মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লড়াই নয় ॥ একসঙ্গে এগিয়ে চলা

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

সমুদ্র হক ॥ নারীর উন্নয়নে ও ক্ষমতায়নে একবিংশ শতকে শিক্ষার সঙ্গে সচেতনতা প্রয়োজন। দেশে চারটি স্তরে নারীর অবস্থান- ১. উচ্চস্তর ২. উচ্চ মধ্যম স্তর ৩. মধ্যম স্তর ৪. নিম্ন স্তরে। যাদের অবস্থান নিচে তারা অভাব খুব কাছে থেকে দেখে বুঝতে পেয়ে ও অনুভব করতে পেরে নানাভাবে রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছে এবং খুঁজে নিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কৃষি কাজ ও শহরে গিয়ে গার্মেন্ট সেক্টরকে নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে তারা ক্ষমতায়নের বাতায়ন খুঁজে পায়নি। যাদের অবস্থান মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিসরে তারা আপাত দৃষ্টিতে ক্ষমতার বাতায়নে থাকলেও তা নিজেদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবনে প্রবেশের পর চাকরির বেতনটা ‘মেল ডোমিনেটেডে সোসাইটিতে’ কিছুটা নাড়া দিয়েছে। নারী বোঝাতে সক্ষম হয়েছে পুরুষের পাশাপাশি সকল কাজে তারা কতটা পারদর্শী। কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি এফিসিয়েন্ট। একটা সময় কেউ ভাবেনি নারী আকাশ পথে উড়োজাহাজ চালাবে। নৌপথে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবে। সামরিক বাহিনী পুলিশ বাহিনীতে কাজ করবে। এমন কি হিমালয়ের চূড়া কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠবে। আজ সবই করছে নারী। নারী উন্নয়নে ও ক্ষমতায়নে গবেষণা করছেন বগুড়ার মেয়ে সুলতানা পারভীন শ্রাবনী। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স করার পর মাস্টার্স অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন করেছেন। তাঁর বিষয় ছিল হিউমেন রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পাঠের সময় তাঁর আগ্রহ জন্মায় উইমেন এমপাওয়ারমেন্টে। শুরু করেন গবেষণা। শ্রাবনী জানালেন একেবারে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে সর্বস্তরের নারী-পুরুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে যা জেনেছেন তাতে মনে হয়েছে একবিংশ শতকের নারীর কাছে শিক্ষা কোন বাধা নয়। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ এখন পুরনো ধারণার বলয় থেকে বের হয়ে এসেছে। প্রত্যেকেই চায় নারী শিক্ষিত হোক। একটা সময় প্রাথমিক স্কুলে ড্রপ আউটের (ঝরেপড়া) হার ছিল অনেক বেশি। গেল শতকে নব্বইয়ের দশকেও প্রথম শ্রেণীতে যত মেয়েশিশু ভর্তি হতো পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে ঠেকতো এক দশমাংশ। দিনে দিনে এই অবস্থার উন্নতি হয়ে ওই শতকের শেষে তা এক তৃতীয়াংশে ঠেকে।

একবিংশ শতকে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৯৮ শতাংশই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে (প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট বা পিএসসি) অংশ নেয়। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়েও একই হারে ভর্তি ও উত্তীর্ণ হয়। সবচেয়ে বড় আশার কথা হলো মাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়ে শিক্ষার্থী ও ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান। উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে এই সমতার সামান্য হেরফের ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ৩৩ শতাংশ মেয়ে। শ্রাবনী তার গবেষণায় লক্ষ্য করেছেন মাঠ পর্যায়ে বালিকা বধূর প্রবণতা এখনও অনেকটাই রয়ে গেছে। তবে নারী শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যেখানে সচেতনতা বেড়েছে সেখানে এই হার অনেক কমে যাচ্ছে। শ্রাবনীর গবেষণায় অন্যতম অবস্থানটি হলো এই জায়গাটিতে। শিক্ষার সঙ্গে সচেতনতা। শ্রাবনী শিক্ষিত নারীদের সঙ্গে কথা বলে যা অনুভব করতে পেরেছেন তা হলো- নারী যখনই কথা বলার স্বাধীনতা পাবে, অধিকার রক্ষার স্বাধীনতা পাবে, চিন্তার ও সৃষ্টিশীল ভাবনার স্বাধীনতা পাবে তখন আরও দ্রততার সঙ্গে এগিয়ে যাবে। এই অবস্থানে থাকতে পারলে পুরুষের জন্য তা হবে অত্যন্ত সম্মানজনক। একই সঙ্গে এই কথাও ঠিক এই অবস্থানে পৌঁছার পথ সৃষ্টি করতে হবে নারী পুরুষ উভয়কেই সম্মিলিতভাবে। এখানেই প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা। গবেষণায় দেখেছেন অনেক প্রগতিশীল ধারার পুরুষ বক্তাগণ বাতায়ন খুলে নারীদের বৃত্তের বাইরে এসে ক্ষমতায়নের পথে প্রবেশের আহ্বান জানান। তারাই আবার নিজেদের ‘ঘরে’ এই বিষয়টির ‘কন্ট্রাডিক্ট’ করেন সুক্ষ্মভাবে। এই মানসিকতার কারণে এখনও শিক্ষিত অনেক নারী কর্মজীবনে থেকেও ক্ষমতায়নের এবং সৃষ্টিশীল মেধার সুগন্ধী ছড়াতে পারছেন না। শ্রাবনীর গবেষণায় বের হয়ে এসেছে বর্তমানের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের সুক্ষ্ম কৌশল। নারীর এগিয়ে চলার প্রধান জায়গাটিতে কত সুক্ষ্ম কারসাজিতে চাপা দেয়া হয়। পরের জায়গাগুলোতে এতটাই ছাড় দেয়া হয় যা বাইরে থেকে বোঝাই যায় না কলকাঠিটি কোথায়? অনেকটা রূপকথার সোনারকাঠি রূপোর কাঠির গল্পের মতো। আশার কথা হলোÑ এই অবস্থার উত্তরণ ঘটছে ঠিকই তবে একটু ধীরে। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গবেষণাকর্মে শ্রাবনী আরেকটি বিষয়কে হাইলাইট করেছেন তা হলো ‘লড়াই’ শব্দটি। একবিংশ শতকেও নারী কেন পুরুষের সঙ্গে লড়াই করবে! এই নারী পুরুষের সম্পর্ক মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ও তাদের সন্তান, প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রয়ের মানুষ, অফিস কলিগ তাদের সঙ্গে নারী কেন লড়াই করবে! এই ‘লড়াই’ শব্দটি যখন বলা হয় তখনই তো প্রমাণ হয়ে যায় নারী এখনও বন্দী! তাহলে প্রগতির কথা কি বিতর্কিত হয়ে যাচ্ছে না। শ্রাবনী সরাসরি বলেছেন, লড়াই নয় নারী পুরুষের সমঝোতা এবং সর্বোপরি একে অপরকে পড়তে পারা, বুঝতে পারা অনুভব করতে পারাটাই হলো প্রধান কাজ। নারীর এগিয়ে চলার পথে এর বাইরে আর কোন কিছুরই দরকার নেই। সুলতানা পারভীন শ্রাবনী বর্তমানে বগুড়া শহরের হাজী মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ। এই কলেজেও তিনি তার মৌলিক ভাবনা পাঠদানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন প্রথম পাঠই হলো- শুদ্ধভাবে কথা বলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এক্সট্রা কারিকুলাম একটিভিটিজ থাকবে। যেমন আবৃত্তি করা, ছোট গল্প পাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং আবশ্যিকভাবে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিকে (আইসিটি) সঙ্গে রাখা। এজন্য আলাদা ল্যাব করা হয়েছে। শ্রাবনী নিজেও আবৃত্তি শল্পী। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও তিনি কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ভারতের কলকাতা শিলিগুড়িতে মঞ্চে আবৃত্তি করেছেন। প্রশংসা পেয়েছেন। আবৃত্তি নিয়েও তিনি গবেষণা করছেন। আবৃত্তিকে তিনি নতুন ফর্মে নতুন ধারায় নিয়ে যেতে চান। ব্যক্তি জীবনে শ্রাবনী ২ সন্তানের জননী। ব্যবসায়ী স্বামী রবিউল আলম তাঁর প্রগতিশীল ধারার কাজে উৎসাহ দেন। দৃষ্টি নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। শ্রাবনী লালন করেনÑ আগামীতে পুরুষের পাশাপাশি নারী নয়, নারী-পুরুষ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে দেশ গড়ার কাজে। প্রজন্মের নারী-পুরুষের মধ্যে যেন অদৃশ্য কোন কাঁচের দেয়ালও না থাকে।

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: