি।

সনজীদা খাতুন নমস্যা। আমরা কৃতজ্ঞ। আজকের পয়লা বৈশাখের কার্নিভাল তাঁরই অবদান।

প্রতিবেদকের প্রতিবেদন পড়ে, একটি পদ্য লিখেছিলুম বছর কয়েক আগে, শিরোনাম : ‘এসো হে পান্তাভাত, এসো, এসো।’ ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এ প্রকাশিত। পদ্য পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক অধ্যাপক মহাক্ষিপ্ত। তাঁর ভাষ্য, রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে বাংলা নববর্ষ, গরিবগুর্বো এবং সনজীদা খাতুনকে অপমান করেছি।

পদ্যে, সনজীদা খাতুনের নাম নেই কোথাও, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ‘এসো হে বৈশাখ’ নিয়ে বেলেল্লাপনার কী চূড়ান্ত সমাজ-সামাজিকতা, শ্রেণীচক্রে, নামধারী অধ্যাপক, মাথা মোটা কি পাতলা, কি চিকন, কে জানে, বোঝেননি, বোঝার জ্ঞানগম্যি হয়নি। হবেও না।

সনজীদা খাতুন বাংলাদেশে যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন, পাকিস্তানের ষাটের আমল থেকে, তারই পরিণাম আজকের নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ, বেঙ্গলি কার্নিভাল।

ভুলে যাচ্ছি না বাংলার হালখাতা, ঘরে-ঘরে মিষ্টি বিতরণ, মহফিল, সামাজিক একাত্মতা।

কিন্তু গোটা দেশ পয়লা বৈশাখে, কার্নিভালে মাতোয়ারা হয়নি। গোটা দেশ, ধর্ম নির্বিশেষে, প্রজন্মকে আনন্দে উদ্বেলিত করেনি। এসো হে পান্তাভাত এসো, এসো। সনজীদা খাতুনই পান্তা-ইলিশের রাঁধুনি। পরিবেশকও। পরিবেশনে তাঁর মাতৃত্ব আবহমান বাংলার এথনিক-ঐতিহ্যের।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: