রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

যুদ্ধদিনের নারী

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

বীভৎসতা এসে ঢেকে দিয়েছিল শান্ত মুখটি। ধর্মের নামে ওরা বর্বরতা, ব্যভিচার, অনাচারের পন্থাই অবলম্বন করেছিল। ১৯৭১ সাল বাঙালী নারীর জীবন ছিল বিভীষিকাময়। সব যুদ্ধেই নারী ও শিশুকে হতে হয় চরম বর্বরতার বলি। নির্যাতন, নিপীড়ন, লাঞ্ছনা সবই তাঁদের সইতে হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালী নারীকে হতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। পাকিস্তানী হানাদার হায়েনারা ধর্ষণে মত্ত থেকে ঘোষণা করেছিল, বাঙালী নারীর গর্ভে পাকিস্তানী বীজ বপন করে দেব, যাতে আর কোন বাঙালী জন্মগ্রহণ না করে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত জনযুদ্ধ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষ এক মহান আদর্শ ও চেতনা নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। বাঙালী নারী মাত্রই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ভুক্তভোগী যেমন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক এবং বলিষ্ঠ যোদ্ধা। প্রতিটি মা চেয়েছেন, দেশ স্বাধীন হোক। স্বামী-সন্তানসহ স্বাধীন দেশে সুখে বসবাস করবেন। তাই অনেক মা তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গ্রামীণ নারীর ভূমিকা ও অবদান নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণা হয়নি। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে অবলোকন করা গেছে, গ্রামীণ নারীদের বিরাট অংশই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে। এমনকি পাকিস্তানী দালাল, রাজাকারদের স্ত্রী, কন্যাদের মধ্যেও স্বাধীনতার অদম্য আগ্রহ দেখা গেছে। কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে শান্তি কমিটির নেতার বাড়িতে স্ত্রীর বদান্যতায় মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে আশ্রয়ও পেয়েছে। গ্রামবাংলার নারীরা রাতদুপুরে বা অসময়ে রান্না করে খাইয়েছে। দরিদ্র নারীরাও পিছিয়ে ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনের কাজে নারীরাই মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছিল।

পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকার পতনের পর, শহর ছেড়ে একবস্ত্রে নারী-পুরুষ ও শিশুরা আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব নিয়ে হয়েছিল গ্রামমুখী। গ্রামীণ নারীরা সেদিন তাদের শুধু আশ্রয় নয়, খাওয়া-দাওয়াসহ নিশ্চিন্তে থাকার আয়োজনও করেছিল নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করে। এই নারীদের অনেকেই সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখসমরে নেমেছে। পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যা করেছে। রাজাকারদের ওপর গুলি চালিয়েছে। অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রান্নাবান্নাসহ আনুষঙ্গিক কাজও করেছে। এদের পাশাপাশি নারীরা এগিয়ে এসেছিল আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রƒষায়। প্রশিক্ষিত- অপ্রশিক্ষিত নারীরা নার্সিং কাজে নিজেদের নিবেদিত করেছিল স্বাধীন একটি দেশের স্বপ্নকে সামনে রেখে।

পিরোজপুর কাউখালীর ঊর্মিলা রায়ের ঘরবাড়িতে হানাদাররা আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয়ার আগে রাজাকাররা সব লুটে নেয়। সদ্য বিবাহিত একমাত্র মেয়েকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করে পাকি সেনারা। প্রতিশোধ স্পৃহায় যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ক্যাম্পে থাকতে অস্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষণ নেন। রাইফেল ও গ্রেনেড চালানোয় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ছদ্মবেশ ধারণ কৌশলও শিখে নেন। ঊর্মিলা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করেছেন এবং রান্না করে খাইয়েছেন। কাছাকাছি ক্যাম্পে খবর ও তথ্য আদান-প্রদানের দায়িত্ব পালন করেছেন। শত্রু ঘাঁটি রেকি করার কাজে ছিলেন পারদর্শী। অস্ত্রশস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও ছিলেন অত্যন্ত পটু। পুরুষ যোদ্ধাদের পাশাপাশি ক্যাম্পে থেকে, ক্যাম্পের সকল কাজে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। আহত যোদ্ধাদের মাতৃস্নেহে সেবা করেছেন।

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মনিগঞ্জ গ্রামের রোকেয়া বেগম। একাত্তরের এপ্রিলে পাকিস্তানী বাহিনীর হামলার মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতে। সেখানে শরণার্থী ক্যাম্পে প্রথমে ও পরে সেবিকা হিসেবে অস্থায়ী হাসপাতালে যোগ দেন। বাঙালী চিকিৎসকের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সেবার কাজ যেমন করেছেন, তেমনি গ্রেনেড নিক্ষেপসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্যের ব্যবহার বিষয়েও প্রশিক্ষিত হন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত্রুমুক্ত তেঁতুলিয়া হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতেন। তাদের সাধারণ ক্ষতস্থান পরিষ্কার, ব্যান্ডেজ বাঁধা, ইনজেকশন পুশ করা, ওষুধ খাওয়ানোর কাজও করেছেন।

রংপুরের আকলিমা খন্দকার বুড়িমারি সীমান্তে চ্যাংড়াবান্দায় অস্থায়ী হাসপাতালে নার্সের কাজ করতেন। একই সঙ্গে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের শবিদা খাতুনসহ এলাকার ১১ জন নারী আগ্নেয়াস্ত্র ও নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যেমন যুদ্ধ করেছেন, তেমনি আহত যোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রƒষাও করেছেন।

মুজিবনগর সরকার শরণার্থী ক্যাম্প থেকে শিক্ষিত মেয়েদের তালিকা করে তাদের নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান শেষে অস্থায়ী হাসপাতালে নিয়োগ দিয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষিত নারীরাও সেদিন যোদ্ধাদের সেবায় কাজ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্যও সরবরাহ করেছেন। এ সবই আজ বিস্মৃতির অতলে। একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তার সহযোগীদের পাশবিকতা, বীভৎসতার স্মারক ছিল বাংলার নারী। যুদ্ধ দিনের নারকীয়তার শিকার হয়েছেন তারা। যুদ্ধশিশুর জন্ম দিয়ে অনেক নারী লজ্জায় আত্মহত্যা করেছেন। অনেকে আর সমাজজীবনে ফিরে যেতে পারেনি। ধর্ষিতা নারীর বিভীষিকাময় জীবনে স্বাধীনতা এসেছে কঠিন কষ্টের অসহায়ত্ব নিয়ে। হানাদার, রাজাকারদের পাশবিকতার শিকার বাংলার নারীরা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার সোনার সূর্যটাকে ছিনিয়ে এনেছিল। যাদের আজ আর কেউ মনে করে না। ইতিহাসের কোন পাতায়ও নেই তাদের নাম। অথচ তাঁদের অবদানেরই ফসল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন স্বদেশ।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: